leadT1ad

তারেক রহমান: নির্বাসন থেকে নেতৃত্বে, সম্ভাবনার মুহূর্তে বড় পরীক্ষা কোনটি

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে কেমন করবেন তারেক রহমান? ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোনীত হন তিনি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থেকে মূলত তিনিই দল পরিচালনা করেছেন। তবে, এটা মানতেই হবে যে, তখন খালেজা জিয়া ছিলেন। মামলা আর অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তাঁর প্রতীকী কর্তৃত্ব দলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথ চলা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে দলের বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। ২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে তাঁকে মনোনীত করেন এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে নির্মম অত্যাচারে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন; জীবননাশের সম্ভাবনাও দেখা দেয়। শারীরিক অবস্থার ভয়াবহ অবনতি হলে আদালতের নির্দেশে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডন যেতে হয়। পরে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান আর দেশে ফিরতে পারেননি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেড় যুগের নির্বাসন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটে। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি ক্রমে দেশ ও জাতির আশা ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। ফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশ্ন আর কেবল দলীয় বিষয় হয়ে থাকছে না; দেশের স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তিনি এই বিশাল দায়িত্ব কতটা দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে বহন করতে পারবেন।

২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। বর্ষীয়ান রাষ্ট্র-চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫) বলেছিলেন, ‘১৯৫২ থেকে যত গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এটিই সবচেয়ে ব্যাপক।’ গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সাধারণত এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশ নানামুখী চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। চরম অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ওপর মানুষের আস্থাহীনতা; এই বাস্তবতায় তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন।

গণঅভ্যুত্থানের পর আসন্ন নির্বাচনে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য এমন এক নেতৃত্বের প্রয়োজন, যিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ, কিংবা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে বিবেচনা করবেন। যিনি আপসকামী হবেন না, প্রতিহিংসাপরায়ণ হবেন না; যিনি নৈতিকতায় দৃঢ় থাকবেন, ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হবেন না; ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নয় বরং গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে দেখবেন। এমন নেতৃত্বই পারে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে নতুন করে প্রাণবন্ত করতে; সংসদ, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে কার্যকর ও আস্থা-যোগ্য করে তুলতে। এখন প্রশ্ন হলো এমন নেতৃত্ব দিতে তারেক রহমান কতটা প্রস্তুত ও আন্তরিক?

ইতিহাসে দেখা যায়, কর্তৃত্ববাদী শাসন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও মতাদর্শিক সংঘাতের শিকার হয়ে বহু নেতাকে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দমননীতি, ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারা কিংবা জনপ্রিয় নেতৃত্বকে ভয় পাওয়ার ফলেই নির্বাসন অনেক সময় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নির্বাসন সবসময় নেতাদের দুর্বল করেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা তাদের নেতৃত্বকে আরও গভীর, পরিণত ও ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ক্ষমতার বাইরে থেকে হয়তো বুঝতে পারেন সাধারণ মানুষের কষ্ট, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের প্রকৃত অর্থ। ফলে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তারা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং ইতিহাসের বাঁক ঘোরানো রাষ্ট্রনায়কে আবির্ভূত হন।

নির্বাসিত-জীবন নেতৃত্বের পরিশুদ্ধি ও পরিণতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু মহান নেতা নির্বাসনের সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনকে শাণিত করেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে নতুন পথের সূচনা করেছেন। নির্বাসন তাদের মধ্যে সহনশীলতা, ধৈর্য ও দূরদর্শিতা তৈরি করেছে; যা পরে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এমনই একজন নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী এপারথেইড ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কারণে তিনি ১৯৬২ সালে গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৬৪ সালে ঐতিহাসিক রিভোনিয়া মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। দীর্ঘ ২৭ বছর (১৯৬৪-১৯৯০) তিনি কারাবাস করেন, যার বেশিরভাগ সময় কাটে রবেন দ্বীপের কারাগারে; স্যাঁতসেঁতে কক্ষে বন্দিত্ব, পাথর ভাঙার কঠোর শ্রম, পরিবারের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ। পরে তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটান এবং সেখানে প্রথম গণতান্ত্রিক ও বহুজাতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন; যার ফলস্বরূপ তিনি দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হন। এছাড়া তিনি শান্তি, সমতা, মানবাধিকার ও পুনর্মিলনের জন্য বিশ্বব্যাপী সংগ্রাম করেছেন।

তারেক রহমান কি পারবেন ভঙ্গুর এই দেশের ভার বহন করে দেশকে প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে? আমরা নেলসন ম্যান্ডেলার উদাহরণ দিয়েছি, সেখানে দেখা গেছে, নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতায় থাকার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে না; অনেক সময় তা গড়ে ওঠে সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্বাসন ও আত্ম-রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবাসের পর প্রতিহিংসার রাজনীতি বেছে নেননি; বরং বিভক্ত জাতিকে ঐক্যের পথে নিয়েছিলেন।

ইতিহাসের পাতায় এমন আরও বহু উদাহরণ আছে, যেখানে ব্যক্তিগত কষ্ট ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন একজন নেতাকে আরও পরিণত, সহনশীল ও দূরদর্শী করে তুলেছে। তারেক রহমানেরও দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান, রাজনৈতিক চাপ, মামলা-মোকদ্দমা ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতা; এসব তাঁকে এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এইসব অভিজ্ঞতা কি তাঁকে কেবল একজন ক্ষমতা-প্রত্যাশী রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে তুলেছে, নাকি একজন পরিণত রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে? তা সময়ই বলে দেবে।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণে মার্টিন লুথার কিংয়ের উদাহরণ টেনে তারেক রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, ‘আমার দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’ এই ‘পরিকল্পনা আছে’ বা পরিকল্পনাটি পেশ করলেই; অথবা তারেক রহমান তাঁর চেয়ার সরিয়ে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসলে, জন্মভূমিতে এসে পায়ে মাটি স্পর্শ করলে; এমনকি সাধারণ মানুষের গলা ধরে একাত্মতা প্রকাশ করলেও; তারেক রহমানের সামনে যে চ্যালেঞ্জ তা উৎরে যেতে তিনি পারবেন না। তবে নিঃসন্দেহে এই গুণগুলো ভালো, প্রশংসনীয়।

সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের অবস্থান ও বিভিন্ন বক্তব্যে মানুষের মধ্যে ইতিবাচকভাবে সাড়া ফেলছে। দেশের এই ক্রান্তিকালে মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রাখছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা, ভীতি ও বিভাজনের আবহ তৈরি হয়েছে, সেখানে তাঁর কণ্ঠে তুলনামূলক সংযম, দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যতমুখী চিন্তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তিনি কেবল ক্ষমতা অর্জনের কথা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার কথাও তুলে ধরছেন। বিশেষ করে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার যে বার্তা তিনি দিচ্ছেন, তা জনমনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

দেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ ও শত্রুভাবাপন্ন রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রকে দুর্বল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এর বিপরীতে তারেক রহমান বলেছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন মানেই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। মানুষের আশা ও বাস্তবতার মধ্যে নিশ্চয়ই পার্থক্য থাকে; তবে প্রতিহিংসা ও কর্তৃত্ববাদের বাইরে গিয়ে তুলনামূলক সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও জনগণমুখী রাজনৈতিক ধারার সূচনা সম্ভব।

২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি শাসনামলের প্রেক্ষাপটে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি তারেক রহমান ও তথাকথিত ‘হাওয়া ভবন’কে কেন্দ্র করে নানান অভিযোগ ও সমালোচনা সামনে আনে। এসব অভিযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে জনমনে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। বিশেষ করে তখনকার রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এই ভাবমূর্তিকে আরও জটিল করে তোলে।

রাজনীতিতে অভিযোগ-প্রতি-অভিযোগ নতুন কিছু নয়; তবে দীর্ঘ সময় ধরে একমুখী প্রচার চলতে থাকলে তা জনমতকে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—গঠনমূলক কাজ, দায়িত্বশীল আচরণ ও দৃশ্যমান ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে জনমনে আস্থা অর্জন। দীর্ঘ সময় ধরে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে হলে সময়, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।

আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি যদি সরকার গঠন করে—এমন ধারণাই রাজনৈতিক অঙ্গনে ও জনমনে ব্যাপকভাবে আলোচিত; তখন তারেক রহমান ও বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ক্ষমতার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকার গঠন করা কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ, জটিল ও দায়িত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সফল হতে পারলেই প্রকৃত অর্থে জনগণের আস্থা অর্জন এবং তা ধরে রাখা সম্ভব। ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিপক্ষকে দমনের মানসিকতা পরিহার করে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্রের মূল শক্তি নিহিত থাকে ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যে।

প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই প্রমাণ হবে যে তারেক রহমান ক্ষমতার রাজনীতির নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়বদ্ধতার কথাই ভাবছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ উদ্যোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং জবাবদিহির একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জনগণ কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন—যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দেবে।

দলের অভ্যন্তরে কোন্দল থাকলেও, তা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয়। তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন দলের ভেতরে বিভাজনের আশঙ্কা কমিয়েছে এবং তিনি ঐক্যের প্রতীক হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন। স্মরণ করা যেতে পারে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিগত আওয়ামী সরকার কিংবা শেখ হাসিনার দমন–পীড়ন ও প্রলোভনের নানা কৌশল সত্ত্বেও বিএনপি ভাঙেনি; উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা দলত্যাগ করেননি কিংবা বহিষ্কারের মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়নি। এটি কেবল বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য বা ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতার ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা—বড় দল ছেড়ে বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কার্যত এক ধরনের নির্বাসিত জীবনে প্রবেশ করার আশঙ্কা, যা অধিকাংশ নেতাকেই নিরুৎসাহিত করে।

ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয় যে, একসময় বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন বিএনপির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মূলধারার রাজনীতি থেকে কার্যত হারিয়ে যান; একইভাবে অলি আহমেদ, গুরুত্বপূর্ণ এই নেতাও হারিয়ে যান। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভিন্ন নয়। একসময় আওয়ামী লীগ বলতে যে কজন মানুষের মুখ সামনে ভেসে উঠত, তাঁদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ ও আমির হোসেন আমু ছিলেন অগ্রগণ্য। শেখ হাসিনা তাঁদের প্রেসিডিয়াম সদস্যের মতো কার্যকর পদ থেকে উপদেষ্টা পর্যায়ে উন্নীত করেন; যা মূলত রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখার একটি কৌশল। আর তাঁরা আওয়ামী লীগ পরিচয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছার অভিপ্রায়ে নীরবে সব মেনে নেন।

সবকিছুর আগে তারেক রহমানকে পার হতে হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কঠিন বৈতরণী। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মাঠে অনুপস্থিত—নিষিদ্ধ। ফলে নতুন প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ধর্মীয় লেবাসে মোড়ানো জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট, যেখানে ছোট ছোট ধর্মভিত্তিক দলের সমাহার ঘটেছে। এই অপরিচিত ও ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়াই বিএনপির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।

ইতিহাস তারেক রহমানকে এক কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় মুহূর্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি যদি নির্বাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে কেবল বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি চাইলে একজন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ হতে পারেন। আবার পরিণত, সংযত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার পথও বেছে নিতে পারেন—সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে, তখন, কী হয় তাঁর ভূমিকা; সময়ই এর চূড়ান্ত রায় দেবে।

হানিফ রাশেদীন: কবি ও কথাসাহিত্যিক

Ad 300x250

সম্পর্কিত