
ঘড়ির কাঁটা তিন বছর পিছিয়ে দিলে কি সংকটও তিন বছর পিছিয়ে যায়? স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা সামনে আসার পর থেকেই এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাড়তি সময় পাওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর হতে পারে। কারণ, এতে রপ্তানি সুবিধা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা, নতুন বাণিজ্য কৌশল প্রণয়ন এবং বেসরকারি খাতকে উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ বাড়বে। তবে সময় বাড়লেই সক্ষমতা বাড়ে না বরং সংস্কার না হলে আজকের সংকট তিন বছর পর আরও কঠিন হয়ে ফিরে আসতে পারে।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬। উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও প্রস্তুতির প্রয়োজন উল্লেখ করে বর্তমান সরকার সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশও করেছে। পরে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসোক) বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠিয়েছে।
তবে এই সমর্থনের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বার্তাও রয়েছে। তা হলো, বাড়তি সময় মানেই সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নয়। বরং আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানো, কর আহরণ বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানির বৈচিত্র্য সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতকে নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করতে এই সময় কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন শুধু বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উত্তরণ করবে, নাকি ২০২৯ সালে—তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাড়তি সময় পেলে বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক খাতে কী কী পরিবর্তন আনবে।
২০২৯ যদি কেবল উত্তরণের নতুন তারিখ হয়, তাহলে বাংলাদেশ তিন বছর সময় কিনবে। আর যদি এটি সংস্কার বাস্তবায়নের সময়সীমা হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যতে তিন বছর বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
এলডিসি উত্তরণের কথা উঠলেই আলোচনার কেন্দ্রে আসে রপ্তানি সুবিধা, ইউরোপের বাজার, তৈরি পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ এবং ওষুধশিল্পের মেধাস্বত্ব-সুবিধা। উদ্বেগগুলো বাস্তব, কিন্তু বাংলাদেশের মূল সংকট আরও গভীরে। উত্তরণ নতুন কোনো দুর্বলতা তৈরি করবে না; বরং অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক যাত্রা সম্পন্ন করেছে। দারিদ্র্য কমেছে, রপ্তানি বেড়েছে, অবকাঠামো সম্প্রসারিত হয়েছে এবং তৈরি পোশাকশিল্প লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে এই অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবেই বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের প্রয়োজনীয় সব মানদণ্ড পূরণ করেছে।
কিন্তু সাফল্যের এই ছবির অন্য একটি দিকও আছে। দেশের রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর। কর আদায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি ও সুশাসনের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। নীতিগত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জ্বালানি সংকট এবং ব্যবসার উচ্চ ব্যয় বেসরকারি বিনিয়োগের পথও কঠিন করে রেখেছে।
তাই এলডিসি উত্তরণকে নতুন সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বরং একটি আয়না, যেখানে বিশেষ সুবিধার আড়ালে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি ও দুর্বলতা—দুটিই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করেছে কি না, সেই বিতর্ক এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। জাতিসংঘের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ঢাকা তিনটি মানদণ্ডেই প্রয়োজনীয় সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে অতিক্রম করেছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো, উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আত্মতুষ্টি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো কঠিন সমস্যা সামনে এলে সমাধান করার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অর্থনীতিতে সময় বাড়ানো এবং সক্ষমতা বাড়ানো এক বিষয় নয়। ২০২৯ সালেও যদি বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত, রপ্তানি কাঠামো, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ পরিবেশ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে উত্তরণের তারিখ পিছিয়ে দিয়েও মৌলিক সমস্যাগুলো এড়ানো যাবে না। সেগুলো শুধু আরও বড় আকারে ফিরে আসবে।
কম খরচের শ্রম, তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয়, অভ্যন্তরীণ ভোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ সুবিধা—এই পাঁচ শক্তির ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু আগামী দশকে এই পুরোনো মডেল যথেষ্ট হবে না। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার মানদণ্ড দ্রুত বদলাচ্ছে; সস্তা শ্রমের জায়গা নিচ্ছে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশ ও শ্রমমান মেনে চলার সক্ষমতা। ফলে পোশাকশিল্পসহ প্রতিটি রপ্তানি খাতকে প্রযুক্তি গ্রহণ, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনের দিকে যেতে হবে। বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়নযাত্রার ভিত্তি তাই হওয়া উচিত—কম মজুরি নয়, বেশি উৎপাদনশীলতা; বিশেষ সুবিধা নয়, নিজস্ব সক্ষমতা; শ্রমের প্রাচুর্য নয়, শ্রমের দক্ষতা।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জকে শুধু শুল্ক ও বাণিজ্যসুবিধার হিসাব দিয়ে দেখলে ভুল হবে। একজন রপ্তানিকারক শুল্কছাড় পেলেও উচ্চ সুদ, বন্দরের দীর্ঘসূত্রতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে পড়তে পারেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের রপ্তানির বড় অংশ ইউরোপীয় বাজারনির্ভর। বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, উত্তরণের পর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হলে রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই ইউরোপীয় বাজারে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিও জরুরি। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অশুল্ক বাধা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ভবিষ্যতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মতো উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সাময়িক সুবিধা ধরে রাখা নয়; বরং পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা ও বাজার বৈচিত্র্যের মাধ্যমে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা। কারণ বিশ্ববাজারে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা শুরু হয় কারখানা থেকে বন্দর পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা দিয়ে। বাংলাদেশের সামনে এখন সিদ্ধান্তের বিষয়—বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি তৈরি করা, নাকি সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করার মতো অর্থনীতি গড়ে তোলা। একটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তখনই আসে, যখন সে সুবিধার কারণে নয়, নিজের দক্ষতা ও মানের কারণে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারে।
আগামী তিন বছরের জন্য বাংলাদেশের একটি প্রকাশ্য, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য সংস্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু নীতিগত প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; প্রতিটি সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা এবং অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণ করতে হবে।
প্রথমত, কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত রাজস্ব ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, জলবায়ু অভিযোজন ও সামাজিক নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সম্ভব নয়। করের হার বাড়ানোর আগে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা এবং কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে কঠোর সংস্কার করতে হবে। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে সমস্যা আড়াল করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা ও তদারকিতে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়বে না।
তৃতীয়ত, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৈরি পোশাক খাতকে আরও উচ্চ মূল্য সংযোজনের দিকে নেওয়ার পাশাপাশি ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে হবে। বন্দর, কাস্টমস, জ্বালানি, পরিবহন, জমি নিবন্ধন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনে দৃশ্যমান উন্নতি ছাড়া শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন বা নীতিগত ঘোষণা নতুন বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে না।
পঞ্চমত, মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমাতে কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, ডিজিটাল সক্ষমতা ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে।
সংস্কারের প্রয়োজন সবাই স্বীকার করে, কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গাতেই বাধা। কারণ ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, অযৌক্তিক কর সুবিধা কমানো কিংবা বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতা আসবে। তাই এটি শুধু অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্ন নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতারও পরীক্ষা। সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে—কোন সংস্কার কে করবে, কত দিনের মধ্যে করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মাপা হবে। ব্যর্থতার দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ সংস্কারের সাফল্য ঘোষণায় নয়, দৃশ্যমান ফল ও জবাবদিহিতেই।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের দীর্ঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির স্বীকৃতি। তবে এটি যাত্রার শেষ নয়। ২০২৯ সালে বাংলাদেশ তালিকা থেকে বেরিয়েছে কি না—সেটি প্রশ্ন নয়; বরং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরেছে কি না, রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা বেড়েছে কি না, তরুণেরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা পাচ্ছেন কি না এবং নতুন শিল্প বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারছে কি না। তাই বাড়তি তিন বছর কেবল সময় পেছানোর সুযোগ নয়; এটি অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেই ২০২৯ সাল হবে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক যাত্রার সূচনা।
- সামিয়া জাহান: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়।
.png)
-028855-256x144.webp)









