leadT1ad

তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন

গুমের শিকারদের ভারতে পাচার, জিজ্ঞাসাবাদে হিন্দিভাষী গোয়েন্দা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশে গত দেড় দশকে সংঘটিত গুমের ঘটনায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার দালিলিক প্রমাণ পেয়েছে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশি গোয়েন্দাদের দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে গোপনে ভারতে পাচার করা হয়েছে।

কমিশনের ওয়েবসাইডে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনের যুক্তি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। এর অংশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার নামে অবৈধ বন্দি হস্তান্তর ও যৌথ জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

ভুক্তভোগীদের জবানবন্দির বরাতে বলা হয়, ঢাকার গোপন বন্দিশালাগুলোতে জিজ্ঞাসাবাদে বিদেশিদের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। ডিজিএফআই ও র‍্যাবের বিভিন্ন সেলে আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় হিন্দি ও ইংরেজিভাষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গুম থেকে ফিরে আসা বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী কমিশনের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, বন্দিদশায় তিনি তাঁর সেলের বাইরে হিন্দিভাষী লোকদের কথোপকথন শুনেছেন। তারা বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদের অগ্রগতি ও তথ্য সংগ্রহ নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৮ বছর গুম থাকার পর ফিরে আসা এক ভুক্তভোগী। তিনি জানান, র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের টিএফআই সেলে আটক থাকার সময় তিনি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলা বিদেশিদের উপস্থিতি টের পেয়েছেন।

সালাউদ্দিন আহমেদ ও আন্তঃসীমান্ত পাচার

প্রতিবেদনে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম এবং পরে ভারতের শিলং থেকে তাঁকে উদ্ধারের ঘটনাকে আন্তঃসীমান্ত পাচার বা ‘রেন্ডিশন’-এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনে তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালের ১০ মার্চ উত্তরা থেকে অপহরণের পর তাঁকে র‍্যাব সদর দপ্তরের অধীন উত্তরার র‍্যাব-১ কম্পাউন্ডের টিএফআই সেলে আটক রাখা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬২ দিন গুম রাখার পর সালাহউদ্দিনকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। হস্তান্তরের সময় বাংলাদেশি নিরাপত্তাকর্মীরা নিজেদের পরিচয় গোপনে মুখোশ ব্যবহার করেছিলেন, যা দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘটনায় তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এডিজি (অপারেশন) জিয়াউল আহসান ও ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর আবুল কালাম আজাদের প্রাথমিক দায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বন্দি বিনিময় ও সুব্রত বাইন

প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে অবৈধভাবে বন্দি বিনিময়ের তথ্যও উঠে এসেছে। কমিশনে এক সেনা সদস্যের সাক্ষ্যে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে তামাবিল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) উপস্থিতিতে র‍্যাবের গোয়েন্দারা ভারত থেকে তিনজন বন্দিকে গ্রহণ করেন এবং বিনিময়ে দুজন বাংলাদেশিকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেন। ভারত থেকে আনা দুই বন্দিকে পরে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

একইভাবে ২০২২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের কাছে গোপনে হস্তান্তর করে ভারত। এর বিনিময়ে একজন বাংলাদেশি এবং সম্ভবত একজন ভারতীয় নাগরিককে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে কমিশন জানিয়েছে। ওই বাংলাদেশি নাগরিককে শনাক্ত করা হয়েছে এবং ভারতীয় আদালতের নথি যাচাই করে তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।

আরেক ভুক্তভোগী (কোডনেম বিএফআই-১২৯) কমিশনকে জানিয়েছেন, ভারতে আটক থাকার সময় তাঁকে দিল্লির একটি হেডকোয়ার্টার থেকে আসা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিন মাস পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

কমিশন বলেছে, এসব আন্তঃসীমান্ত কার্যক্রম ও বিদেশি গোয়েন্দাদের সম্পৃক্ততা ছিল পরিকল্পিত ও কাঠামোগত, যা তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনে পরিচালিত হয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত