জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

লেখা-পড়ার বিলুপ্তি: প্রযুক্তি কি সভ্যতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ৩১
মানুষের জানার আগ্রহ, প্রশ্ন করার সাহস এবং লিখে-পড়ে বিশ্লেষণ করার অভ্যাস থেকেই বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ। স্ট্রিম গ্রাফিক

লেখা-পড়া, কিংবা পড়া-লেখা—এই দুই শব্দের মধ্যেই মানবসভ্যতার ইতিহাস, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা। আধুনিক সভ্যতার সূচনা হয়েছিল মূলত লেখা-পড়ার হাত ধরেই। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বাঁক এসেছিল লিপির উদ্ভাবনের মাধ্যমে। স্মৃতি ও মৌখিক বয়ানের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মানুষ যখন লিখে জ্ঞান সংরক্ষণ করতে শিখল, তখনই সভ্যতার ভিত শক্ত হতে শুরু করল। লিখিত জ্ঞান মানুষকে শুধু অতীতের অভিজ্ঞতা ধরে রাখার সুযোগই দেয়নি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিন্তা, গবেষণা ও আবিষ্কারের পথও উন্মুক্ত করেছে।

প্রাচীনকালে শিক্ষা ছিল মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও গুরু-শিষ্য সম্পর্কনির্ভর। শিক্ষাগুরু কিংবা ধর্মযাজকদের তত্ত্বাবধানে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে, অথবা টোলের পণ্ডিতের হাত ধরে যে পড়াশোনার সূচনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র ছিল না; বরং যুক্তি, বিশ্লেষণ, বিতর্ক ও চিন্তাচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গেই মানবসভ্যতার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।

এই শিক্ষাব্যবস্থার হাত ধরেই বিজ্ঞান অভূতপূর্ব উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। মানুষের জানার আগ্রহ, প্রশ্ন করার সাহস এবং লিখে-পড়ে বিশ্লেষণ করার অভ্যাস থেকেই বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ। একপর্যায়ে মানুষ প্রবেশ করে ইলেকট্রনিকস যুগে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা বিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে গবেষণা চালিয়ে ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞানের ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেন।

প্রাচীনকালে শিক্ষা ছিল মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও গুরু-শিষ্য সম্পর্কনির্ভর। শিক্ষাগুরু কিংবা ধর্মযাজকদের তত্ত্বাবধানে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে, অথবা টোলের পণ্ডিতের হাত ধরে যে পড়াশোনার সূচনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে।

এরই ধারাবাহিকতায় কম্পিউটার প্রযুক্তির উদ্ভব ঘটে, পরবর্তীতে যুক্ত হয় ইন্টারনেট। তথ্য ও জ্ঞানের আদান-প্রদান হয় দ্রুততর, সহজতর এবং বৈশ্বিক। সভ্যতা এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে—উন্নত থেকে আরও উন্নতের দিকে—অবিরাম এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতার মধ্যেই নীরবে জন্ম নেয় এক গভীর সংকট।

অডিও-ভিডিও মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের দেখার ও শোনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। চোখে দেখা ও কানে শোনা এখন জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফলে পড়ার অভ্যাস ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বই, দীর্ঘ লেখা কিংবা গভীর চিন্তাভিত্তিক পাঠ্যবস্তুর জায়গা দখল করে নিচ্ছে সংক্ষিপ্ত ভিডিও, রিলস ও ত্বরিত ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট। ধৈর্য ধরে পড়া, অনুধাবন করা এবং ভাবনার স্তরে পৌঁছানোর প্রবণতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিঃসন্দেহে মানবজীবনে অনেক সুবিধা এনে দিয়েছে, কিন্তু এর একটি বড় অনিচ্ছাকৃত প্রভাব হলো মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও লেখালেখির প্রবণতা দুর্বল হয়ে পড়া। নিজে লিখে প্রকাশ করার বদলে চ্যাটজিপিটি এবং অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করছে। এক কথায় বলতে গেলে, অডিও–ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট আমাদের বই পড়ার অভ্যাস কেড়ে নিয়েছে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত গ্রাস করছে লেখার অভ্যাস ও চিন্তার গভীরতা। এর ফলে লেখা ও পড়া—এই দুই মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন বিলুপ্তপ্রায় হয়ে উঠছে।

এই প্রবণতার পরিণতি অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। বর্তমান প্রজন্ম যা দেখছে এবং যা শুনছে, সেটাকেই নির্দ্বিধায় সত্য বলে গ্রহণ করছে। যাচাই, বিশ্লেষণ কিংবা গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন তারা আর অনুভব করছে না। পড়া ও চিন্তার অভ্যাস কমে যাওয়ায় সত্য-মিথ্যা যাচাই করার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজকের ‘মব সন্ত্রাস’ এই প্রবণতারই একটি সরাসরি ফল। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা বহুগুণে বাড়তে পারে। কারণ পড়া ও গভীর চিন্তার মাধ্যমে যে বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তিবোধ ও বিচারবুদ্ধি গড়ে ওঠে, তা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত না হলে মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার হাত ধরেই বিজ্ঞান অভূতপূর্ব উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। মানুষের জানার আগ্রহ, প্রশ্ন করার সাহস এবং লিখে-পড়ে বিশ্লেষণ করার অভ্যাস থেকেই বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ। একপর্যায়ে মানুষ প্রবেশ করে ইলেকট্রনিকস যুগে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা বিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে গবেষণা চালিয়ে ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞানের ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেন।

এর সামাজিক পরিণতিও ভয়াবহ। মানুষ সহজেই মোহগ্রস্ত হবে, ভোগবাদী মানসিকতা তীব্রতর হবে, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটবে। সমাজে সহনশীলতা কমবে, মানবিক সম্পর্ক দুর্বল হবে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন আরও জটিল ও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এই ধারাবাহিকতায় এক সময় আধুনিক সভ্যতা নিজেই নিজের ভিত হারিয়ে ফেলতে পারে—যেখানে প্রযুক্তিগত উন্নতি থাকলেও মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে মানুষ হয়ে উঠবে শূন্য ও দেউলিয়া।

পরিস্থিতি এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে জীবিত মানুষরাই নিজেদের কবরবাসীদের চেয়েও বেশি দুর্ভাগ্যবান মনে করবে। কারণ তারা বেঁচে থেকেও চিন্তা করতে পারবে না, উপলব্ধি করতে পারবে না, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারবে না। শারীরিক অস্তিত্ব থাকলেও মননশীলতা ও বিবেকবোধ লুপ্ত হয়ে যাবে।

তাই, একটি সত্য স্পষ্টভাবে স্বীকার করতেই হবে—লেখা-পড়া শুধু একটি শিক্ষাগত দক্ষতা নয়; এটি মানুষের মনন, বিবেক, নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি নীরবে ক্ষয়ে যেতে থাকে, তবে প্রযুক্তিগত উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও মানুষ প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়বে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ নেই।

এই সংকটের মূল কারণ হলো প্রযুক্তি উন্নয়ন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কোনো নৈতিক মানদণ্ড কিংবা মানবিক দিকনির্দেশনার অভাব। প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ হলেও, বাজার অর্থনীতির হাত ধরে যখন তা লাগামহীন গতিতে বিকশিত হয়, তখন মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের প্রশ্নগুলো ক্রমশ গুরুত্ব হারাতে থাকে। মুনাফা ও প্রতিযোগিতার চাপে প্রযুক্তি উন্নয়ন প্রক্রিয়া এমনভাবে এগোয় যে মানুষ আর মুখ্য হয়ে ওঠে না; সে পরিণত হয় কেবল একটি সংখ্যা বা একজন ‘ভোক্তা’তে।

শৈশবকাল থেকেই যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজ সম্মিলিতভাবে এই মূল্যবোধগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চার করতে পারে, তবে তা টিকার মতো কাজ করবে যা শুধু বাহ্যিক সুরক্ষা নয়, বরং তাদের অন্তরে এক ধরনের নৈতিক ‘ইমিউনিটি’ তৈরি করবে। এই ইমিউনিটি ভবিষ্যতে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তুলবে।

এই বাস্তবতার পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বর্তায় বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি উন্নয়নকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদিও বাস্তবতার নিরিখে এটি সহজ কাজ নয়, এমনকি সম্ভবও নাও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব এবং নীরব দর্শকের মতো এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করব? নিশ্চয়ই নয়।

রাষ্ট্র চাইলে প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে। আর এই প্রভাব সবচেয়ে কার্যকর হয় তখনই, যখন তা শৈশব থেকেই শুরু হয়, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেবল দক্ষতা অর্জনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বিবেচনাবোধের বিকাশ।

শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে—কোন ব্যবহার কল্যাণকর, কোনটি ক্ষতিকর; কোনটি গ্রহণযোগ্য, আর কোনটি অনুচিত।

শৈশবকাল থেকেই যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজ সম্মিলিতভাবে এই মূল্যবোধগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চার করতে পারে, তবে তা টিকার মতো কাজ করবে যা শুধু বাহ্যিক সুরক্ষা নয়, বরং তাদের অন্তরে এক ধরনের নৈতিক ‘ইমিউনিটি’ তৈরি করবে। এই ইমিউনিটি ভবিষ্যতে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তুলবে।

তবে এই কাজটি উপদেশনির্ভর বক্তৃতা বা কঠোর বিধিনিষেধের মাধ্যমে সফল করা সম্ভব নয়। এটি করতে হবে উদ্ভাবনী, অংশগ্রহণমূলক ও আনন্দমুখর উপায়ে—বিশেষ করে এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রমের মাধ্যমে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘ওয়েল-বিয়িং ক্লাব’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিক্ষার্থীরা সহশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তির সুফল ও কুফল সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক উপলব্ধি অর্জন করতে পারবে এবং প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করার কৌশল শিখতে পারবে।

ওয়েল-বিয়িং ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিখবে—প্রযুক্তি মানুষের সেবক হবে, নিয়ন্ত্রক নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে যদি এই বোধ, সচেতনতা ও নৈতিক শক্তি তুলে দেওয়া যায়, তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আর মানবিক অবক্ষয়ের কারণ হবে না; বরং তা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ

বিষয়:

মতামত
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত