জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

হক আল লায়লা… গান গেয়ে রমজানকে স্বাগত জানায় দুবাইয়ের শিশুরা

মাহজাবিন নাফিসা
মাহজাবিন নাফিসা

রমজান মাসকে স্বাগত জানাতে ছোট ছোট শিশুরা গান গেয়ে বাড়ির দরজায় দরজায় হাজির হয়। ছবি: গালফ নিউজ থেকে নেওয়া

ছোট শিশুরা প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গান গেয়ে চকলেট সংগ্রহ করছে—শুনে অতি পরিচিত হ্যালোইনের কথা মনে পড়লেও এটি দুবাইয়ের মুসলিমদের পালিত এক উৎসব। প্রতি বছর রমজানের শুরুর প্রায় পনেরো দিন আগে, শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এবং রঙিন হাতে বোনা ব্যাগ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে গান গায় এবং এর বিনিময়ে বাদাম ও মিষ্টি সংগ্রহ করে।

এই উৎসবের নাম ‘হক আল লায়লা’। এর অর্থ ‘রাতের জন্য।’ সাধারণত মাগরিবের নামাজের পর এটি শুরু হয়। আনন্দঘন এই আয়োজন মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে পবিত্র রমজান মাস খুব কাছেই।

সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে এটি জনপ্রিয়ভাবে হক আল লায়লা নামে পরিচিত হলেও, অঞ্চলভেদে এর নাম ভিন্ন।

ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাররাইন এবং সৌদি আরবে এটিকে ‘গেরগা আন’ বলা হয়। ওমানে এর নাম ‘কারানকাশো’।

হক আল লায়লা দুবাইয়ের শত বছরের সংস্কৃতি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতি বছর হিজরি সনের শাবান মাসের ১৫ তারিখে এ উৎসব পালন করা হয়। মূলত রমজান মাসকে স্বাগত জানাতে ছোট ছোট শিশুরা ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরে গান গেয়ে বাড়ির দরজায় দরজায় হাজির হয়। আর বাড়ির গৃহকর্ত্রীরা উপহার হিসেবে শিশুদের হাতে তুলে দেয় চকলেটসহ নানা ধরনের মিষ্টি।

ছোট শিশুরা ‘আতুনা আল্লাহ ইয়াতিকুম বাজি মাকাহ ইয়েওয়াদিকুম’ গান গেয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতে বাড়িতে যায়। এই গানের অর্থ হচ্ছে, এসেছি তব দ্বারে/ দাও দাও দুহাত ভরে/ আমাদের দিলে পরে/ খোদা তোমাদের দেবে ঝুলি ভরে।’

দুবাইয়ের বাসিন্দা মনসুর আল হাশেমি বলেন, ‘এটি নিছক কোনো উৎসব নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের শিশুরা অন্যকে উপহার দেওয়া ও ভাগাভাগি করে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধের শিক্ষা পায়।’

উৎসবটির জন্য শিশুরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকে। এ দিন মেয়ে শিশুরা লম্বা গাউন ধরনের রঙিন পোশাক পরে। পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাগ বা ঝুড়ি নেয়। ছেলে শিশুরা ‘কান্দুরা’ নামের এক ধরনের পাঞ্জাবি পরে। কোমরে বাঁধা থাকে বেল্ট। সঙ্গে থাকে হাতে বোনা ব্যাগ।

সাধারণত বিকেলে আসরের নামাজের পরপরই শিশুরা বেরিয়ে পড়ে এবং মাগরিব পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে মিষ্টান্ন সংগ্রহ করে।

শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম সেন্টার ফর কালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের প্রটোকল ম্যানেজার আহমেদ আল জাফলাহ বলেন, ‘এই উৎসব শিশুদের পরোপকারী হতে শেখায়। শিশুরা আশপাশের বাড়িতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির গৃহকর্ত্রীরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং চকলেট, মিষ্টি, বাদাম ইত্যাদি উপহার দেয়। এতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়।’

হক আল লায়লা উৎসবে শিশুদের চকলেট দেন অভিভাবকেরা। ছবি: গালফ নিউজ থেকে নেওয়া
হক আল লায়লা উৎসবে শিশুদের চকলেট দেন অভিভাবকেরা। ছবি: গালফ নিউজ থেকে নেওয়া

হক আল লায়লাকে ঘিরে আমিরাতের বাড়িগুলো বর্ণিল সাজে সেজে ওঠে। নারীরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে রঙিন কাগজ ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি প্রচুর মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। বাড়ির উঠোনে বিশাল টেবিল বিছিয়ে তার উপর চকলেট, ললিপপ, বাদামসহ মিষ্টি খাবার সাজিয়ে রাখা হয়।

যারা বাড়িতে মিষ্টান্ন তৈরি করতে পারেন না, তারা বাজার থেকে মিষ্টি কিনে আনেন। ফলে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে দোকানগুলোও নানা রঙে সেজে ওঠে। বাহারি মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসে তারা। সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে আমিরাতের অনেক স্কুল ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানও হক আল লায়লা উৎসব আয়োজন করছে।

রোজাকে ঘিরে কীভাবে এই সংস্কৃতির উদ্ভব হলো সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে এই উৎসবের মিল পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হয় যে, সেখান থেকেই সম্ভবত হক আল লায়লা উৎসব শুরু হয়েছিল। তবে এই যুক্তির ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই।

শারজাহর শিক্ষাবিদ ইয়াকুব আল হাম্মাদি বলেন, ‘কিছু নির্ভরযোগ্য ইতিহাস থেকে জানা যায় নবী মুহাম্মদের (সা.) কন্যা হযরত ফাতিমা রোজার আগমন উপলক্ষে মিষ্টি বিতরণ করতেন। সেখান থেকেই এই উৎসবের প্রচলন বলে ধারণা করা হয়।’

তবে হ্যালোইনের সঙ্গে এই উৎসবের সামঞ্জস্যতা থাকায় এটি পালন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ২০২৩ সালে ফতোয়া জারি করে আমিরাতের ফতোয়া কাউন্সিল। সেখানে বলা হয়, ‘মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী হক আল লায়লা উদযাপন করা অবৈধ নয়। এটি আমিরাতের ঐতিহ্য। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো রীতি, আচার বা উৎসব কারও ক্ষতির কারণ নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা উদযাপন করা বৈধ।’

তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ, খালিজ টাইমস ও দ্য নিউ আরব

সম্পর্কিত