জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দ্য ইকোনমিস্টের নিবন্ধ

পুরোনো ধারার বিএনপি কি নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

১৮ বছর পর একটি সুষ্ঠু ও অবিতর্কিত নির্বাচনে জয় পেলেন পরিচিত মুখ তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

এরপরই তিনি শক্ত হাতে গত ১৮ বছরে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া দলের হাল ধরেন। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি রাজধানীর গুলশানের একটি ভোট কেন্দ্রে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেন।

২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন ছিল সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। ফল ঘোষণার পর দেখা যায়, ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে। ফলে তারেক রহমানই এখন দেশটির সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী।

১৫ বছর ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জয় নিশ্চিত করেছিল। নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট দিয়ে দেওয়া, বিরোধীদের কারাবন্দি, গুম বা হত্যা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছিল।

এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের প্রাণহানির পর ক্ষমতাচ্যুত জয় হাসিনা সরকার। আন্দোলনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে পুরোনো মিত্র দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে।

হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছেন। সেই সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

তবে এই নির্বাচন উদার গণতন্ত্রের জন্য ‘নিখুঁত বিজয়’ নয়। নতুন সূচনার কথা যতই বলা হোক, ভোটাররা বেছে নিয়েছেন পুরোনো ধারার দল বিএনপিকে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বিএনপি সরকারের শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ পাঁচবার প্রথম হয়েছিল।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় সারা দেশে বিএনপির কর্মীরা আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক দখল করে নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নির্বাচনের আগেই তাদের নানা অন্যায়-অনিয়মের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্টের নিবন্ধ
দ্য ইকোনমিস্টের নিবন্ধ

এর আগের শাসনামলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ নেওয়ায় একাধিক মামলাও হয়েছে। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এখন তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তবে শুধু কথা নয়, কাজেও এর প্রমাণ দেখাতে হবে তাঁকে।

অনেকের কাছেই আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান। এবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৮টি আসন পেয়েছে। এরাই হতে যাচ্ছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল। এর আগে কখনো ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া এবং নারী প্রার্থী না দেওয়া জামায়াতের জন্য এটি বিস্ময়কর সাফল্য।

তবে অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, জামায়াতের অনেক ভোটারই কট্টর ইসলামপন্থার সমর্থক নন। তাঁরা জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন মূলত তাদের তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য। এর আগের নির্বাচনে কট্টরপন্থী থাকলেও এবার তারা সংস্কারপন্থী নানা কথা বলেছেন যা আদর্শগতভাবে তাদের দলের বিরোধী।

অনেকের মতেই, তাদের সংস্কারপন্থী কথা মূলত ফাঁকা বুলি মাত্র। এখন দেখার বিষয়, দলটির নেতারা সংস্কারপন্থী সুরে অটল থাকবেন, নাকি দলীয় সংবিধানে উল্লিখিত ‘নীতিনির্ধারণ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হবে’—এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে হাঁটবেন। যদিও এ বিষয় দুটি পরস্পরবিরোধী।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি প্রতিবাদকারীরা এবার সম্ভবত বেশি হতাশ হবেন। জুলাই আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্তটি অনেক সমর্থককে হতাশ করেছে, ফলে কিছু বিপ্লবী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

নতুন সরকারের সামনে বড় কিছু সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক সংস্কার কমিটির প্রধান আলী রীয়াজ বলেছেন, বিএনপি বারবার গণভোটে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর প্রতি অঙ্গীকার করেছে, তাই আশা করা যায় তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। তবে বিএনপির কিছু উপদেষ্টা ইতিমধ্যেই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাকারী কিছু প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন। তাঁদের ধারণা, এসব সংস্কার দলটির ক্ষমতা সীমিত করতে পারে।

এবার নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। অনেক বাংলাদেশি এখনো আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন। পছন্দের দল নির্বাচনে না থাকায় অনেকে ভোটকেন্দ্রে যাননি। বিএনপির দাবি, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে কি না, কিংবা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, তা কেবল আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

পুরোনো হোক বা নতুন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন সরকার যদি বড় সিদ্ধান্তগুলো ভুলভাবে নেয় বা আগের রূপে ফিরে যায়, তবে দেশটি হয়তো শুধু ২০০০-এর দশকেই ফিরে যাবে না, তার সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া ইসলামপন্থার চ্যালেঞ্জ।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবীন নাফিসা

Ad 300x250

সম্পর্কিত