মতামত/৯/১১: আমরা ঠিক কী মনে রাখব আর কী ভুলে যাব

লেখা:
লেখা:
স্টেফানি এ. (স্যাম) মার্টিন

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছর ১১ সেপ্টেম্বর এলেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একটি পরিচিত বাক্য চোখে পড়ে—‘কখনো ভুলে যেও না’। পোস্টার, স্টিকার, স্মরণসভা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতিচারণ করতে দেখা যায় সেই দিনটি নিয়ে। কিন্তু ২৫ বছর পর এসে মনে প্রশ্ন জাগে, কী ভুলে না যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে?

২০০১ সালে যারা বেঁচে ছিলেন এবং সেই দিনটি দেখেছেন, তাঁদের জন্য ৯/১১ ভুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। সেই দিনের আকস্মিক ধাক্কা, টেলিভিশনের পর্দায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দ্বিতীয় বিমানটির আঘাত, এরপর চোখের সামনে টাওয়ার ধসে পড়া এসব দৃশ্য একটি প্রজন্মের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে। নিউইয়র্কের দেয়ালে দেয়ালে নিখোঁজ মানুষের ছবি, স্বজনের অপেক্ষা আর দমকলকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের সাহস সব মিলিয়ে ৯/১১ ছিল ভয়, শোক ও মানবিকতার এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

কিন্তু আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে সেই দিনটি ভিন্ন। তাদের অনেকেরই জন্ম হয়েছে ২০০১ সালের পর। তারা ৯/১১ দেখেনি, জেনেছে ছবি, প্রামাণ্যচিত্র, জাদুঘর, শ্রেণিকক্ষের পাঠ এবং সেই সময়ের জীবিত মানুষের মুখের গল্প শুনে। ‘ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামের’ হিসাব অনুযায়ী, হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০ কোটি মানুষ জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ, যে ঘটনা একসময় পৃথিবীকে ‘আগে’ ও ‘পরে’ এই দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল, সেটিই এখন ধীরে ধীরে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে।

ইতিহাস বুঝতে বিস্মৃতিও গুরুত্বপূর্ণ

সমষ্টিগত স্মৃতি নিয়ে গবেষকেরা বলেন, কোনো সমাজ তার অতীতকে শুধু সংরক্ষণ করে না, গল্প, প্রতিষ্ঠান, স্মরণানুষ্ঠান ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে সেই অতীতের অর্থও নতুন করে তৈরি হয়। ৯/১১ এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) গঠিত হয়। অনেকের কাছে এটি ৯/১১ পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতীক। একইভাবে প্রতিবছর নিহতদের নাম স্মরণ করা, স্মরণসভা এবং আলোকশিখা জ্বালানোর মাধ্যমে সেই দিনের মাহাত্ম্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

তবে স্মৃতি মনে রাখার সঙ্গে ভুলে যাওয়াও জড়িত। স্মৃতি গবেষক পল কনার্টনের মতে, ভুলে যাওয়া সব সময় ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ। একটি সমাজ অতীতের সব ঘটনা সমানভাবে মনে রাখতে পারে না। সময়ের সঙ্গে কিছু স্মৃতি উজ্জ্বল হয়, আবার কিছু ম্লান হয়ে যায়। তাই ২৫ বছর পর আমেরিকানরা ৯/১১ ভুলে যাবে কি না, তা প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, তারা কী মনে রাখবে?

রাজনীতি বদলেছে, বদলেছে স্মৃতির অর্থও

৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না, এর পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। হামলার পর আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় দুই দশক পর সেই যুদ্ধ শেষ হয়। এরপর ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেন সরকার ৯/১১ হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল না।

৯/১১-এর হামলা বদলে দিয়েছেন পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি। ছবি: সংগৃহীত
৯/১১-এর হামলা বদলে দিয়েছেন পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি। ছবি: সংগৃহীত

হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি নজরদারি বাড়ে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বিস্তৃত হয় এবং জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। মুসলিম আমেরিকানদেরও সন্দেহ ও বৈরিতার মুখে পড়তে হয়।

