
আমরা যখন গবেষণা এবং লেখালেখিতে চৌর্যবৃত্তি নিয়ে ভাবছি তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক উদ্ভাবন সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সামনে আরো একটি নতুন জটিলতা নিয়ে আসছে। আমার মনে পড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক বিভিন্ন রকম উপকরণ বিশেষ করে চ্যাট জিপিটি যখন ২০২০ এর শেষে জনপরিসরে চালু হয় তখন আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আশঙ্কা, ও সংশয় তৈরি হয়। সেই আশঙ্কা কিংবা সংশয়, যাই বলি না কেন, এই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল মূলত ছাত্রছাত্রী। শিক্ষকদের মধ্যে একটা চিন্তা শুরু হয়, ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের অ্যাসাইনমেন্টগুলো তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেবে কিনা।
কোভিডের কারণে তখন আমরা মাত্রই অনলাইন ক্লাসসহ উন্নত প্রযুক্তির নানাদিক ব্যবহারের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে শুরু করলাম। কোভিডের পূর্বে যা হয়ত কেবল মাত্র শহুরে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু কোভিডের বাস্তবতা তা সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিল। এটা এমনভাবে ছড়ালো যে, বন্ধুরা অনলাইনে আড্ডা দিতে শুরু করল। আবার কাজের বিষয়গুলোও অনলাইনে হতে শুরু করলো। শুরু হলো আধুনিক প্রযুক্তির নানা ব্যবহার।
আমার মনে পড়ে, অনলাইনে পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্ট জমা নেবার জন্য দিনের পর দিন আমরা কত সময় ব্যয় করেছি যেন ছাত্রছাত্রীদের যথাযথভাবে এই সময়েও শিক্ষা প্রদান জারি রাখতে পারি। এখানে বলতেই হয়, সেই সময় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ই এই নতুন ধারার শিক্ষা আমাদের এখানে প্রথম শুরু করে। এই সময়টায় আমার এক বন্ধু ‘শনিবারের আড্ডা’ নামে একটা অনুষ্ঠানও শুরু করলো। এমন অনেক উদ্যোগের কথা আমরা বলতে পারি যা সেই কোভিডের সময় আমরা দেখি। ফলে কোভিড যেন আমাদের অযাচিতভাবেই প্রযুক্তিগত বিষয়ের দিকে আরো বেশি ঠেলে দিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তখন আমাদের মনে হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন নতুন একটি ধারা নিয়ে আসছে আমাদের সামনে। বিশেষ করে আমরা যদি এর ইতিবাচক দিকগুলো দেখি। বিশেষ করে লেখালেখি কিংবা গবেষণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো বেশ সহায়ক।
আমি বারবার বলি যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দেখতে হবে কেবল একটি সহায়ক যন্ত্র হিসেবে যার ব্যবহারের মাধ্যমে একজন গবেষক কিংবা লেখক তার ভাবনাকে একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে যা তাকে একই সঙ্গে কাজের গতি ও সেটিকে আরো শাণিত করতে পারে। কিন্তু যদি চ্যাট জিপিটি কিংবা এই ধরনের অন্যান্য যে ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক উপকরণ রয়েছে সেগুলোকে কেবল অন্ধভাবে লেখা কিংবা প্রবন্ধ তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় তাহলে হয়তো সেটি এক ধরনের সমস্যা তৈরি করবে। সেই আলোচনার শুরু থেকেই আমি তখন যুক্তি দিচ্ছিলাম যে আমরা যারা এই প্রজন্মের মানুষ, যারা কিনা নব্বই দশকের বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তাঁদের কাছে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর ছিল একটি ধীর ও চলমান প্রক্রিয়া ও তার সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াও ছিল একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিষয়।
আমরা নব্বই দশকে যখন ব্যান্ড মিউজিকের ক্যাসেট পেয়েছি, ধীরে ধীরে তা সিডি ও ডিভিডিতে রূপান্তরিত হলো এবং আমরা দেখতে পেলাম কী করে কম্পিউটার আমাদের সমাজে আসলো এবং নতুন নতুন ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল যা আমাদের পুরো সমাজকে আমূল বদলে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরা গুগল ও ইমেইল এর উদাহরণ নিয়ে আসতে পারি। এ দুটিই আমাদের জীবনে যুগান্তকারী প্রভাব রাখতে শুরু করে।
গুগল আমাদের জীবনকে এতটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলল যে, কিছু জানার থাকলেই আমরা গুগলের শরণাপন্ন হতাম। একটা পর্যায়ে ‘গুগল করা’ একটা জনপ্রিয় ধারণা বা বুলিতে পরিণত হলো। অর্থাৎ গুগলকে ব্যবহার করা অনেকটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলো আর আমরা কথায় কথায় বলতে শুরু করলাম ‘একটু গুগল করে দেখো তো’। এটা এক ধরনের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট-এর মতো একটা জায়গায় চলে এলো। যা আমরা এখন দেখি চ্যাট জিপিটি সহ অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহারের ক্ষেত্রে।
তাই যখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক বিভিন্ন উপকরণ দেখি সেটাকে অনেকে যেভাবে খুব নেতিবাচকভাবে নেন, আমার দৃষ্টিকোণটি ঠিক তেমন নয়। কেননা এটাকে আমি প্রযুক্তিগত যে উদ্ভাবনী চিন্তা এবং তার সঙ্গে সমাজের এগিয়ে যাওয়ার মধ্যকার একটি ইতিবাচক সম্পর্ক ও মিথস্ক্রিয়া হিসেবে দেখতে চাই। গুগলকে আমি যেমন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করেছি ঠিক তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক নানা ধরনের উপকরণকেও আমরা আমাদের কাজের গতি ও তার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু যদি আমরা তাকে অন্ধভাবে ব্যবহার করি এবং নিজের বিবেক ও সৃষ্টিশীলতাকে বিবেচনায় না নিয়ে ব্যবহার করি তাহলে সেই কাজ আমাদেরকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করবে।
এ প্রসঙ্গে সেদিন আমার এক বন্ধু ও সহকর্মীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল যে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সাথে আমাদের যে এক ধরনের ধীর ও রূপান্তর আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে সেই ধারাবাহিকতা বোধহয় আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আমরা দেখি না। কেননা তারা যেমন জন্মের পর থেকেই প্রযুক্তির উৎকর্ষ দেখে বড় হচ্ছে এবং তারা একে তার জীবনের একটি অনুষঙ্গ হিসেবে দেখে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন অনেকটা তার দৈনন্দিন অভ্যাসের মতো একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমরা যখন আমাদের সন্তানদের ডিভাইসের ব্যবহারের প্রবণতা দেখি তখন মনে হয় যে এই বিষয়টা যেন তাদের একটা অধিকারে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি আমাদের বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে আমরা তাঁদের জীবনে এ ধরনের উপকরণের যৌক্তিকতাকে ধরতে পারব না যা আমরা ইতিমধ্যেই অনুধাবন করতে পারছি।
এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোকে আমরা যদি নৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারি তাহলে সে বিষয়গুলো আমাদের জন্য আরো বেশি চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। সে কারণেই হয়তো একাডেমিক গবেষণায় কিংবা লেখালেখিতে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের প্রবণতা বৈশ্বিক পরিসরেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যখন তারা এর নৈতিক ব্যবহারের কথা চিন্তা করছে তখন আমাদের এখানে আমরা সেই প্রথাগত প্লেজিয়ারিজমের মধ্যেই রয়ে গেছি। যার ব্যবস্থাপনার কোন টেকসই কাঠামোই এখনো আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।
আমাদের একাডেমিক পরিসরে পরবর্তী ধাক্কা নিয়ে আসবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। সেই ধাক্কা নেওয়া ও তার ব্যবস্থাপনার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে। যেহেতু আমাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গবেষণা ও লেখাকে চিহ্নিত কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই, তাই এখন থেকেই সে বিষয়ে চিন্তা করা জরুরি। যখন আমরা দেখব যে স্থানীয় বিভিন্ন ধরনের জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ যারা লিখবেন এবং সেই জার্নালগুলোর সম্পাদকদের সেই ধরনের লেখালেখিকে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মূল্যায়ন করার সক্ষমতা রয়েছে কি না সেই প্রশ্নও আমাদের সামনে আসবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তারা কীভাবে নৈতিকভাবে ব্যবহার করছে, তার মূল্যায়নের সক্ষমতা নিয়ে তখন প্রশ্ন আসবে যার আলোচনা ইতিমধ্যেই অল্প বিস্তর আমরা দেখতে পাই।
