বদলে যাচ্ছে পুরান ঢাকা, ইতিহাসের গায়ে জুড়বে আধুনিকতার রঙ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৫, ১৩: ১৪

নগর উন্নয়ন প্রকল্পে সাতটি এলাকা চিহ্নিত, শুরু হচ্ছে পুরান ঢাকার রিডেভেলপমেন্ট

চকবাজারের গলির ভেতর দিয়ে হাঁটলে এখনো শোনা যায় পুরনো ঢাকার অতীতের গুঞ্জন—ইট-সুরকির দেয়ালে লেগে থাকা শতবর্ষের স্মৃতি, বাতাসে ভেসে বেড়ানো নানারকম রান্নার ঘ্রাণ, আর গলির মোড়ে চা খেতে ব্যস্ত মানুষের আড্ডা। কিন্তু এই দৃশ্য বদলাতে চলেছে। আধুনিক নগর পরিকল্পনার ছোঁয়ায় পুরান ঢাকা এখন নতুন করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে—সঙ্গে থাকবে ইতিহাসের সম্মান, আর থাকবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পুরান ঢাকাকে নতুন রূপে সাজাতে শুরু করছে “আরবান রিডেভেলপমেন্ট” নামের একটি বড় পরিকল্পনা। ২০২৫ সালের শুরুতেই পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি সাতটি অঞ্চলকে চিহ্নিত করেছে যেখানে প্রথম ধাপে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে। স্থানগুলো হলো—ইসলামবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, বংশাল, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীর চর এবং লালবাগ।

এই এলাকাগুলোকে নির্বাচন করা হয়েছে সরেজমিন পরিদর্শন, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ, এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)’ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে। জায়গার পরিমাণও কম নয়—শুধু হাজারীবাগেই প্রায় ১১১ একর জায়গা অন্তর্ভুক্ত, বাকিগুলো মিলিয়ে আরও শত একরের বেশি জায়গা।

কিন্তু পুরান ঢাকার পরিবর্তন শুধু ইট-কাঠের কথা নয়, এটা মানুষের গল্পও। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাসকারী মানুষদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের মতামত নিয়েই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, "পুরান ঢাকা অনেকটাই ঐতিহ্যবাহী কিন্তু বসবাসের উপযোগী নয়। এখন স্থানীয়রাও পরিবর্তন চান। তাই সবদিক বিবেচনায় নিয়ে রিডেভেলপমেন্ট হবে।"

এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুরনো, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। ছোট ছোট প্লট একত্র করে তৈরি করা হবে বড় ব্লক—তিন থেকে পাঁচ বিঘার আয়তনে। সেখানে থাকবে খোলা জায়গা, পার্ক, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, ব্যায়ামাগার, বিনোদন কেন্দ্রসহ আধুনিক নাগরিক সুবিধা।

তবে এই আধুনিকায়নের মাঝে হারিয়ে যাবে না পুরান ঢাকার ইতিহাস। হেরিটেজ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করার ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে। আর প্রকল্পের সময় যারা সেখানে বসবাস করেন, তাদের জন্য থাকবে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা—যাতে কেউ যেন নিজ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন না হন।

নগর উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার সমস্যা গুলোকেও চিহ্নিত করা হয়েছে—সংকীর্ণ রাস্তা, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস, অপরিকল্পিত ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা—সবকিছুতেই আসবে পরিবর্তন। ড্যাপ অনুযায়ী বকশীবাজার-চকবাজার ও নাজিমউদ্দিন রোড ৬০ ফুট প্রশস্ত করা হবে, বাড়ানো হবে রাস্তা, উন্নত হবে ট্রাফিক ব্যবস্থা।

পুরান ঢাকার প্রতিটি ইটের মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে একটি নতুন স্বপ্ন—একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, এবং আধুনিক নগর।

সময় হয়তো বদলাচ্ছে, কিন্তু স্মৃতি ও ঐতিহ্য ঠিকই রয়ে যাবে নতুন এই ঢাকার বুকের গভীরে।

বিষয়:

আধুনিকতা
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত