জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দিল্লি-তেল আবিব ঘনিষ্ঠতা: মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার জটিল রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩: ০৩
ইসরায়েলি পার্লামেন্ট 'নেসেট'-এ নরেন্দ্র মোদি। সংগৃহীত ছবি

২০১৭ সালের ঐতিহাসিক সফরের পর ২০২৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় ইসরায়েল সফর বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এই সফর প্রমাণ করে ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আর কেবল সামরিক বা বাণিজ্যিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি শক্তিশালী আদর্শিক ও কৌশলগত জোটে রূপ নিয়েছে।

ইসরায়েলি পার্লামেন্ট 'নেসেট'-এ মোদির ভাষণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে ১০ বিলিয়ন ডলারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এই জোটের গভীরতা ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যেরই ইঙ্গিত দেয়। দিল্লি ও তেল আবিবের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। ভারতের ইসরায়েলমুখী নীতি ঢাকার দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের বিপরীতে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

২০২৬ সালের জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক অবস্থান কেবল 'ধর্মীয় আবেগ' বা 'ঐতিহাসিক সংহতি' দিয়ে নয়, বরং কঠোর ‘বাস্তববাদ’ এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের নিরিখে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

প্রতিরক্ষা ভারসাম্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা

ভারত ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অংশীদারত্ব দক্ষিণ এশিয়ার প্রথাগত প্রতিরক্ষা কাঠামোতে একটি বড় ধরনের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। ইসরায়েলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকাকে এখন নতুন করে তার প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে।

সামরিক আধুনিকায়ন ও বাজেটের চাপ

ভারতের মোট প্রতিরক্ষা আমদানির প্রায় ৩৪ শতাংশ এখন ইসরায়েল থেকে আসায় দিল্লি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। এই অত্যাধুনিক সামরিকায়ন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ও বার্ষিক বাজেটে একটি পরোক্ষ কিন্তু শক্তিশালী চাপ তৈরি করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশকে তার সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়নে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় নতুন প্রযুক্তির সংযোজন এখন সময়ের দাবি। এরফলে উন্নয়নের অন্যান্য খাত থেকে অর্থ সরিয়ে প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগের একটি সুপ্ত প্রতিযোগিতা তৈরির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

নজরদারি প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা চ্যালেঞ্জ

ইসরায়েলি 'পেগাসাস'-এর মতো উন্নত নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার আঞ্চলিক গোয়েন্দা তৎপরতার ধরনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসছে। ভারতের এই সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সাইবার পরিসরে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ বা 'থ্রেট পারসেপশন' তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং তথ্য পাচার রোধে বাংলাদেশকে এখন আরও শক্তিশালী সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং সীমান্তে নজরদারির ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগত বৈষম্য দ্বিপক্ষীয় আস্থার ওপর প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে। তাই আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য প্রধান কৌশলগত লড়াই।

মধ্যপ্রাচ্য ও ‘আইএমইসি’ করিডোর

ভারত ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এক নতুন বাণিজ্যিক মেরুকরণ সৃষ্টি করছে। ‘আইএমইসি’ করিডোরের মাধ্যমে ভারতকে ইউরোপের সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির প্রভাবকে আরও সুসংহত করছে। এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন নতুন অর্থনৈতিক পথের হাতছানি দিচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি করছে কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

হেক্সাগন জোট ও বৈশ্বিক মেরুকরণ

নেতানিয়াহু প্রস্তাবিত ‘হেক্সাগন’ বা ছয় জাতির জোটে (ভারত, ইসরায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাসসহ অন্যান্য) ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্ব রাজনীতিতে দিল্লির শক্তিশালী অবস্থানের প্রতিফলন। এই সমন্বয় কেবল একটি সামরিক জোট নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্লকে পরিণত হতে চলেছে।

এই জোটের মাধ্যমে ভারত মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তার করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সমীকরণকে বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই নতুন জোটের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং ওআইসি সদস্য দেশগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের বড় পরীক্ষা।

আইএমইসি করিডোর ও ফিলিস্তিন ইস্যু

‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর’ (আইএমইসি) ভারতকে দুবাই ও সৌদি আরব হয়ে সরাসরি ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য যেমন বাণিজ্যের নতুন পথ খুলে দিচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের সাথে এক ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। ওআইসি-র সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের কট্টর সমর্থক, যা ভারতের এই ইসরায়েল-বান্ধব করিডোরের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

আদর্শিক সমীকরণ ও জনমত

ভারতের ‘হিন্দুত্ববাদ’ এবং ইসরায়েলের ‘জায়নবাদ’—এই দুই রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে বিশ্লেষকরা যে আদর্শিক সাযুজ্য খুঁজে পাচ্ছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার জনমতে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গাজা সংকটের সময় মোদি সরকারের ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ অবস্থান বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই আদর্শিক মেরুকরণ বাংলাদেশে প্রায়ই তীব্র ভারত-বিরোধী মনোভাব বা রাজনৈতিক অস্থিরতার খোরাক জোগায়, যা দ্বিপক্ষীয় আস্থার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকার নতুন প্রশাসনের জন্য দিল্লির এই নীতিগত অবস্থান সামলানো এখন একটি কঠিন কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার নাম।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সংহতি রক্ষা এবং একই সাথে নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা এখন ঢাকার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজপথে এই ইস্যুতে জনমতের বহিঃপ্রকাশ বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা

২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ভারতের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। চাবাহার বন্দর প্রকল্প থেকে ভারতের সরে আসা এবং ইসরায়েল-বান্ধব করিডোরে অধিক গুরুত্ব প্রদান আঞ্চলিক সংযোগের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বন্দ্বে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা ঢাকার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চাবাহার থেকে আইএমইসি: ভারতের কৌশল পরিবর্তন

ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে চাবাহার বন্দরের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়া এবং ইসরায়েল-সংযুক্ত ‘আইএমইসি’ (আইএমইসি) করিডোরের প্রতি ঝুঁকে পড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি পরিষ্কার সংকেত। ভারত এখন রাশিয়ার সাথে যুক্ত উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের (আইএনএসটিসি) চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপগামী ইসরায়েল-বান্ধব রুটকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের ফলে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শিয়া-প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের শীতলতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ, কারণ চাবাহার ছিল মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর একটি বিকল্প ও সহজ পথ। ভারতের এই পিছুটান আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বহুমুখী রুট ব্যবহারের সুযোগকে সীমিত করে দিচ্ছে।

ঢাকার অবস্থান ও বিকল্প জোটের হাতছানি

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং জ্বালানি আমদানির গভীর নির্ভরতা ঢাকাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে। ভারত যদি সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েল-আমেরিকা ব্লকে চলে যায়, তবে বাংলাদেশ কি তার প্রথাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে, নাকি চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের মতো বিকল্প কোনো জোটে ঝুঁকবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। ওআইসি-র সদস্য হিসেবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে সংহতির কারণে বাংলাদেশের ওপর এই বিকল্প ব্লকে যোগ দেয়ার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ কাজ করতে পারে।

দিল্লি ও তেল আবিবের এই নবগঠিত ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে একটি দ্বিধারী তলোয়ারের মতো আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমৃদ্ধি এবং আইএমইসি করিডোরের বিস্তার বাংলাদেশের বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা বৈষম্য ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে গভীর নীতিগত পার্থক্য ঢাকার জন্য এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক অবস্থান কঠোর 'বাস্তববাদ' ও জাতীয় স্বার্থের নিরিখে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ভারতের ইসরায়েল-নির্ভরতা একদিকে যেমন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের জন্য বিকল্প বাণিজ্যিক ও কৌশলগত জোটের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করে তুলছে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ঢাকাকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রদর্শন করতে হবে। মোদির এই সফর প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এখন আর কোনো অবস্থানই স্থির নয়; তাই পরিবর্তনশীল এই বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কৌশলী ও দূরদর্শী হওয়ার বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত