বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকবার শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত রূপান্তরের সুযোগ এসেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় ছিল প্রথম ঐতিহাসিক ক্ষণ, যখন নতুন রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে শিক্ষা পুনর্গঠনেরও সুযোগ তৈরি হয়েছিল। একইভাবে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের পরও শিক্ষায় সংস্কারের সম্ভাবনা জেগেছিল। কিন্তু দুই সময়েই আমরা কাঙ্ক্ষিত গুণগত সংস্কার নিশ্চিত করতে পারিনি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে যে পরিবর্তনগুলো এসেছে, সেগুলো বেশিরভাগই শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের প্রয়াস ছিল। শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে অগ্রাধিকার নির্ধারণ না করে সবাই জনতুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছে।
সরকার বদলালে শিক্ষানীতিও নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ঘূর্ণিতে পড়ে দিক পরিবর্তন করেছে। ফলে সংস্কারগুলো টেকসই হয়নি, বরং সাময়িক ও অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের আরেকটি পরিবর্তনের সুযোগ হাতছানি দিয়ে ডাকছে, যে ডাকে সাড়া দিতে হলে আমাদের প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ৬টি এবং পরবর্তীকালে আরও ৫টিসহ মোট ১১টি বিশেষ সংস্কার কমিশন গঠন করলেও বিভিন্ন অংশীজনের দাবি সত্বেও কোনো শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করেনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে অন্তত ৩টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। সেগুলোর অধীনে বিগত সব সরকারের সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। আবার সেগুলোর ব্যর্থতার কারণও অনুসন্ধান করা হয়নি, কিংবা হলেও সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
উদাহরণস্বরূপ সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির কথাই বলা যাক। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এটি সীমিত পরিসরে চালু করে, আর ২০১০ সালে তা সারা দেশে একযোগে শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাইভেট কোচিং-মুখিনতা এবং মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার চর্চায় উৎসাহিত করা। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, এই পদ্ধতি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিসার্চ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কমপ্লিট এডুকেশন’ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছিল, সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পরও ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী গাইড বইয়ের সাহায্য নেয়, ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রে গৃহশিক্ষকের সহায়তা নেয় এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্রই বুঝতে পারে না। মাঝখান থেকে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য নেওয়া ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প পানিতে যায়।
এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো ‘আইসোমরফিজম’, অর্থাৎ উন্নয়ন সংস্থার বাহ্যিক চাপে বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই বাছাই না করে কয়েকটি দেশের শিক্ষা পদ্ধতি থেকে কপি-পেস্ট আর হাইব্রিডাইজেশন করে শিক্ষানীতি তৈরি করা। এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন একটি স্বাধীন কমিশন যা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং যুগোপযোগিতা যাচাই করে ‘হোম গ্রোউন’ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করবে।
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমিত সুযোগ ও বরাদ্দ, বেসরকারি খাতে স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কম এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দুর্বল হওয়ায় মেধাবীরা তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর সমাধানে উচ্চশিক্ষায় বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন।
কমিশন ইস্যুভিত্তিক টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন তৈরি করে প্রতিযোগিতামূলকভাবে গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করবে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ বিধি অনুসারে সেখানে অংশ নেবে। ফলে শিক্ষানীতি হবে টেকসই ও বাস্তবসম্মত। শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে যেন একাধারে বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সংখ্যক যোগ্য, দক্ষ, উৎপাদনক্ষম, উন্নত-চরিত্রবলসম্পন্ন কর্মী সৃষ্টি হয়; বাংলাদেশকে শক্তিশালী এবং মর্যাদাবান রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার ও পরিচালনা করার নেতৃত্ব ও জনবল তৈরি হয়; এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন, রাজনীতি, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রকৃত জ্ঞানী ও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এলডিসি উত্তোরণ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত জনশক্তি তৈরি
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হবে। এটি একটি মর্যাদার পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও বটে। এই উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে এবং তৈরিপোশাকের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে অবধারিতভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও পোশাক খাতে ব্যয় কমানো প্রয়োজন হবে। এর সঙ্গে জড়িত উৎপাদন ব্যবস্থার অটোমেশন এবং আসন্ন পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতিগ্রহণ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও শিল্প, উৎপাদন ও সেবা খাতে দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। অদক্ষতার কারণে দেশেরও উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনেরও হার কম।
ডাব্লিউআইপিওর ‘বিশ্ব উদ্ভাবন সূচক-২০২৩’ মতে, ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৫তম, স্কোর ২০ দশমিক ২। এ তালিকায় ভারত ৪০তম, পাকিস্তান ৮৮তম। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে কোন বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মূলধারার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পলিটেকনিক ও টেকনিক্যাল স্কুলগুলোর অবকাঠামো ও প্রশিক্ষকের মান উন্নয়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ সংযোগ, এবং জেলা পর্যায়ে স্কিল ম্যাপিং জরুরি।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধারাবাহিকতায় যে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অটোমেশন, রোবটিক্স, ব্লক চেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমে এখনো কোডিং, ডেটা লিটারেসি, অ্যালগরিদমিক বা এআই-সচেতনতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্ত অবস্থান পায়নি।
অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি শিক্ষা মানে শুধু কম্পিউটার ব্যবহার শেখাকে বোঝানো হয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সুবিধা বা কম্পিউটার চালনার দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। অথচ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রয়োজন হবে মেশিনের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা। এ লক্ষ্যে স্কুল পর্যায় থেকে ‘এসটিইএম’ শিক্ষাকে আধুনিকায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো বেশি প্রযুক্তি বিষয়ক ইন্টারডিসিপ্লিনারি প্রোগ্রাম চালু, এবং গবেষণা তহবিল বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদেরও প্রযুক্তি-সচেতন করা প্রয়োজন, কারণ নীতি প্রণয়ন, নৈতিকতা ও শাসন কাঠামোতেও এআই বড় প্রভাব ফেলবে। শিক্ষা যদি ভবিষ্যৎমুখী না হয়, তবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে কারিগরি শিক্ষায় জোরদান
কারিগরি শিক্ষার বর্তমান চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। কারিগরি শিক্ষার উপর ভিত্তি করে জাপান ও জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় ও পঞ্চম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার হার জাপানে ৭১ শতাংশ ও জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ, যা বাংলাদেশে মাত্র ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ২০১২ সাল থেকে যে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ ভোগ করছে সেটাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারার অন্যতম কারণ কারিগরি শিক্ষায় যথাযথ জোর না দেওয়া।
দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের কর্মক্ষমতার এই অপূর্ব সুযোগকে ২০৪০ সালে শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই কাজে লাগানো আবশ্যক। অথচ এখনো দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর পেছনে বড় কারণ অভিভাবকদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাকে ঘিরে সচেতনতার অভাব। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের আগ্রহ ও পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোর্সের সংখ্যাও খুব কম। অথচ বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তি শিক্ষা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষক সংকট, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং পুরোনো কারিকুলাম দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি শিক্ষার মানকে দুর্বল করে রেখেছে। বিভিন্ন পলিটেকনিক এবং কারিগরি স্কুল ও কলেজে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য। জনশক্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যুরোর অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রায় ৬০ শতাংশ পদে শিক্ষক নেই। অনেক জায়গায় এক শিফটের শিক্ষক দিয়ে দুই শিফট পরিচালনা করতে হচ্ছে। কোথাও ল্যাবরেটরিই নেই, আবার কোথাও ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরও নাজুক, যা সামগ্রিকভাবে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তর করতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের কারিগরি শিক্ষায় রূপান্তর আনতে হবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পুনর্গঠন ও উচ্চশিক্ষার ভিত্তি মজবুতকরণ
শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অসাম্য স্পষ্ট হয় প্রাথমিক স্তরে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, আবার কোথাও অবকাঠামো থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সন্তোষজনক না হওয়ায় মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এমনকি সার্কভুক্ত দেশগুলোরও মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন সর্বনিম্ন। ২০২৪ এর ২২ জুন খবরে প্রকাশ, ‘মাধ্যমিকে বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রারম্ভিক বেতন ১৭,৫০০ টাকা, ভারতে ৪০ হাজার টাকা, পাকিস্তানে ৩০ হাজার টাকা, শ্রীলঙ্কায় ৩২ হাজার টাকা, নেপালে ৩৫ হাজার টাকা, ভুটানে ৩৯ হাজার টাকা ও মালদ্বীপে ৯০ হাজার টাকা।’
প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার অভাবে শহর ও মফস্বলের বাইরে প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষকতা করতেও অনীহা স্পষ্ট। এমপিওভুক্তির বাইরে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে বেতনবৈষম্য, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা।
অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের অভাবও চোখে পড়ে। ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের তথ্য মতে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের প্রায় ৮৫ শতাংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। উপরন্তু বেশিরভাগ শিক্ষকের কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেই। এর ফল ভোগ করে শিক্ষার্থীরাই। শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় তারা প্রকৃতভাবে না বুঝেই, না শিখেই অতিক্রম করে ফেলে।
এখনও প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত অনেক পথশিশু এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা। যাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়নি তাদের পক্ষে বিনামূল্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে আসাও বাতুলতা। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের জরিপ বলছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ হলেও ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারেনা। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা তার চাইতেও বেশি। আবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এর গবেষণা বলছে, প্রাথমিকের ৯২ শতাংশ শিশুই পাঠ্যবইয়ের বাইরে ইংরেজি বাক্য দেখে দেখে পড়তে পারেনা। ফলে তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব না দিয়ে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় গুনগত দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, পৃথিবীর উন্নত ও অনুন্নত কোনো রাষ্ট্রেই সব শিশুকে বাধ্যতামূলক বিদেশি ভাষা শেখানো হয় না।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে প্রাথমিক স্তরে একমুখী ও সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে সব শিক্ষার্থী একই পাঠ্যপুস্তক পড়ে এবং অভিন্ন পাঠক্রম অনুসরণ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে অন্তত ১১ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, এবং প্রতিটি ধরন অনুযায়ী শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারি ও বেসরকারি, স্বীকৃত ও অস্বীকৃত মিলিয়ে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত পাঁচ ধরনের কারিকুলাম চালু আছে। ইংরেজি মাধ্যমের ‘এ লেভেল, ও লেভেল’-এর পাশাপাশি চালু রয়েছে ইংরেজি ভার্সন।
দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর পেছনে বড় কারণ অভিভাবকদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাকে ঘিরে সচেতনতার অভাব। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের আগ্রহ ও পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোর্সের সংখ্যাও খুব কম।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক স্তরে অভিন্ন কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলা হলেও গত পনেরো বছরে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে পাঠক্রমের এই বৈচিত্র্যের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতার স্তরে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে শিক্ষাগত অসমতার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যেহেতু পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা আর থাকছে না, ফলে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঘোষণা করে সেটাও বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্য করা প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষার পাঠক্রমে পেশাভিত্তিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি বাংলা ভাষা, জাতীয় ইতিহাস, পৌরনীতি ও নীতিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি জাতীয় ইতিহাস, নাগরিক শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষাকে আবশ্যিক করা প্রয়োজন।
মূলধারার বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মানোন্নয়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি মানববিদ্যা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিসহ সব ধরনের উচ্চশিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে উচ্চমাধ্যমিকের তিনটি শাখার পাঠ্যক্রম নতুনভাবে সাজানো দরকার। সৃজনশীল ও নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে বর্ণনামূলক উত্তরের পদ্ধতিকে নবায়িত ও বিকশিত করে কার্যকর করতে হবে।
উচ্চশিক্ষার আধুনিকায়ন, একাডেমিক সুশাসন ও সুযোগ সম্প্রসারণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক সূচকসমূহে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান তলানিতে। ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৫: টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিজ’ শীর্ষক তালিকায় ১,৫০৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভারতের ৩৪টি ও পাকিস্তানের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও বাংলাদেশের মাত্র ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে (সরকারি দুটি ও বেসরকারি একটি)। এমতাবস্থায় শিক্ষার মানোন্নয়নে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, দলীয়করণ বন্ধ করা, শিক্ষা ও গবেষণায় প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বৃদ্ধি, শিক্ষক মূল্যায়ন চালু, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করার কোন বিকল্প নেই। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতির জন্য নীতিমালা প্রনোয়ন করা প্রয়োজন।
উচ্চশিক্ষায়, গবেষণায় ও জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় অবহেলিত বাংলা ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলা ভাষা, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্মীয় ভাষা ও বিদেশি ভাষা ইত্যাদি বিবেচনা করে সুষ্ঠু জাতীয় ভাষানীতি অবলম্বন করতে হবে।
মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি এর জিপিএর উপর বরাদ্দকৃত নম্বর কমানো জরুরি। কেননা শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেয়। প্রশ্নের মান ও মূল্যায়ন ভিন্ন হওয়ায় এবং গ্রামের সঙ্গে শহরের শিক্ষার সুযোগ সুবিধার বৈষম্য থাকায় সেটা ফলাফলেও লক্ষ্যনীয় হয়। ফলে জিপিএর উপর অধিক নম্বর বরাদ্দ থাকলে সেই বৈষম্য উচ্চশিক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার ঋণ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার খরচ কমানো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নত থাকার পরিবেশ ও খাবার নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক স্বাস্থসেবা কাউন্সেলিং, প্রতিবন্ধী, সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চশিক্ষাকে আরও সহজগম্য করা এবং পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতির ক্রমাগত আধুনিকায়ন ব্যতিত উচ্চশিক্ষা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে না।
উচ্চশিক্ষায় ছদ্মবেশী বেকারত্ব হ্রাসকরণ
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের ক্যারিয়ার ভাবনা বিসিএস-কেন্দ্রিক। পরিবার ও সমাজে সরকারি চাকরিকে একমাত্র নিরাপদ পেশা হিসেবে দেখার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিহীন ও সংকীর্ণ ভাবনায় আটকে রাখছে। ফলে গ্র্যাজুয়েশনের পর বহু তরুণ কয়েক বছর ধরে শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সময় ব্যয় করে। এই সময়টিকে অনেকেই ‘প্রস্তুতি’ বললেও অর্থনীতির ভাষায় এটি এক ধরনের ইচ্ছাকৃত বা ছদ্মবেশী বেকারত্ব। তবে এখানে মানসিকতার পাশাপাশি কাঠামোগত সংকীর্ণতাও রয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমিত সুযোগ ও বরাদ্দ, বেসরকারি খাতে স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কম এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দুর্বল হওয়ায় মেধাবীরা তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর সমাধানে উচ্চশিক্ষায় বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রশিক্ষণ, বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় প্রনোদনার ব্যবস্থা করা । তৃতীয়ত, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনে সহজ অর্থায়ন ও কর-সুবিধা নিশ্চিত করা। এটা নিশ্চিত করা গেলে ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা কমবে, আর শিক্ষাব্যবস্থা হবে সত্যিকার অর্থে উৎপাদনশীল ও সমাজোপযোগী।
সর্বোপরি, শিক্ষা সংস্কারকে রাষ্ট্র গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সামনে যেমন এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ, তেমনি আছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতা এবং বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারন, প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রনোয়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শিক্ষা যদি কেবল সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে দিক বদলায়, তবে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর কখনোই সম্ভব হবে না। এখন সময় সাহসী, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের, যা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলবে, জ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নেবে এবং বাংলাদেশকে মর্যাদাবান ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।
- মো. ইকরামুল হক রিয়ন: প্রভাষক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