জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রাষ্ট্রপতি কার ভাষণ পড়লেন?

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ১৪: ৩১
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মূলত আওয়ামী লীগের লোক। ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগ তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তখন তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য। পেশায় আইনজীবী মো. সাহাবুদ্দিন সবশেষ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতা-কর্মীদের সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠন এবং মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত হয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। সেই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন। তিনি ছাত্রজীবনে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

নাটকীয় মোড়?

তিনিই গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনে সংবিধান অনুযায়ী সংসদে দেওয়া ভাষণে আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিবাদী দল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুন মাসে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।’ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।’

দীর্ঘ ভাষণে তিনি একবারও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারণ করেননি। জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল অবিসংবাদিত নেতার অবদানকেও আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।’

বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব না থাকলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরাট অংশজুড়েই ছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ। সেইসাথে ছিল গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরে গঠিত বিএনপি সরকারের এই সময়কালে কী কী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়েছে, আরও কী কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তার ফিরিস্তি। রাষ্ট্রপতির পুরো ভাষণটি শুনে যে কারও মনে হবে, তিনি সরকার বা বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে জাতিকে আশ্বস্ত করছেন। এসব কারণে এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আসলে কার ভাষণ দিলেন? এটি কি তার নিজের ভাষণ?

এবার কেন ওয়াকআউট?

সংবিধানের ৭৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে—সংসদ-সদস্যদের প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনের সূচনায় এবং প্রত্যেক বৎসর প্রথম অধিবেশনের সূচনায় রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর সংসদ তা নিয়ে আলোচনা করিবেন।

শনিবার সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন চলবে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এবং এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হবে ৫০ ঘণ্টা। প্রসঙ্গত, সংসদে ভাষণ দানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদ সদস্যরা যে বক্তব্য রাখেন, তার বড় অংশজুড়েই থাকে সরকার তথা সরকার প্রধানের প্রশংসা এবং নিজের এলাকার উন্নয়নের কথা। দেখা যাক, এবার তার ব্যতিক্রম হয় কিনা।

তবে বিগত দিনে সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি যখন ভাষণ দিয়েছেন, তখন বিরোধী দলের এমপিরা সংসদে তার প্রতিবাদ করেননি বা তার বক্তব্যের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেননি। যা হয়েছে এবার। যদিও রাষ্ট্রপতির ভাষণে এমন কোনো বক্তব্য ছিল না যা বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে ক্ষুব্ধ করবে। বরং পুরো ভাষণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমালোচনা ছিল। বিরোধী দল যদি রাষ্ট্রপতির ভাষণটি লিখে দিত, তাহলেও হয়তো এই ভাষার ব্যতিক্রম হতো না। তারপরও বিরোধীদলীয় সদস্যরা কেন ওয়াকআউট করলেন? বিরোদী দলের কোনো কোনো সংসদ সদস্য তো এই রাষ্ট্রপতির কাছেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন।

অভ্যুত্থানের পর থেকেই এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ অথবা অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিল জামায়াত ও এনসিপি তথা অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল। সুতরাং সংসদে তাঁর ভাষণ প্রতিহত করার চেষ্টা ছিল তাদের রাজনৈতিক কৌশল। রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের যত সমালোচনাই করুন না কেন, তাকে এখনও ফ্যাসিস্টের দোসর বলেই মনে করে জামায়াত ও এনসিপি। শুধু তাই নয়, এনসিপি রাষ্ট্রপতিকে পদচ্যুত করে গ্রেপ্তারেরও দাবি জানিয়েছে।

ভাষণে বিতর্কই ইতিহাস

বাস্তবতা হলো, সংবিধানের বিধান মেনে সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, সেটি আসলে তার নিজের ভাষণ নয়। বরং এই ভাষণ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়ে আসা সরকারি বয়ান। রাষ্ট্রপতির ভাষণ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়ে আসতে হবে এমন কোনো বিধান সংবিধানে না থাকলেও ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার কার্যবিধিতে সংশোধন এনে একটি নতুন বিধান যুক্ত করে। সেখানে বলা হয়—সংসদ ও মন্ত্রিসভার উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বার্তা মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে।

বলা হয়, এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে লক্ষ্য করে। কেন না তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের আমলে। সুতরাং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সংসদের উদ্বোধনী দিনে তাঁর বক্তৃতায় যাতে বিগত বিএনপি সরকারের সমালোচনা থাকে, সেজন্য এই বিধানটি যুক্ত করা হয় বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস তখন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত যে ভাষণ সংসদে দেন, সেটি নিয়ে ওই সময়ে বিএনপি দারুণ ক্ষুব্ধ হয়।

সেই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত অষ্টম সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের ভাষণও আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কেন না ওই ভাষণে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা ছিল। বস্তুত ওই ভাষণও সাহাবুদ্দীন আহমদের নিজের লেখা ছিল না। বরং সেই ভাষণ প্রস্তুত ও অনুমোদন করেছিল খালেদা জিয়ার সরকার।

এরপর ২০০৯ সালে শুরু হওয়া নবম সংসদের প্রথম দিনে বিএনপির লোক হিসেবে পরিচিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ভাষণ দেন। সঙ্গত কারণেই সেই ভাষণেও পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের কড়া সমালোচনা ছিল। ওই সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অভিশংসিত হওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ করেছেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণে শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম না থাকায় ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সমালোচনা করে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেছিলেন—‘এ রাষ্ট্রপতি এর আগেও অষ্টম সংসদের অধিবেশনগুলোতে ভাষণ দিয়েছেন। আমার দুঃখ লাগে, এই রাষ্ট্রপতি কত পরিবর্তন হয়ে গেছেন। এর আগেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ জিয়ার কথা বলেছেন। আজ তিনি সত্য কথাটি বলতে পারেননি। তাহলে কি তিনি রাষ্ট্রপতি আছেন, না পরিবর্তন হয়েছেন।’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৬ জানুয়ারি ২০০৯) ।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্যর দাবি কি আন্তরিক

এবার ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যে ভাষণ দিলেন, সেখানে বিগত আওয়ামী লীগের যে কড়া সমালোচনা থাকবে; সেই ভাষণে যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হবে না; সেই ভাষণে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে খুব বেশি কথা না থাকলেও যে জুলাই অভ্যুত্থান মহিমান্বিত হবে—সেটিই স্বাভাবিক। কারণ এই ভাষণ তাঁর নিজের লেখা নয়। এই ভাষণ প্রস্তুত করেছে মূলত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। সেটি চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। অবশেষে মন্ত্রিসভায় ভাষণটি অনুমোদনের পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছিল শুধু এটি সংসদে পাঠ করা। এই ভাষণের একটি দাঁড়ি কমাও তিনি নিজে লিখেছেন, সেটি ভাববার কোনো কারণ নেই।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতি কি মন্ত্রিসভার ভাষণ হুবহু পাঠ করতে বাধ্য? বা তিনি যদি এই লিখিত বক্তব্য পাঠ না করেন, তাহলে কী হবে? সংসদ কি তাকে ইম্পিচড বা অভিশংসিত করবে? সেই শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এরকম একটি ঝুঁকি নেওয়ার মতো নৈতিক জোর ও সাহস কতজন রাষ্ট্রপতির আছে বা ছিল?

অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সরকারের লিখে দেয়া ভাষণটি ‍হুবহু না পড়ে নিজের মতো করে ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারতেন। তারপর তিনি পদত্যাগ করলে সেটি আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হতো। কিন্তু তিনি এই সাহসটি কেন দেখালেন না, তারও হয়ত কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। কারণ ক্ষমতায় না থাকলে বা তিনি পদত্যাগ করলে অথবা তাকে অভিশংসিত করে সরিয়ে দেওয়া হলে তারপর তাঁর ব্যক্তিগত পরিণতি কী হবে সেই ভয়ও নিশ্চয়ই আছে।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মাননীয় নাগরিক রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ চলে আসছে ১৯৯৬ সাল থেকে। এই সংস্কৃতির অবসান হওয়া প্রয়োজন। সংসদে ভাষণদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির পরিপূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার দাবি আন্তরিক হলে তো তাই হওয়া উচিত।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পর্কিত