তুফায়েল আহমদ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। জনগণের রায় জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধানে বড়সড় সংস্কারের পক্ষে গেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রে আছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা ‘বাইক্যামেরাল পার্লামেন্ট’। বিশেষ করে সংসদে নতুন করে যে ‘উচ্চকক্ষ’ বা সিনেট তৈরির প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে, তার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকের মনে কৌতূহল আছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া এবং সদস্য নির্বাচনের ধরন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণত একটি দেশের আইনসভায় দুটি কক্ষ থাকলে তাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বলে। একটি কক্ষকে নিম্নকক্ষ এবং অন্যটিকে উচ্চকক্ষ বলা হয়। আমাদের বর্তমান জাতীয় সংসদ এতদিন এককক্ষবিশিষ্ট ছিল। কিন্তু গণভোটে জুলাই সনদের প্রস্তাব পাস হওয়ায় এখন সংবিধানে সংশোধনী আনা হবে। ফলে জাতীয় সংসদ হবে নিম্নকক্ষ এবং এর পাশাপাশি ‘সিনেট’ নামে নতুন একটি উচ্চকক্ষ যুক্ত হবে। নিম্নকক্ষ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়; অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সাধারণত পরোক্ষভাবে বা ভিন্ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়। উচ্চকক্ষ থাকলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য এবং জবাবদিহি বাড়ে বলে মনে করা হয়।
জুলাই সনদের ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। সদস্যদের ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ বা পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে নির্বাচিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল মোট কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে তাদের সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হবে।
ধরা যাক, কোনো একটি দল সারা দেশে মোট ভোটের ৪০ শতাংশ পেয়েছে। তাহলে উচ্চকক্ষের ১০০টি আসনের মধ্যে তারা ৪০টি আসন পাবে। আবার যে দল ১ শতাংশ ভোট পাবে, তারা ১টি আসন পাবে। এমনকি কোনো দল নিম্নকক্ষে কোনো আসনে জয়ী হতে না পারলেও ভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি পাঠাতে পারবে।

তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার এই অংশ নিয়ে বিজয়ী দল বিএনপির সঙ্গে জুলাই সনদের কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে ‘আসনানুপাতিক’ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ নিম্নকক্ষে বা জাতীয় সংসদে একটি দল কয়টি আসন পেয়েছে, তার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে তাদের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে। কিন্তু গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবে ‘সংখ্যানুপাতিক’ বা পিআর পদ্ধতির কথা আছে। এই দুটি পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বেশি থাকে; অন্যদিকে আসনানুপাতিক পদ্ধতিতে বড় দলগুলো বেশি সুবিধা পায়।
উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মাপকাঠি নিম্নকক্ষের সদস্যদের মতোই হবে। অর্থাৎ নির্বাচনে অযোগ্য কেউ এখানে স্থান পাবেন না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রার্থী তালিকায় অন্তত ১০ শতাংশ নারী রাখতে হবে। উচ্চকক্ষের সদস্যদের মেয়াদ হবে শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে ৫ বছর। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলেও উচ্চকক্ষ বিলুপ্ত হবে না; এটি তার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। এতে দেশের রাজনীতিতে একধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
উচ্চকক্ষের মূল কাজ হবে নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনগুলো পর্যালোচনা করা। কোনো বিল বা আইনের খসড়া নিম্নকক্ষে পাস হওয়ার পর তা উচ্চকক্ষে পাঠানো হবে। উচ্চকক্ষ সেটি যাচাই-বাছাই করবে। তারা বিলে কোনো ভুল বা সংশোধনের প্রয়োজন মনে করলে তা সুপারিশসহ নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে। কোনো বিল সর্বোচ্চ দুই মাস আটকে রাখার ক্ষমতা তাদের থাকবে। তবে দুই মাস পার হলে বিলটি অনুমোদিত বলে ধরে নেওয়া হবে।
সব ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা সমান নয়। সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনতে হলে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও অভিশংসনের ক্ষেত্রেও উচ্চকক্ষের ভূমিকা থাকবে।
বিশ্বের অনেক দেশেই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে সিনেট হলো উচ্চকক্ষ এবং ‘হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’ হলো নিম্নকক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সদস্য থাকেন। এতে ছোট-বড় সব রাজ্যের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টেও দুটি কক্ষ আছে—হাউজ অব লর্ডস (উচ্চকক্ষ) এবং হাউজ অব কমন্স (নিম্নকক্ষ)। ভারতের সংসদ ব্যবস্থায় ‘রাজ্যসভা’ হলো উচ্চকক্ষ, যার সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। নেপালের উচ্চকক্ষ বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নারী, দলিত এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোটা রয়েছে।
বাংলাদেশে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আগামী সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের কাজ শেষ করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি (সংখ্যানুপাতিক বনাম আসনানুপাতিক) নিয়ে মতভেদ দূর করা জরুরি। যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের উচ্চকক্ষে আনতে হবে যেন এটি কেবল রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কেন্দ্র না হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। বিএনপি তাদের ইশতেহারের ৮ নম্বর দফা অনুযায়ী সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখেই উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করতে চায়। তাদের প্রস্তাবে ১০০ সদস্যের এই কক্ষে রাজনীতিবিদদের চেয়ে বিশেষজ্ঞ বা ‘এক্সপার্ট’দের প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষে একটি দল যতগুলো আসন পাবে, সেই ‘আসন সংখ্যার অনুপাতে’ তারা উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি পাঠাবে। বিএনপি তাদের ইশতেহারের ১২ নম্বর দফায় উচ্চকক্ষের ক্ষমতাকে কিছুটা সীমিত করেছে। তাদের মতে, সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত আছে এমন বিল উচ্চকক্ষ সর্বোচ্চ এক মাসের বেশি আটকে রাখতে পারবে না। গণভোটের প্রস্তাবে এই সময়সীমা ছিল দুই মাস।
ঢাকার একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে বিএনপি এবং গণভোট—উভয় পক্ষই একধরনের ‘বৈধতা’ পেয়েছে। জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে তাদের ইশতেহার সমর্থন করেছে, আবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলে জুলাই সনদের প্রস্তাবনাও অনুমোদন করেছে। এটি একটি সাংঘর্ষিক অবস্থান। অধ্যাপক রহমানের মতে, গণভোটের রায় পরিবর্তন করা কঠিন, তবে সংসদে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি চাইলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জনগণ পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে চায় না বলেই গণভোটে রায় দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি যেমন জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছিল, এবারও তারা গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দেবে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সম্মানজনক সমাধান আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। জনগণের রায় জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধানে বড়সড় সংস্কারের পক্ষে গেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রে আছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা ‘বাইক্যামেরাল পার্লামেন্ট’। বিশেষ করে সংসদে নতুন করে যে ‘উচ্চকক্ষ’ বা সিনেট তৈরির প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে, তার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকের মনে কৌতূহল আছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া এবং সদস্য নির্বাচনের ধরন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণত একটি দেশের আইনসভায় দুটি কক্ষ থাকলে তাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বলে। একটি কক্ষকে নিম্নকক্ষ এবং অন্যটিকে উচ্চকক্ষ বলা হয়। আমাদের বর্তমান জাতীয় সংসদ এতদিন এককক্ষবিশিষ্ট ছিল। কিন্তু গণভোটে জুলাই সনদের প্রস্তাব পাস হওয়ায় এখন সংবিধানে সংশোধনী আনা হবে। ফলে জাতীয় সংসদ হবে নিম্নকক্ষ এবং এর পাশাপাশি ‘সিনেট’ নামে নতুন একটি উচ্চকক্ষ যুক্ত হবে। নিম্নকক্ষ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়; অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সাধারণত পরোক্ষভাবে বা ভিন্ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়। উচ্চকক্ষ থাকলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য এবং জবাবদিহি বাড়ে বলে মনে করা হয়।
জুলাই সনদের ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। সদস্যদের ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ বা পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে নির্বাচিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল মোট কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে তাদের সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হবে।
ধরা যাক, কোনো একটি দল সারা দেশে মোট ভোটের ৪০ শতাংশ পেয়েছে। তাহলে উচ্চকক্ষের ১০০টি আসনের মধ্যে তারা ৪০টি আসন পাবে। আবার যে দল ১ শতাংশ ভোট পাবে, তারা ১টি আসন পাবে। এমনকি কোনো দল নিম্নকক্ষে কোনো আসনে জয়ী হতে না পারলেও ভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি পাঠাতে পারবে।

তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার এই অংশ নিয়ে বিজয়ী দল বিএনপির সঙ্গে জুলাই সনদের কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে ‘আসনানুপাতিক’ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ নিম্নকক্ষে বা জাতীয় সংসদে একটি দল কয়টি আসন পেয়েছে, তার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে তাদের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে। কিন্তু গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবে ‘সংখ্যানুপাতিক’ বা পিআর পদ্ধতির কথা আছে। এই দুটি পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বেশি থাকে; অন্যদিকে আসনানুপাতিক পদ্ধতিতে বড় দলগুলো বেশি সুবিধা পায়।
উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মাপকাঠি নিম্নকক্ষের সদস্যদের মতোই হবে। অর্থাৎ নির্বাচনে অযোগ্য কেউ এখানে স্থান পাবেন না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রার্থী তালিকায় অন্তত ১০ শতাংশ নারী রাখতে হবে। উচ্চকক্ষের সদস্যদের মেয়াদ হবে শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে ৫ বছর। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলেও উচ্চকক্ষ বিলুপ্ত হবে না; এটি তার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। এতে দেশের রাজনীতিতে একধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
উচ্চকক্ষের মূল কাজ হবে নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনগুলো পর্যালোচনা করা। কোনো বিল বা আইনের খসড়া নিম্নকক্ষে পাস হওয়ার পর তা উচ্চকক্ষে পাঠানো হবে। উচ্চকক্ষ সেটি যাচাই-বাছাই করবে। তারা বিলে কোনো ভুল বা সংশোধনের প্রয়োজন মনে করলে তা সুপারিশসহ নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে। কোনো বিল সর্বোচ্চ দুই মাস আটকে রাখার ক্ষমতা তাদের থাকবে। তবে দুই মাস পার হলে বিলটি অনুমোদিত বলে ধরে নেওয়া হবে।
সব ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা সমান নয়। সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনতে হলে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও অভিশংসনের ক্ষেত্রেও উচ্চকক্ষের ভূমিকা থাকবে।
বিশ্বের অনেক দেশেই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে সিনেট হলো উচ্চকক্ষ এবং ‘হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’ হলো নিম্নকক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সদস্য থাকেন। এতে ছোট-বড় সব রাজ্যের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টেও দুটি কক্ষ আছে—হাউজ অব লর্ডস (উচ্চকক্ষ) এবং হাউজ অব কমন্স (নিম্নকক্ষ)। ভারতের সংসদ ব্যবস্থায় ‘রাজ্যসভা’ হলো উচ্চকক্ষ, যার সদস্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। নেপালের উচ্চকক্ষ বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নারী, দলিত এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোটা রয়েছে।
বাংলাদেশে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আগামী সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের কাজ শেষ করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি (সংখ্যানুপাতিক বনাম আসনানুপাতিক) নিয়ে মতভেদ দূর করা জরুরি। যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের উচ্চকক্ষে আনতে হবে যেন এটি কেবল রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কেন্দ্র না হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। বিএনপি তাদের ইশতেহারের ৮ নম্বর দফা অনুযায়ী সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখেই উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করতে চায়। তাদের প্রস্তাবে ১০০ সদস্যের এই কক্ষে রাজনীতিবিদদের চেয়ে বিশেষজ্ঞ বা ‘এক্সপার্ট’দের প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষে একটি দল যতগুলো আসন পাবে, সেই ‘আসন সংখ্যার অনুপাতে’ তারা উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি পাঠাবে। বিএনপি তাদের ইশতেহারের ১২ নম্বর দফায় উচ্চকক্ষের ক্ষমতাকে কিছুটা সীমিত করেছে। তাদের মতে, সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত আছে এমন বিল উচ্চকক্ষ সর্বোচ্চ এক মাসের বেশি আটকে রাখতে পারবে না। গণভোটের প্রস্তাবে এই সময়সীমা ছিল দুই মাস।
ঢাকার একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে বিএনপি এবং গণভোট—উভয় পক্ষই একধরনের ‘বৈধতা’ পেয়েছে। জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে তাদের ইশতেহার সমর্থন করেছে, আবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলে জুলাই সনদের প্রস্তাবনাও অনুমোদন করেছে। এটি একটি সাংঘর্ষিক অবস্থান। অধ্যাপক রহমানের মতে, গণভোটের রায় পরিবর্তন করা কঠিন, তবে সংসদে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি চাইলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জনগণ পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে চায় না বলেই গণভোটে রায় দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি যেমন জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছিল, এবারও তারা গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দেবে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সম্মানজনক সমাধান আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিবার বিশ্বনেতাদের মধ্যে যাঁর অভিনন্দনবার্তা প্রথম পৌঁছয় ঢাকায়, তিনি প্রায় অবধারিতভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
২০ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক গণভোটে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ’ পক্ষ। স্বভাবতই মানুষের প্রশ্ন জাগছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট জেতার ফলে জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের আলোকে আগামী দিনে কী কী বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছ?
২ দিন আগে
৩০০ আসনের সংসদে সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৫১টি আসন। যখন নির্বাচনে কোনো দলই এককভাবে এই সংখ্যা ছুঁতে পারে না, তখনই সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও জোটের সমীকরণ। নির্বাচনের এই টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ঝুলন্ত সংসদ আসলে কী, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণটা কী তবে?
৪ দিন আগে
জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রথমবার দেশে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
৫ দিন আগে