জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দ্য স্টেটসম্যানের নিবন্ধ

তারেক রহমানকে পাড়ি দিতে হবে কঠিন পথ

লেখা:
লেখা:
শান্তনু মুখার্জি

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৫৫
তারেক রহমান। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল। এমতাবস্থায় আইনশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতি বিএনপি বেশি অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিএনপির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। এতে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কাও দূর হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। গত ১৭ বছর দেশের বাইরে থাকলেও মন্ত্রিসভা গঠনে তাঁর ভারসাম্য প্রমাণ করে যে তিনি দলীয় তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ভেঙে পড়া পরিস্থিতিকে জোড়া লাগানো নতুন সরকারের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার এক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, আগের স্বৈরাচার সরকারের দুর্নীতি ও অপশাসনে ক্ষতিগ্রস্ত দুর্বল অর্থনীতি, ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামো এবং নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার যাত্রা শুরু করেছে।

সরকারের ভিশন তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসনই হবে মূল নীতি। তিনি আত্মনির্ভরশীল, নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দল, মত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে এই দেশ সবার। সংখ্যালঘুরা তাঁদের অধিকার থেকে উপেক্ষিত হবে না তাঁর বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে।

রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান। ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়: নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সচিবদের সঙ্গেও আলোচনা করেন।

দেশের মানুষ এখন আশা করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ইতিবাচক গতি বজায় রাখবেন। কারণ প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর যে সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলার যে নাজুক পরিস্থিতি ছিল তা ঠিক করতে বিএনপি সরকারের ওপর চাপ থাকবে।

তারেক রহমান এ বিষয়ে সচেতন। তিনি জানেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আঘাত আসতে পারে। এ ছাড়া সংসদে ৭০টির মতো আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামীও একটি চাপের কারণ। তাঁদের শক্ত উপস্থিতি বিএনপিকে দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি মূল ইস্যুতে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে পারেন তারেক রহমান। তবে পাকিস্তানি গণমাধ্যমে এমন বয়ানও ছাড়া হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ সবসময় ভারতপন্থী আর বিএনপি পাকিস্তানের মিত্র। কেননা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন।

সম্ভবত এ কারণেই প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক ও টেলিভিশন ভাষণে তিনি এসব অগ্রাধিকার সামনে আনেন। জামায়াত এখন দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সতর্ক ও পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে। আপাতত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মধুচন্দ্রিমা সময় চলছে। তবে ভবিষ্যতে জামায়াত যখন কড়া অবস্থান নেবে তখনই শুরু হবে প্রকৃত পরীক্ষা।

সংসদে বিএনপির আসন সংখ্যা বেশি হলেও নির্বাচনের ফল ইঙ্গিত দেয় যে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ফলে বিএনপিকে অত্যন্ত কৌশলে চলতে হবে। একদিকে জনগণের নজর থাকবে সরকারের কর্মদক্ষতার ওপর, অন্যদিকে জামায়াত যেকোনো ত্রুটি নিয়েই প্রশ্ন তুলবে।

নতুন সরকারের অধীনে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও প্রাসঙ্গিক। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠানো এবং শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ও পররাষ্ট্রসচিবের উপস্থিতি ছিল সতর্ক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

তবে ধারণা করা যায়, তারেক রহমান আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করে পরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেবেন। একই সঙ্গে তাঁকে পাকিস্তান ও চীনের প্রস্তাবের প্রতিও সাড়া দিতে হবে। চীনের নেতৃত্ব ও ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি বাংলাদেশে সাথে বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পাকিস্তানও ইতিমধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।

এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে পারেন তারেক রহমান। তবে পাকিস্তানি গণমাধ্যমে এমন বয়ানও ছাড়া হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ সবসময় ভারতপন্থী আর বিএনপি পাকিস্তানের মিত্র। কেননা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন।

এসব কারণে তারেক রহমানের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ সহজ হবে না। অতীতে ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়। যার দায়ও তাঁর ওপর আরোপ করা হয়। ভবিষ্যতে আস্থা তৈরির স্বার্থে সেই ভাবমূর্তি কাটিয়ে ওঠা তাঁর জন্য জরুরি হতে পারে।

আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

  • শান্তনু মুখার্জি: ভারতের অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা ও মরিশাসের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা

দ্য স্টেটসম্যান থেকে অনুবাদ করেছেন সার্জিল খান

সম্পর্কিত