ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামিয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। সারা দেশে অন্তত ৭৫টি আসনে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত মাঠে সক্রিয় ছিলেন প্রায় অর্ধশতাধিক।
মূলত তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ধানের শীষের ভোট বিভাজিত হয়ে ৩৩টি নিশ্চিত আসন হাতছাড়া হয়েছে বিএনপির। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির এই বিভাজনের সরাসরি সুফল পেয়েছে তাদের একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। হাতছাড়া হওয়া ৩৩ আসনের মধ্যে ২৬টিতেই বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সাতজন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন। এই আসনগুলো হলো—ময়মনসিংহ-১, দিনাজপুর-৫, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-৩, চাঁদপুর-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।
সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটেছে ঢাকা-১২ আসনে। এখানে বিএনপি জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। কিন্তু একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়ে ভোট কেটে নেন। এই সুযোগে ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। অথচ বিএনপি ও বিদ্রোহীর সম্মিলিত ভোট ছিল ৬০ হাজার ৮৩২, যা জামায়াতের চেয়ে বেশি। অতীতে কখনোই এই আসনে জামায়াত জয়ী হতে পারেনি।
পাবনা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৬ ভোট পেয়ে মাত্র ৩ হাজার ২৬৯ ভোটে হেরে যান জামায়াতের আলী আছগারের কাছে (১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৫ ভোট)। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম ৩৮ হাজার ২৭ ভোট না কাটলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।
একই চিত্র পাবনা-৪ আসনেও। সেখানে বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিব (১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৪) এবং বিদ্রোহী জাকারিয়া পিন্টুর (২৭ হাজার ৯৭০) দ্বন্দ্বে মাত্র ৩ হাজার ৮০১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন জামায়াতের আবু তালেব মণ্ডল (১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৫)।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে আসা মো. রাশেদ খান ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। এখানে বিদ্রোহী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট টানলে জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯ ভোট পেয়ে সহজে জয়ী হন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমী (৮ হাজার ৬১৯ ভোট) পরাজিত হন এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিনের কাছে (১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট)। এই আসনে বিএনপির দুই বিদ্রোহী মো. শাহ আলম (৩৯,৫৮৯) ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন (৪,৭৭৯) মিলে কাসেমীর নিশ্চিত জয় আটকে দেন।
বাগেরহাট জেলার চারটি আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল মাত্র ৩ হাজার ২০৪ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের মশিউর রহমান খানের কাছে পরাজিত হন। অথচ এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী শেখ মাছুদ রানা ও এম এ এইচ সেলিম মিলে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার ভোট কেটে নেন। বাগেরহাট-২ ও ৪ আসনেও জামায়াত বড় ব্যবধানে জয় পায়। ১৯৯১ সালের পর বাগেরহাটে জামায়াতের এমন সাফল্য এই প্রথম। শুধু বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির শেখ ফরিদুল ইসলাম ১৫ হাজার ৮২৭ ভোটে জয়ী হতে পেরেছেন।
এছাড়া সিলেট-৫ (খেলাফত মজলিস), চট্টগ্রাম-১৬, যশোর-৫, মাদারীপুর-১, সাতক্ষীরা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, ময়মনসিংহ-২ ও ৬, কুষ্টিয়া-১, নীলফামারী-৪, নোয়াখালী-৬, যশোর-২ এবং নড়াইল-২ আসনেও বিএনপি-সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোট ভাগাভাগিতে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এসব আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সুযোগ পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ফলে বহু আসনে তারা সুবিধা পেয়েছে। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে নির্বাচনের ফলাফল ও আসন সংখ্যা ভিন্ন হতে পারত বলেও মনে করেন তিনি।