ইতিমধ্যেই আমরা সেই বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যে বিতর্ক কেবল শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক আর নেই। তাই আমাদের এখন থেকেই গবেষণা কিংবা একাডেমিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার নিয়ে চিন্তা করতে হবে। প্লেজিয়ারিজমের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহারের একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে। কেননা আমরা ইতিমধ্যেই শুনেছি যে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখাও প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। যদিও এর কিছু পরীক্ষামূলকভাবে হচ্ছে। আবার আমরা বেশ কিছু লেখার কথা জানি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা ও তা ধরা পড়ার মাধ্যমে সেগুলোকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে ।
বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সব সময়ই আমাদের কাজের মধ্যে গতি সঞ্চার করে। ঠিক তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের উপকরণের কথা আমরা বলি সেটা আমাদের লেখালেখি কিংবা গবেষণায় সেই গতি ও গুণগত মান নিয়ে আসতে পারে। সেই মান ও গতি কিংবা দ্রুততাকে আমি কোনোভাবেই নেতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই না। কিন্তু তাকে আমরা নৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি কি না সেটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখানে যে প্রশ্নটি আমরা করতে পারি সেটা হলো—লেখক কিংবা গবেষকের যে মৌলিকত্ব কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে লেখকের যে একটি স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয় এবং তার সঙ্গে একজন লেখকের যে বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান গড়ে ওঠে সেই বিষয়গুলো কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে পারে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার হয়ত পারে। তাই সেই ধরনের সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আমাদের কথা তুলতে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছু গবেষণার কথা শুনছি যা হয়তো খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যে এর ব্যবহার কেমন সে বিষয়েও হয়ত শিগগিরই গবেষণা হবে। কেননা তখনই আসলে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের প্রকৃত চ্যালেঞ্জকে বুঝতে পারব।
ফলে আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে। বিশেষ করে আমরা যখন একাডেমিক গবেষণার মান, প্ল্যাজিয়ারিজম এগুলো নিয়ে কথা বলছি এবং ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এ নিয়ে নীতিমালা তৈরি ও তার প্রয়োগের প্রতি জোর দিচ্ছে। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনও এই বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ফলে এখন সময় এসেছে কেবল সেই প্রথাগত প্ল্যাজিয়ারিজম নিয়ে ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক একাডেমিক ঝুঁকিগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করবো সে নিয়ে ভাবনার। কেননা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে এবং লেখালেখির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো একটি বড় ধরনের আলোড়ন এবং বিতর্ক নিয়ে আসবে।
একাডেমিয়ায় এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যেমন চ্যাট জিপিটি, ডিপসিক, জেমিনি ইত্যাদিকে কীভাবে নৈতিকভাবে ব্যবহার করা যায় সেই বিষয়ক নীতিমালা যেমন প্রয়োজন ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষকদের তা ব্যবহারের ও মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। যেহেতু আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনগণকে নিরুৎসাহিত করতে পারব না তাই এর নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে উৎসাহিত করাটাই হবে আমাদের প্রধান কাজ, আর সেটা করা খুব কঠিন কিছু নয়।
• বুলবুল সিদ্দিকী: নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আহ্বায়ক, অ্যাল্যায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস
.png)
-b52d51.jpeg)
-028855-256x144.webp)




