জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভাষাকে শক্তি অর্জন করতে হবে যুদ্ধ ও বাণিজ্য করে: কাজল শাহনেওয়াজ

কবি ও কথাসাহিত্যিক কাজল শাহনেওয়াজের গদ্যে, গল্পে ও কবিতায় তাঁর চরিত্রগুলো খুবই শক্তিশালী। তাঁর জন্ম বিক্রমপুরের লৌহজং থানার দিঘলী গ্রামে ১৯৬১ সালের পয়লা জুন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করা এই কথাসাহিত্যিকের উল্লেখযোগ্য বই হলো: কাছিমগালা (ছোটগল্প), দিঘলী (আত্মজীবনী), একটি ব্যাঙনি আমাকে পিঠে চড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে (কবিতা) ইত্যাদি। ঢাকা স্ট্রিমের পক্ষ থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হুমায়ূন শফিক

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কবি ও কথাসাহিত্যিক কাজল শাহনেওয়াজ। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা স্ট্রিম: আপনি একইসঙ্গে কবি এবং কথাসাহিত্যিক—দুই মাধ্যমেই আপনার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। কবিতা ও গদ্যের এই দ্বৈত যাত্রায় আপনি কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন? আপনার নিজের কাছে কোন মাধ্যমটিকে বেশি স্বস্তিদায়ক বা চ্যালেঞ্জিং মনে হয়? সদ্য শেষ হওয়া অমর একুশে বইমেলায় আপনার কোনো বই এসেছে কিনা?

কাজল শাহনেওয়াজ: আমি সত্যিকারভাবেই বহুমুখী। লিখতে গেলে মনের ভেতরটা বা হাতের আঙ্গুলগুলো এমনভাবে নেচে ওঠে আর কাজ করতে শুরু করে, সেটা যে কোন মাধ্যম, তা টের পাই না। কখনো তা হয়ে যায় আমার কায়দায় কবিতা, কখনো আবহমান ভাষায় নিজের মাধুরী মাখানো গদ্য! একটা উন্মাদনা থেকে অক্ষর বা বাক্য সাজাই।

কোনো মাধ্যমেই স্থির হতে পারি না। কোনো কোনো বিষয় টেনে নিয়ে যায় ফিকশনের ম্যাজিকে। কোনো কোনো উড়ন্ত ইমেজ ডেকে নেয় আড়ালে, সত্যের মুখোমুখি করে কবিতায়।

ভাবনারে ভাষায় পরিস্ফুট করতে অনেক কিছুর দরকার হয়। আপডেটেড পড়াশোনা, গ্রেটমাস্টারদের অভিজ্ঞতা, সহৃদয় মন, সমাজ-সংসারের প্রতি সহমর্মিতা খুব দরকার।

এবার একটাই বই এসেছে মেলায়। আমার গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলো থেকে স্বনির্বাচিত ১৫টি লেখা নিয়ে বইয়ের নাম ‘প্রিয় ১৫ গল্প’। প্রকাশক ‘ঐতিহ্য’।

স্ট্রিম: আপনার লেখায় নাগরিক জীবনের জটিলতা, বিচ্ছিন্নতা এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন খুব গভীরভাবে উঠে আসে। বর্তমান সময়ের এই তীব্র যান্ত্রিকতা, অস্থিরতা ও ভার্চুয়াল নির্ভরতা আপনার সাহিত্যিক সত্তাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?

কাজল: আমি সময় এবং ভূগোল বা পরিবেশ দিয়ে খুবই মুভড হই। আমার সব লেখাই সেইসব প্রতিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন। সেখানে যন্ত্রণা, বিষাদ, মনস্তত্ত্ব সব কিছুই থাকে।

২০২৬-এর বইমেলায় এসেছে ‘প্রিয় ১৫ গল্প’। ছবি: সংগৃহীত
২০২৬-এর বইমেলায় এসেছে ‘প্রিয় ১৫ গল্প’। ছবি: সংগৃহীত

স্ট্রিম: বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্য ও কবিতা কি আমাদের এই সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটগুলোকে ধারণ করতে পারছে বলে আপনি মনে করেন?

কাজল: সমকালের ডাইনামিক্স লিখে ধারণ করতে সবাই পারে না। লিখতে গেলে একটা নৈর্ব্যক্তিকতার চর্চা দরকার, সেজন্য সময় দিতে হয়।

স্ট্রিম: তরুণ প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে ভাষা ও আঙ্গিক নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা দেখা যাচ্ছে। এই নিরীক্ষাপ্রবণতাকে আপনি কতটা ইতিবাচক বা সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন? এর মধ্যে কি কোনো ফাঁকিবাজি বা অনুকরণপ্রিয়তা চোখে পড়ে?

কাজল: তরুণদের যারা নিরীক্ষা দিয়ে শুরু করে, তাদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরাগ আছে, এটা তো জানেনই।

সাহিত্যে প্রভাবিত হওয়াটা মহৎ গুণ, তবে অনুকরণ করলে আপনি শেষ। আপনার ব্যাটারি ফিউজ হয়ে যাবে অচিরেই।

স্ট্রিম: বাংলা সাহিত্য এখনো অনেকখানি ঢাকা-কেন্দ্রিক বা মধ্যবিত্তের বয়ান-সর্বস্ব বলে একটা অভিযোগ আছে। প্রান্তিক মানুষের জীবন, লোকজ আখ্যান বা ঢাকার বাইরের জীবনযাপন কি আমাদের বর্তমান কথাসাহিত্যে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসছে?

কাজল: কথাটা শতভাগ ঠিক ছিল, কিন্তু পোস্ট-স্বাধীনতা বা আশির দশকের পর থেকে ঢাকা কেন্দ্রিকতা কমতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরটাই তো বদলে গেছে। ঢাকা মানে এখন সারা দেশের ভাষা, রান্নাবান্না। বিভিন্ন ঢংয়ের উচ্চারণ আর সিনটেক্স মিশে গেছে আগের ভাষার সঙ্গে। কলকাতার হাফ সাহেবি বাংলা অপসৃত হয়েছে।

তবে তথাকথিত মিডিয়ার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার ফাইট চলছে এখনো। আমাদের টিভি আর ব্রডসিট পত্রিকার ভাষা এখনো আগের রীতি মেনে চলে। তাদের একটা মডারেট পরিবর্তন হয়ে যাবে একসময়।

কাজল শাহনেওয়াজের জনপ্রিয় বই ‘কাছিমগালা’। ছবি: সংগৃহীত
কাজল শাহনেওয়াজের জনপ্রিয় বই ‘কাছিমগালা’। ছবি: সংগৃহীত

স্ট্রিম: প্রকাশনা শিল্পে এখন ‘বেস্টসেলার’ বা বাজার-চাহিদার একটি বড় প্রভাব দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই বাজার-কেন্দ্রিকতা ও তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার মোহ কি প্রকৃত সাহিত্যের মান বা লেখকের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছে?

কাজল: এটা সব সময়েই ছিল, থাকবে। এই ওপেন দুনিয়ায় কতো রঙয়ের ফানুস উড়তে থাকবে। বাজার আর পুঁজির খেলায় মানুষের অংশগ্রহণ যবে থামবে তখন হয়ত মুক্তি মিলবে। তার আগে বেস্টসেলিং চলবে, পপুলার উঠবে, সিরিয়াস মার খাবে। তবে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে মান সাহিত্য। ‘হিউম্যান ভার্সন টু’ হবার আগ পর্যন্ত এই লীলা চলবে।

স্ট্রিম: বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে এখন আত্মজৈবনিক লেখা, ডিস্টোপিয়ান থিম, অভিবাসী সংকট বা পরিবেশগত বিপর্যয়ের মতো বিষয়গুলো বেশ প্রাধান্য পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের এই বাঁক বদল আপনি কীভাবে দেখছেন?

কাজল: এসব তো ঘটমান বাস্তবতা। আপনাকে গদ্যে বায়োপিক লিখতে হবে, কারণ আপনি নিজেই একটা চমৎকার চরিত্র। আপনারে আলো ফেলে দেখতে হবে বিভিন্ন ভূগোলে। দেখতে হবে ক্লাইমেট চেঞ্জে, লবণে, রেডিও অ্যাকটিভে। তারপর লিখতে হবে। এটাই লেখকের মেথডোলজি।

স্ট্রিম: বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান এখনো ততটা সুদৃঢ় নয়। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বা হারুকি মুরাকামি যেমন নিজ নিজ সংস্কৃতিকে বিশ্বজনীন করেছেন, বাংলা সাহিত্য কেন সেটা পারছে না? এর পেছনে কি মানসম্মত অনুবাদের অভাব নাকি আমাদের বিষয়বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতা দায়ী?

কাজল: বিশ্বের দরবার চলে শক্তিশালী কারেন্সির শক্তিতে। আপনার ভাষা নিজে নিজে কোথাও যেতে পারবে না। হয় তাকে অনূদিত হতে হবে সবার বোধগম্য ভাষায়। অথবা তাকে শক্তি অর্জন করতে হবে যুদ্ধ ও বাণিজ্য করে। বাণিজ্যই হচ্ছে শক্তি। যত ট্রেড তত বিস্তার, তত বিশ্বের দরবার!

আমাদের ঊনতা হচ্ছে অনুবাদে। আমরা এখনো সেই পর্বে যেতে পারিনি। আমাদের ছেলেমেয়েরা নেটিভ ইংলিশ বা চাইনিজে বা আরবিতে অনুবাদ করা শুরু করুক, প্রকাশকরা ইনভেস্ট করুক প্রচারণায়, তারপর দেখেন কি হয়। আমরা খনিভরা ভাষার তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে বসে আছি!

স্ট্রিম: আমাদের দেশের পাঠকদের মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকান বা ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুবাদ পড়ার আগ্রহ রয়েছে। এই বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব বা ছায়া কি আমাদের নিজস্ব গল্প বলার ভঙ্গি বা মৌলিকত্বকে ব্যাহত করছে, নাকি সমৃদ্ধ করছে?

কাজল: বিভিন্ন রকম পাঠ তো দারুণ ঘটনা। বেশি করে প্রভাবিত হবার চান্স। তবে ধরে ধরে অনুকরণ করে না। সৃষ্টিশীল প্রভাব জগতটারে বদলায়ে দেয়, নিজেরে জাগ্রত করে।

স্ট্রিম: বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বেই এখন এক ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক সংকট (যেমন- যুদ্ধ, সেন্সরশিপ, অসহিষ্ণুতা) চলছে। এই ধরনের ক্রান্তিকালে একজন লেখক বা কবির ভূমিকা আসলে কী হওয়া উচিত বলে আপনি বিশ্বাস করেন?

কাজল শাহনেওয়াজের আত্মজীবনীমূলক বই ‘দিঘলী’। ছবি: সংগৃহীত
কাজল শাহনেওয়াজের আত্মজীবনীমূলক বই ‘দিঘলী’। ছবি: সংগৃহীত

কাজল: নিজের শক্তি জাগ্রত করে নিজের মতো লিখতে হবে।

স্ট্রিম: বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়েই বিতর্ক চলছে। এআই যখন গল্প বা কবিতা লিখছে, তখন প্রযুক্তি কি কখনো মানুষের সৃজনশীলতা, যন্ত্রণাবোধ বা সাহিত্যের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে টেক্কা দিতে পারবে বলে আপনার মনে হয়?

কাজল: এআই কোনো সমস্যা না, যদি তারে আপনার অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজে লাগান। সে আপনার সময় বাঁচিয়ে দেবে, অনেক কিছু পড়িয়ে দেবে। বর্তমান পৃথিবীরে বুঝতে সহযোগিতা করবে। শুধু আপনাকে হতে হবে বিচক্ষণ মাস্টার বা প্রভু। একে কাজে লাগাতে হবে, অনুকরণ নয়।

স্ট্রিম: সমকালীন বিশ্বসাহিত্য বা বাংলা সাহিত্য থেকে এমন কয়েকজন তরুণ বা প্রবীণ লেখকের নাম কি বলবেন, যাদের সাম্প্রতিক কাজ আপনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে বা মুগ্ধ করেছে?

কাজল: পাবলিকলি নাম বলা শোভন নয়। এতে কারও লাভ হয়েছে বলে শুনিনি। বরং এতে অনেকের মনে গর্ব তৈরি হয়, অনেকের ওপর গজব পড়ে। এসব আড্ডায় বলা যেতে পারে।

স্ট্রিম: আপনার নিজের লেখালেখির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আগামীতে যারা সিরিয়াস সাহিত্য চর্চায় আসতে চায়, তাদের প্রতি আপনার জীবন ও সাহিত্যের অভিজ্ঞতা থেকে কী পরামর্শ থাকবে?

কাজল: আমি অনেক কয়েকটা হোমটাস্ক বা গবেষণা বা অনুসন্ধান করে রাখছি, সেগুলো লিখে শেষ করতে চাই। তাতে প্রচুর ধৈর্য ও মানুষের প্রতি বিশ্বাসমূলক ভালোবাসা দরকার। জীবন থেকে বুঝতে পেরেছি, কাজের কোনো ক্ষয় নাই, সে বহুগুণে ফিরে আসে। নিজের জন্য একটা বাউন্ডারি টানা খুব দরকার। নিজের কাছে স্পষ্ট করা চাই—কতটুক সম্পদ, কতটুকু আদার সেক্স-সান্নিধ্য, কতটা ভোগ আমার জন্য এলাউড। তবে প্রচুর বন্ধুত্ব চাই, অফুরান আশাবাদ চাই। গভীর সেন্স-অব-হিউমার চাই। চাই না জেন্ডার অপ্রেসন, নরহত্যা বা সাইবার ক্রাইম।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত