ড. মো. শামছুল আলম

বাংলাদেশ নদী, খাল ও জলাভূমির দেশ। একসময় দেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষি উৎপাদন এবং স্থানীয় বাণিজ্যের বড় অংশই পরিচালিত হতো এই প্রাকৃতিক জলপথকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অব্যবস্থাপনা, দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে ও নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বহুমুখী সংকটের মুখে পড়ছে। এই সংকট উত্তরণে আশু পদক্ষেপ হিসেবে তাই দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরে আসার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শুরু হচ্ছে এই খাল খনন কর্মসূচি। ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে তারেক রহমান ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। একই সময়ে দেশের আরও ৫৩টি জেলায় মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ এবং সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ, প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার নদী, নালা ও খাল খননের কাজ সম্পন্ন করা হবে। পরে ধাপে ধাপে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খনন বা পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বৃহৎ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষি খাতের সম্পর্ক গভীর। যদিও শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার ঘটেছে, তবুও বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে, বৈশ্বিক বাজারে গত দুই দশকে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে সেচকাজ এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আবার বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রায়শই তেল সংকট দেখা দেয়। তাই অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানির অভাবে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন করতে পারেন না। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই দুই সমস্যারই কার্যকর সমাধান সম্ভব।
খালগুলো যদি সচল থাকে, তাহলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যাবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
বর্ষাকালে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, খাল ও জলপথ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নতুন করে খাল খননের ফলে কয়েক মিটার গভীরতা তৈরি হবে। এতে খালগুলোতে পানি ধারণ ক্ষমতা বহুলাংশে বাড়বে, যা বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। আবার, ধারণকৃত পানি শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে।
খাল খনন কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ওপর। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন হয়। এতে স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য অস্থায়ী হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, খাল পুনরুদ্ধারের ফলে মাছ চাষ, হাঁস পালন এবং জলভিত্তিক ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। একদিকে সেচ সুবিধা বাড়বে, অন্যদিকে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তোলাও সম্ভব হবে। এর ফলে কৃষি ও মৎস্য খাত সমৃদ্ধ হবে। এতে গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়লে স্থানীয় বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবাহকে গতিশীল করবে।
বিগত কয়েক দশকে খাল ও নদী-নালা দখল হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
দেশের বিরাট অংশে বর্তমানে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খুলনা, ময়মনসিংহ ও ঢাকার বিভিন্ন জেলায় গ্রীষ্মকালে নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। ইতোমধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ জেলার মোট ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমান কর্মসূচির আওতায় খাল খননের মাধ্যমে যদি প্রাকৃতিক জলাধারগুলো পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। এটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে তা বলাই যায়।
খাল পুনরুদ্ধারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা। বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ুজনিত সমস্যার মাত্রা ও ঘনত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় কার্যকর ও সচল খাল-নদীর নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি জলপথ ও খালগুলো সচল ও নাব্য থাকে, তবে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যেমন সম্ভব হয়, তেমনি প্রয়োজনের সময় পানি সংরক্ষণ করাও সহজ হয়। এর ফলে বন্যা বা জলাবদ্ধতার ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানির জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
অতীতে বাংলাদেশে খাল খননের সফল উদাহরণ রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবন। সে সময় সারা দেশে ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করেন তিনি। জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লবের সূচনা হয়।
ভারতের নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহের ফলে শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির হাহাকার, তখন এই খালের পানি সেচের মাধ্যমে ফসলের বহুগুণ উৎপাদন সম্ভব হয়। সেই খাল খনন প্রকল্প দেশের কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত চাল বিদেশেও রপ্তানিও শুরু হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি বর্তমান কর্মসূচিটি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এর সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে তাতে সন্দেহ নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিঃসন্দেহে একজন ভিশনারি লিডার। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বিশাল এই কর্মসূচি তিনি হাতে নিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খাল খননের পর সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভরাট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে দখল ও অবৈধ স্থাপনা প্রতিরোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বলতে গেলে, এই কর্মসূচির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে খালগুলো টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। স্থানীয় জনগণ যদি এই উদ্যোগকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে মনে করে, তাহলে এর কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি দেশের অর্থনীতিতে সত্যিই একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে সেটাই জনগণের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ নদী, খাল ও জলাভূমির দেশ। একসময় দেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষি উৎপাদন এবং স্থানীয় বাণিজ্যের বড় অংশই পরিচালিত হতো এই প্রাকৃতিক জলপথকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অব্যবস্থাপনা, দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে ও নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বহুমুখী সংকটের মুখে পড়ছে। এই সংকট উত্তরণে আশু পদক্ষেপ হিসেবে তাই দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরে আসার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শুরু হচ্ছে এই খাল খনন কর্মসূচি। ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে তারেক রহমান ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। একই সময়ে দেশের আরও ৫৩টি জেলায় মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ এবং সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ, প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার নদী, নালা ও খাল খননের কাজ সম্পন্ন করা হবে। পরে ধাপে ধাপে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খনন বা পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বৃহৎ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষি খাতের সম্পর্ক গভীর। যদিও শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার ঘটেছে, তবুও বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে, বৈশ্বিক বাজারে গত দুই দশকে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে সেচকাজ এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আবার বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রায়শই তেল সংকট দেখা দেয়। তাই অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানির অভাবে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন করতে পারেন না। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই দুই সমস্যারই কার্যকর সমাধান সম্ভব।
খালগুলো যদি সচল থাকে, তাহলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যাবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
বর্ষাকালে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, খাল ও জলপথ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নতুন করে খাল খননের ফলে কয়েক মিটার গভীরতা তৈরি হবে। এতে খালগুলোতে পানি ধারণ ক্ষমতা বহুলাংশে বাড়বে, যা বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। আবার, ধারণকৃত পানি শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে।
খাল খনন কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ওপর। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন হয়। এতে স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য অস্থায়ী হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, খাল পুনরুদ্ধারের ফলে মাছ চাষ, হাঁস পালন এবং জলভিত্তিক ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। একদিকে সেচ সুবিধা বাড়বে, অন্যদিকে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তোলাও সম্ভব হবে। এর ফলে কৃষি ও মৎস্য খাত সমৃদ্ধ হবে। এতে গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়লে স্থানীয় বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবাহকে গতিশীল করবে।
বিগত কয়েক দশকে খাল ও নদী-নালা দখল হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
দেশের বিরাট অংশে বর্তমানে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খুলনা, ময়মনসিংহ ও ঢাকার বিভিন্ন জেলায় গ্রীষ্মকালে নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। ইতোমধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ জেলার মোট ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমান কর্মসূচির আওতায় খাল খননের মাধ্যমে যদি প্রাকৃতিক জলাধারগুলো পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। এটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে তা বলাই যায়।
খাল পুনরুদ্ধারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা। বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ুজনিত সমস্যার মাত্রা ও ঘনত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় কার্যকর ও সচল খাল-নদীর নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি জলপথ ও খালগুলো সচল ও নাব্য থাকে, তবে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যেমন সম্ভব হয়, তেমনি প্রয়োজনের সময় পানি সংরক্ষণ করাও সহজ হয়। এর ফলে বন্যা বা জলাবদ্ধতার ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানির জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
অতীতে বাংলাদেশে খাল খননের সফল উদাহরণ রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবন। সে সময় সারা দেশে ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করেন তিনি। জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লবের সূচনা হয়।
ভারতের নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহের ফলে শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির হাহাকার, তখন এই খালের পানি সেচের মাধ্যমে ফসলের বহুগুণ উৎপাদন সম্ভব হয়। সেই খাল খনন প্রকল্প দেশের কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত চাল বিদেশেও রপ্তানিও শুরু হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি বর্তমান কর্মসূচিটি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এর সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে তাতে সন্দেহ নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিঃসন্দেহে একজন ভিশনারি লিডার। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বিশাল এই কর্মসূচি তিনি হাতে নিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খাল খননের পর সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভরাট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে দখল ও অবৈধ স্থাপনা প্রতিরোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বলতে গেলে, এই কর্মসূচির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে খালগুলো টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। স্থানীয় জনগণ যদি এই উদ্যোগকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে মনে করে, তাহলে এর কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি দেশের অর্থনীতিতে সত্যিই একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে সেটাই জনগণের প্রত্যাশা।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার প্রথম দুই সপ্তাহে বিপুল খবর, প্রচার আর জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। সব পক্ষের রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা একে অন্যের বিপরীত কথা বলেছেন। ফলে যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতা অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে। বিশ্বজুড়ে মানুষও তথ্যের চাপে বিভ্রান্ত হয়েছে।
৩২ মিনিট আগে
ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পুরো বিশ্বের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক; বলা যায়, তিনি এখন ‘গ্লোবাল পাবলিক এনিমি নাম্বার ওয়ান’ বা বিশ্বের এক নম্বর গণশত্রু। ইরানের সঙ্গে যে অবৈধ যুদ্ধ তিনি শুরু করেছিলেন, তা থামাতে তো পারছেনই না, উল্টো ধীরে ধীরে পরাজয়ের দিকেই যাচ্ছেন।
৫ ঘণ্টা আগে
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই আগুন জ্বালায়নি। এর ভয়াবহ ধাক্কা হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে জাপান সাগর পর্যন্ত পুরো এশিয়া জুড়ে অনুভূত হচ্ছে। এই সংঘাত এশিয়ার আঞ্চলিক জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
২১ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মূলত আওয়ামী লীগের লোক। ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগ তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তখন তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য। পেশায় আইনজীবী মো. সাহাবুদ্দিন সবশেষ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন।
১ দিন আগে