বিটিভিকে কোন জায়গায় ফেরাতে চায় সরকার

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বিটিভির নতুন মহাপরিচালক কাজী জেসিন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে দীর্ঘ বিবরণ লিখেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী শাসনামলে সরকারি দলের এবং ফ‍্যাসিবাদের প্রচার যন্ত্র হিসেবে বিটিভিকে ব‍্যবহার করা হয়েছে।

বিটিভি অতীতেও ক্রেডিবিলিটি না থাকার কালিমায় দর্শক হারিয়েছে, এমনকি গণঅভ‍্যুত্থানের পরও প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো পরিবর্তনের সূচনা হয়নি। কাজী জেসিন একেবারেই সত্য বলেছেন। নির্জলা ও বাস্তবতাভিত্তিক মূল্যায়ন করেছেন, কোনো সন্দেহ নেই।

রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপচারিতার বিবরণ দিতে এই স্ট্যাটাসের পরের দিকেই তিনি লিখেছেন, বিটিভি নিয়ে তাঁর (প্রধানমন্ত্রীর) পরিকল্পনা শুনে আমি সত্যিই অভিভূত। বিটিভি শুধু তার আগের জায়গায় ফিরে আসবে না, প্রধানমন্ত্রী বিটিভিকে আরও অনন্য, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ একটি জায়গায় দেখতে চান। এটাও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক কথা। কিন্তু তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিটিভি আগের জায়গায় ফেরত আসবে। তিনি নিশ্চয়ই বিটিভির ‘আগের জায়গায় ফেরত আসা’ বলতে একটি গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সময়কে বুঝিয়েছেন। কিন্তু বিটিভির ইতিহাসে গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সময় বলতে কি কোনো সময় ছিল?

একজন গণমাধ্যমবিষয়ক শিক্ষক, সাবেক গণমাধ্যমকর্মী ও গণমাধ্যম উন্নয়ন গবেষক হিসেবে আমি ২-১টি গবেষণায় যুক্ত আছি। সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিসর নিয়ে ইউনেস্কোর সঙ্গে একটি ত্রিদেশীয় গবেষণা কাজও সম্পন্ন করার সুযোগ হয়েছে। সেই গবেষণায় বাংলাদেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত ও বেসরকারি গণমাধ্যম নিয়ে বিস্তারিত বিষয় খতিয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল। নতুন মহাপরিচালক কাজী জেসিনের ইঙ্গিত অনুযায়ী বাংলাদেশ টেলিভিশন কোন সময় গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ আসনে ছিল—তা একটু নতুন করে তলিয়ে দেখা যাক।

জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ টেলিভিশন সরকারের নগ্ন প্রচারযন্ত্র। অবিভক্ত পাকিস্তানে ১৯৬৪ সালে যখন এর যাত্রা শুরু হয় তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই ভূমিকায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং বিভিন্ন সরকারের সময় দলীয় তোষণ, সরকারের তৈলমর্দন এবং বিরোধী দল দমনে এই প্রচারযন্ত্র যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতাসীন সরকারের চেয়ার টিকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে। সেই ধারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখনও চলমান।

একটু মনে করিয়ে দেই সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের আমলে জনগণের করের টাকায় চলা এই প্রতিষ্ঠান ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’ নামে পরিচিত ছিল; যা পরে বেগম খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের শাসনকাল ১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ এবং শেখ হাসিনার শাসনামল ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে বহাল ছিল। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ যখন ২৪ ঘণ্টার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও সৃজনশীল অনুষ্ঠানমালায় অভ্যস্ত তখন বিটিভি পরিচিত হয়েছে ‘বাতাবি লেবুর ফলন’ সংবাদের গণমাধ্যম হিসেবে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপচারিতায় কাজী জেসিন বিটিভির গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সময় বলতে হয়তো এর আগের বিএনপির শাসনামলকে বুঝিয়েছেন। আওয়ামী লীগ বা এরশাদের স্বৈরশাসনকে তাঁর আমলে নেওয়ার কথা নয়। কিন্তু শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, বিএনপির ১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ সময়ে সরকার পরিচালনার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন পেশাদার, জনবান্ধব ও সৃজনশীল কোনো মাধ্যম ছিল—এমন কোনো নজির নেই। এমনকি বিএনপি সরকার বিটিভির স্বায়ত্তশাসন ও সংবাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে—এমন কোনো তথ্যও নেই।

বিটিভি শুধু তার আগের জায়গায় ফিরে আসবে না, প্রধানমন্ত্রী বিটিভিকে আরও অনন্য, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ একটি জায়গায় দেখতে চান। এটাও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক কথা। কিন্তু তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিটিভি আগের জায়গায় ফেরত আসবে। তিনি নিশ্চয়ই বিটিভির ‘আগের জায়গায় ফেরত আসা’ বলতে একটি গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সময়কে বুঝিয়েছেন। কিন্তু বিটিভির ইতিহাসে গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সময় বলতে কি কোনো সময় ছিল?

তবে হ্যাঁ, এ সময় অবশ্যই কিছু জনপ্রিয় বিনোদনমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচারে ছিল। কিন্তু সেটা তো প্রচারমাধ্যমটির ধারাবাহিকতামাত্র। একটু মনে করিয়ে দিই, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল এরশাদ আমলে টানা সম্প্রচারিত হওয়া ‘যদি কিছু না মনে করেন’। এরপর বিটিভির অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হলো ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’।

মূল আলোচনায় ফেরা যাক। বাংলাদেশ এখনো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নয়। এমন দেশে বিটিভি একটি সাদা হাতি। সদ্যবিদায়ী তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন চলতি বছরের ২২ জুন জাতীয় সংসদে জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত করসহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মোট আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। চিন্তা করে দেখুন, জনগণের করের অর্থের কী নিদারুণ অপচয়।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ অপচয় এবং এই প্রতিষ্ঠানকে দলদাস প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিছু প্রচেষ্টাও ছিল। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে সৃজনশীলতা, জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা আনাসহ অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদানসংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ১৯৯৬ সালে একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি এ প্রকল্পে অর্থায়নও করেছিল। কিন্তু মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলাহর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশনের সুপারিশ সেই সময়ের আওয়ামী সরকার বাস্তবায়ন করেনি। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি সরকারও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর কামাল আহমেদের গণমাধ্যম কমিশনের প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। বিবিসি ও ডয়েচেভেলের আদলে বাংলাদেশ টেলিভিশনকে কেন্দ্র করে বেতার ও বাসসকে এক ছাদের নিচে এনে সম্মিলিত বার্তা বিভাগ তৈরির সুপারিশ করেছিল এই কমিশন। একই সঙ্গে বিটিভিকে একটি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালনার সুপারিশও ছিল। আর এই পরিচালনা পর্ষদ বিটিভির জন্য নিয়োগবিধি ও নীতিমালা প্রণয়ন করবে। মূলত বিটিভির সংবাদ ও অনুষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ফেরাতে এবং সৃজনশীলতার বিকাশে এই সুপারিশগুলো করা হয়েছিল। কামাল আহমেদের এই কমিশনের সুপারিশগুলো একেবারে যথাযথ বা অবশ্য অপরিহার্য তা বলছি না। কিন্তু বিশ্ব বাস্তবতায় বিটিভিকেন্দ্রিক এই সুপারিশগুলো অনেক বাস্তবসম্মত ও যথাযথ বলে বিবেচনা করা যায়।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী, আগামীতে বিটিভি কীভাবে একটি বিশ্বাসযোগ্য, আধুনিক ও জনআস্থার চ্যানেল হিসেবে গড়ে উঠবে তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সরকারের অধীনে থেকে বিটিভির পরিবর্তন যে খুবই কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব, তা বলাই বাহুল্য। বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান সাবির মোস্তফা বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিনের ফেসবুক বার্তা নিয়ে একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, আবার সেই পুরোনো কেচ্ছা! প্রধানমন্ত্রী চান!… কিন্তু পাবলিক বিটিভি থেকে কী চায়, সেটা যাচাই না করে প্রধানমন্ত্রী কী চান, সেটাই মুখ্য। মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী চান বলেই বিটিভিকে আধুনিক আর বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে; প্রধানমন্ত্রী না চাইলে এসবের দরকার নাই।

সাবির মোস্তফার এই মন্তব্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পদ। এই পদে যিনি থাকেন তাঁর চাওয়া, মতামত ও পরামর্শের অবশ্যই মূল্য আছে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন স্বাধীন গণমাধ্যমের সঙ্গে ক্ষমতা-কাঠামোর সম্পর্ক ঋণাত্মক ও দ্বন্দ্বমুখর। তাই সরকার প্রধানের চাওয়া অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের চরিত্রবদল হয়ে কতটা জনবান্ধব ও সৃজনশীল হতে পারবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তারপরও ইতিবাচকভাবে ভাবতে পারি। বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতন্ত্র ও দুর্নীতিপ্রবণ প্রশাসনে আশাবাদই অন্যতম অবলম্বন। আশা করি কাজী জেসিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ টেলিভিশন একটি জনমুখী ও সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার পথে যাত্রা শুরু করবে। আর তা না হলে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীকে নিয়ে তাঁর বার্তা পরিপূর্ণভাবেই ব্যর্থ হবে।

রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত