ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা: ভেস্তে যাচ্ছে যুদ্ধবিরতি, ট্রাম্পের শান্তিচুক্তি গভীর সংকটে

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ১৩: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

এপ্রিল মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতির দেয়াল ভেঙে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি সংঘাতের আগুন। লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরান ও ইয়েমেনের ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং তার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরানের মূল ভূখণ্ডে তেল আবিবের পাল্টা নজিরবিহীন বোমাবর্ষণ পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ওয়াশিংটন যখন তেহরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি অনুরোধ ও প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই সামরিক পদক্ষেপ হোয়াইট হাউসের সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ‘সব সিদ্ধান্ত আমার, নেতানিয়াহুর নয়’ বলে নিজের অনড় অবস্থান ও কঠোর মনোভাব প্রকাশ করলেও, ইসরায়েলি বাহিনীর এই একক সিদ্ধান্ত বিশ্বমঞ্চে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক কর্তৃত্বকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে মেজর জেনারেল ইয়াল জামিরের নেতৃত্বে ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের আকস্মিক ব্যালিস্টিক আক্রমণ, অন্যদিকে সম্ভাব্য আরও বড় পরিসরে আইআরজিসির পাল্টা আঘাতের হুমকি চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ঝুলিয়ে দিয়েছে।

সাময়িকভাবে ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার আকাশসীমা বন্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধাবস্থা এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

‘সব সিদ্ধান্ত আমার, নেতানিয়াহুর নয়’

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে (এফটি) দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ও অনড় ভাষায় বলেন:

‘ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের চুক্তিই করুক না কেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তা মেনে নিতে হবে। তার সামনে অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমিই নিই। সব সিদ্ধান্ত আমি নিই। তিনি (নেতানিয়াহু) সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নন।’

ফক্স নিউজকে ট্রাম্প জানান, তিনি নেতানিয়াহুকে ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দেবেন। কিন্তু মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, ট্রাম্প ফোন করে নেতানিয়াহুকে শান্ত থাকার অনুরোধ করার পরেও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে।

নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের এই ক্ষোভের পারদ অনেকদিন ধরেই চড়ছিল। গত সপ্তাহে এই দুই নেতার একটি উত্তপ্ত ফোনালাপের তথ্য ফাঁস হয়, যেখানে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘তুমি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ। আমি না থাকলে তুমি এত দিনে কারাগারে থাকতে। এখন সবাই তোমাকে ও ইসরায়েলকে ঘৃণা করে।’

হোয়াইট হাউসের এই প্রকাশ্য অসন্তোষ সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর একক সিদ্ধান্তে ইরানে হামলা চালানো স্পষ্ট করে দেয়, মার্কিন চাপ এখন আর ইসরায়েলের যুদ্ধনীতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে ট্রাম্পের নিজস্ব মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের এই অনমনীয় মনোভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতিকেই ভেস্তে দিচ্ছে না, বরং বিশ্বমঞ্চে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক কর্তৃত্বকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

ইরানে ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলা, নেতৃত্বে জামির

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশ ও অনুরোধকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সোমবার ভোরে ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল ইয়াল জামিরসহ জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা গত কয়েক ঘণ্টা ধরে অনবরত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন।

সামরিক বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরও নিশ্চিত করেছে যে, মেজর জেনারেল জামির এবং ঊর্ধ্বতন ইসরাইলি কর্মকর্তারা সরাসরি ইরানে এই হামলার দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। আইডিএফের যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপে মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। আইডিএফ তাদের বিবৃতিতে আরও জোর দিয়ে বলেছে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এমন যেকোনো পক্ষের বিরুদ্ধে সব সেক্টরে অভিযান চালিয়ে যেতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।

এই নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিল, তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা কৌশল হোয়াইট হাউসের কূটনৈতিক চাপের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইসরায়েলি কমান্ডের এই একক সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের পুরো ভূ-রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে পাশ কাটিয়ে ইরান ও ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধবিগ্রহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংঘাতের সম্ভাব্য চরম পরিণতি হিসেবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তিটি চিরতরে ভেস্তে যেতে পারে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন মধ্যস্থতার কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরায়েল আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হেনেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ প্রকাশিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাজধানী তেহরান, তাবরিজ ও ইস্পাহান শহরে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

মেহর নিউজ এজেন্সির খবর বলছে, মধ্যাঞ্চলের কারাজ শহরের পাশেও বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ হয়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় তেহরানের ইমাম খামেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাইরে থেকে আসা সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরান খামেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সম্ভাব্য আরও হামলার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং একই পথ অনুসরণ করে সাময়িকভাবে নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ইরাক ও সিরিয়াও। দেশ দুটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এএফপি-কে নিশ্চিত করেছেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সাধারণত এই রুট ব্যবহার করার কারণেই তারা আকাশপথ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। এই ব্যাপক বিমান নিষেধাজ্ঞার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

ইরান ও ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত

রোববার রাতে চলমান যুদ্ধবিরতির নীতি লঙ্ঘন করে ইরান অন্তত তিন দফায় ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে, তারা উত্তর ইসরায়েলের হাইফা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি’ লক্ষ্য করে এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করেছে।

আইআরজিসির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে, এই নির্দিষ্ট ইসরায়েলি বিমানঘাঁটিই ছিল দক্ষিণ লেবানন এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে চালানো সাম্প্রতিক ‘আগ্রাসনের মূল উৎস’। এই হামলার সমসাময়িক সময়ে আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে ইয়েমেন থেকেও ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় বলে আইডিএফ নিশ্চিত করেছে।

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা বৈরুতের রাজধানীতে ইসরায়েলি হামলার জবাবে এই পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে, লেবাননে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের প্রতিশোধ হিসেবেই ইরান ও ইয়েমেন যৌথভাবে এই বড় ধরনের রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি পরিচালনা করে। এই সমন্বিত আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া পূর্ববর্তী সমস্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ইরান ও ইয়েমেনের এই আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর জেরুজালেম, তেল আবিবসহ সমগ্র মধ্য ইসরায়েলের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধকালীন সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর খবর অনুযায়ী, একের পর এক সাইরেনের শব্দে পুরো ইসরায়েল জুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইরান থেকে আসা এই হুমকি ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। তাদের পক্ষ থেকে এও দাবি করা হয়েছে যে, তাদের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করেছে এবং তারা ‘এখন পর্যন্ত’ আগত সবকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলি ডিফেন্স সিস্টেম আকাশেই অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়নের পর আইডিএফ দেশজুড়ে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়। তবে আইআরজিসি পাল্টা হুমকি দিয়ে রেখেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এর চেয়েও আরও বড় পরিসরে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

সংকটে ট্রাম্পের শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি

এই ভয়াবহ সংঘাত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি করার প্রক্রিয়াকে চরম জটিল করে তুলেছে, যা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খোদ ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা করেছিলেন, চলতি সপ্তাহের সোম, মঙ্গল বা বুধবারের মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতো, কিন্তু রোববারের এই হামলা চুক্তির ভবিষ্যৎকে ঝুলিয়ে দিল। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।

সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। রয়টার্সের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৫ দশমিক ৫০ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯২ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে।

এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে এবং গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতি ব্যারেলের দাম প্রায় ৯৫ ডলারের আশপাশেই ঘোরাফেরা করছে। এমতাবস্থায় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে পাশ কাটিয়ে ইরান ও ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধবিগ্রহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংঘাতের সম্ভাব্য চরম পরিণতি হিসেবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তিটি চিরতরে ভেস্তে যেতে পারে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন মধ্যস্থতার কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।

একই সঙ্গে, যদি ইসরায়েলের এই অনমনীয় মনোভাবের জবাবে ইরান তাদের হুমকি অনুযায়ী আরও বড় পরিসরে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থে আঘাত হানে, তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার জেরে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ যদি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়বে। ফলস্বরূপ, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যা ইতিমধ্যেই ধুঁকতে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন ও দীর্ঘস্থায়ী মন্দার জন্ম দিতে পারে।

নেতানিয়াহুর একক যুদ্ধনীতি এবং ইরানের পাল্টা প্রতিরোধের এই বিপজ্জনক বৃত্ত থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে না পারলে, এর চড়া মূল্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, বরং পুরো বিশ্বকে চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত