জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ বনাম পরকালের রাজনীতি

লেখা:
লেখা:
মানস ফিরাক ভট্টাচার্য

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৫৭
এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলাদেশের সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ। তিনি ‘শায়ান’ নামেই বেশি পরিচিত। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি একটি নতুন গান প্রকাশ করেছেন। গানের শিরোনাম ‘চব্বিশ আর একাত্তর’। এই গানের মাধ্যমে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তাঁরা ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

গানটিতে স্পষ্টভাবে জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইসলামী আদর্শভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি তাদের অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য দীর্ঘকাল ধরে বিতর্কিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষ নিয়ে নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধ ঘটানোর গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরে জামায়াতে ইসলামী নতুন করে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে তরুণ সমাজের একটি অংশ এবং শহর-গ্রামের সেই ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের সমর্থন বেড়েছে। সমাজের একটি অংশ বাংলাদেশকে আরও বেশি ইসলামীকরণের পথে দেখতে আগ্রহী।

শায়ানকে গাইতে শোনা যায়, ‘যারা ১৯৭১ আর ২০২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেশকে বিভক্ত করতে চান, তাদের দিন শেষ।’ কিন্তু বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশাবাদের প্রতিফলন কতটুকু ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। জামায়াতের নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে বিপুল জনসমাগম লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি ঢাকায় দলটির নারী শাখা বিশাল মিছিল বের করেছে। এর মাধ্যমে যেন তারা জানান দিতে চাইছে যে জামায়াতের ছায়াতলে নারীরাও এখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার।

অথচ বাস্তবতা হলো, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলের আমির ড. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আইনে নারী ও পুরুষ সমান নয়; ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা ভিন্ন। আমিরের মতে, পৃথিবীর কোথাও নারীরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ উদাহরণ হতে পারেন না।

সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বরাবরই একরৈখিক। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, কিন্তু বৈষম্য, বঞ্চনা কিংবা নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের কোনো সাংবিধানিক রক্ষাকবচ বা অধিকার দেওয়া হবে না।

শায়ানের গানে উচ্চারিত ‘বাংলাদেশ সবার’ মানবতাবাদী দর্শনটি আজ বিশ্বজুড়েই প্রবল চাপের মুখে আছে। আধুনিক মানবতাবাদের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব যেন আবার সাম্প্রদায়িক উত্থান ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকেই ফিরে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিগুলো দিন দিন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘুরা পরিচয়ের দ্বন্দ্বে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। আজ ইতিহাস ও রাজনীতির ব্যাখ্যা নির্ধারিত হচ্ছে পরিচয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে। এর ফলে ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন মানবিক সংহতির পুরোনো ধারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রবণতা শ্রেণি, জাত ও জাতিসত্তার যৌথ বা সম্মিলিত ভবিষ্যতের স্বপ্নকে গ্রাস করে ফেলছে।

কমিউনিস্ট কিংবা উদারপন্থী—কেউই জাতিরাষ্ট্রের পরিচয়বাদী শিকড় থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি। তারা সর্বজনীন নীতিকে এক ধরনের জাতিকেন্দ্রিক ধারণার সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। যদিও ‘জনগণ’ মানে বহু বিচিত্র জনগোষ্ঠীর সমষ্টি কিন্তু তারা এই বিষয়টিকেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।

অন্যদিকে, ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এমন কোনো বৈচিত্র্যের তোয়াক্কা করেনা। তারা নির্দ্বিধায় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী। বাংলাদেশে এই ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থারই বিকাশ ঘটছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত বিএনপিকে হারাতে না পারলেও তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি ঘরে তুলেছে। দলটি এখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলের আমির ড. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আইনে নারী ও পুরুষ সমান নয়; ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা ভিন্ন।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা; মুক্তমনা শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর সহিংসতা এবং মুক্তচিন্তার গণমাধ্যমে আক্রমণ—এসব কর্মকাণ্ড সচরাচর জামায়াতপন্থী লোকজনের কাজ বলে অভিযোগ করা হয়। তবে বিএনপিও এসব দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। সম্প্রতি দলটি তাদের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সিকে সাময়িক বরখাস্ত করতে বাধ্য হয়। কুমিল্লায় ধারণকৃত এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ভোটারদের হুমকি দিচ্ছেন—তারা যদি অন্য কাউকে ভোট দেয় আর এরপরও বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তাদের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। আশ্চর্যজনকভাবে, দলীয় কর্মীরা তার এই বক্তব্যে উল্লাস প্রকাশ করছিল। একজন প্রকৌশলী হয়েও তার ভাষা ছিল খুবই বিপজ্জনক, যা আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নগ্ন চিত্র।

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার ফলে বাংলাদেশের নিকট ভবিষ্যতের রাজনীতি প্রবলভাবে ধর্মমুখী শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এখানে মনে রাখা জরুরি যে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর গঠিত ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি’ (এনসিপি)-ও এবারের নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে ‘কৌশলগত’ জোট গড়েছে। দলের পুরুষ নেতৃত্ব এতে প্রকাশ্যে কোনো আপত্তি জানাননি, যদিও সামান্তা শারমিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নারী নেত্রী এই জোটের তীব্র বিরোধিতা করেন। একই কারণে তাসনিম জারা দল ত্যাগ করেন এবং ঢাকার একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জারার প্রচারণা ছিল এনসিপি নেতাদের গতানুগতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি শত্রু-মিত্রের বিভাজিত ভাষা ব্যবহার না করে অত্যন্ত শান্তভাবে মানুষের জীবনমান, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নীরবে ভোট চাইতে থাকেন।

সম্প্রতি জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহরিয়ার কবির একটি ভাইরাল ভিডিওতে আলোচনার জন্ম দেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে এক পান বিক্রেতার হাতে টাকা ধরিয়ে দিতে দেখা যায়। দোকানি যখন বর্তমান ভয়ের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন কবির ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞেস করেন—‘তুমি বেশি সময় থাকবে কোথায়? পৃথিবীতে, না কবরে?’ দোকানি উত্তর দেন—‘কবরে।’ তখন কবির যুক্তি দেখান, কবরে সুখে থাকতে চাইলে ‘আল্লাহর দলের’—অর্থাৎ জামায়াতের—পক্ষে ভোট দিতে হবে।

কবির হয়তো বুঝতেই পারেননি, তিনি আসলে মানুষকে ভবিষ্যতের পার্থিব স্বপ্ন ছেড়ে কবরের চিন্তায় নিমগ্ন হতে বলছেন। এই কঠোর বাস্তবতার মধ্যেই শায়ান গিটার হাতে আশার গান গেয়ে যান। আর অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রস্তুত হয় এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য—জীবন না মৃত্যুর পক্ষে তারা তাদের রায় দেবে?

  • মানস ফিরাক ভট্টাচার্য: গান্ধী: দ্য এন্ড অব নন-ভায়োলেন্স গ্রন্থের লেখক

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম

Ad 300x250

সম্পর্কিত