ফলে সময়ের সঙ্গে ৯/১১ এর দুটি আলাদা স্মৃতি তৈরি হয়েছে। একদিকে এটি নিরীহ মানুষের মৃত্যু, শোক ও সাহসের গল্প। অন্যদিকে এটি যুদ্ধ, নজরদারি, নিরাপত্তানীতি ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের সূচনাবিন্দু। অনেকের কাছে ৯/১১ আমেরিকার হারানো গর্ব ফিরে পাওয়ার এবং সামরিক দৃঢ়তার প্রতীক। আবার অন্যদের কাছে এটি এমন এক জাতীয় ট্র্যাজেডি, যা হামলা পরবর্তী নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত নতুন ক্ষত তৈরি করেছে।

যে গল্পটি রাজনীতির আগেও ছিল

তবে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে ৯/১১ এর আরেকটি গল্প আছে মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর গল্প। দমকলকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা জীবন বাঁচাতে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ অপরিচিত মানুষকেও নিরাপদে বের করে আনতে সাহায্য করেছিলেন। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ৯৩ নম্বর ফ্লাইটের যাত্রীদের স্বজনেরা দিনের পর দিন নিখোঁজ মানুষের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। বিমানটি ছিনতাই হওয়ার পর তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এটি অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে তাঁরা বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। তাঁদের আত্মত্যাগ সম্ভবত আরও অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, ৯/১১ প্রথমে কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব ছিল না। এটি ছিল মানুষের অসহায়ত্বের এক নির্মম মুহূর্ত এবং সেই অসহায়ত্বের মধ্যে দিয়েই মানুষের অসাধারণ সাহসের কথা প্রকাশ পায়।

২৫ বছর পর কী থেকে যাবে?

সময় কখনো থেমে থাকে না। ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে হারিকেন ক্যাটরিনা, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট, বারাক ওবামার ঐতিহাসিক নির্বাচন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির সহিংসতা এবং করোনাভাইরাস মহামারি। নতুন নতুন ঘটনা ইতিহাসের জায়গা দখল করেছে। তাতে ৯/১১ এর গুরুত্ব কমেনি, বরং এর অর্থ বদলেছে।

যাঁরা সেদিন টেলিভিশনের সামনে বসে টাওয়ার ধসে পড়তে দেখেছিলেন, তাঁদের কাছে ৯/১১ আজও জীবন্ত স্মৃতি। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এটি ক্রমেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়। এই পরিবর্তনের মধ্যে এক ধরনের নস্টালজিয়াও আছে, একসময় যে ঘটনা ছিল অত্যন্ত কাছের ও বাস্তব, সেটিই এখন অন্যদের কাছে কেবল একটি তারিখ। তাই ‘কখনো ভুলে যেও না’ আক্ষরিক অর্থে সবকিছু মনে রাখার আহ্বান না হলেও এটি প্রশ্ন মনে জাগায় আমরা কোন স্মৃতিটা ধারণ করবো?

নিহত মানুষদের? শোক ও আতঙ্কের সেই দিনকে? সাহসী উদ্ধারকর্মীদের? পরবর্তী যুদ্ধের ভুলগুলোকে? নাকি বিপদের মুখে অপরিচিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সেই মানবিকতাকে? সবকিছুকে সমানভাবে মনে রাখা সম্ভব নয়,কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি ৯/১১ প্রথমে ছিল অকল্পনীয় এক ভয়াবহতা ও মানবিক ট্র্যাজেডির দিন। পরে তা পরিণত হয়েছে যুদ্ধ, নিরাপত্তা, দেশপ্রেম ও রাজনীতির এক দীর্ঘ উত্তরাধিকারে।

২৫ বছর পর হয়তো ৯/১১ স্মরণের সবচেয়ে মানবিক দিক হলো মৃতদের স্মরণ করা, জীবিতদের সাহস মনে রাখা এবং ইতিহাসের পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোকে প্রশ্ন হিসেবে দেখা। কারণ কোনো জাতির ইতিহাস শুধু সে কী মনে রাখে, তা দিয়ে তৈরি হয় না, সে কীভাবে সেই স্মৃতির অর্থ নতুন করে বোঝে, তার ওপর ইতিহাসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

  • স্টেফানি এ. (স্যাম) মার্টিন: ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্ড বেথিন চার্চ এনডাউড চেয়ার অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, বোয়িস স্টেট ইউনিভার্সিটি

(দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত