জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়: বাংলাদেশে নতুন ভূরাজনৈতিক অধ্যায় কি শুরু হবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় শুধু দেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত নয়, বরং ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করছে।

গতকাল শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন হিসেবে বিবেচিত হয়। গেজেট অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন পেয়েছে ২০৯টি, এরপরই সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়েত-ই-ইসলাম। ইতিহাসে এবারই প্রথম তারা ৬৮টি আসন পেয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনামলের স্পষ্ট অবসান ঘটেছে। তার দীর্ঘদিনের ভারতপন্থী নীতির পর তারেক রহমানের নিরঙ্কুশ জয় আঞ্চলিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, নির্বাচনের এই ফলাফল ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ‘প্যারাডাইম শিফট’ এর সূচনা করেছে।

ফলাফল ঘোষণার পর ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী উভয়েই তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এই ফলাফলকে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রচনায় ‘একটি নতুন মোড়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশলসহ একটি নীতিগত কাঠামো আনতে পারে।’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন যে ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা এবং চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে রয়ে যাবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কি পুনর্গঠিত হবে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং কয়েক ঘণ্টা পর ফোনেও শুভেচ্ছা জানান।

নরেন্দ্র মোদি লেখেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’ তিনি বিএনপির জয়কে বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন।

নয়াদিল্লি হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক ইতিসাহের সবচেয়ে খারাপ রূপ নেয়। ২০২৪ সালের প্রাণঘাতী আন্দোলন দমনের অভিযোগে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও ভারত তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকার করে।

আল জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধের স্ক্রিনশট
আল জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধের স্ক্রিনশট

তবে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। এ বছর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায়ও অংশ নেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী থাকবে, যদিও শেখ হাসিনার আমলের মতো ঘনিষ্ঠতা হয়তো আর দেখা যাবে না। পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করেই এই সম্পর্ক বজায় রাখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন বিরোধ, সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর গুলি, এবং ভারতের পক্ষে বড় বাণিজ্য ঘাটতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে। এছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের একাংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব নতুন সরকারের ওপর কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

পাকিস্তানের দিকে ঝোঁক

ভারতের অনিশ্চয়তাকে পাকিস্তান নিজেদের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখছে। নোবেলজয়ী ড. মোহাম্মাদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। এছাড়াও উচ্চপর্যায়ের সফর এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকার এ ধারা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সাবেক পাকিস্তানি পররাষ্ট্রসচিব সালমান বশির বলেন, এই নির্বাচন ‘আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ভারতঘেঁষা নীতির অবসান’ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের সুযোগ তৈরি করেছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানে নির্মিত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছে।

তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভারতের গুরুত্ব কমতে দেবে না। ধারণা করা হচ্ছে, বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে ঢাকা। একই সঙ্গে ইসলামাবাদের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে।

চীনের সঙ্গে নতুন অধ্যায়

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হতে পারে চীনের সঙ্গে। শেখ হাসিনার শাসনামলে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ায়। অন্তর্বর্তী সরকারও প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান নিশ্চিত করে এবং উচ্চপর্যায়ের সফর করে।

শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) চীনা দূতাবাস বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় রচনার আগ্রহ প্রকাশ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি অতীতের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে আপত্তিও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হবে—যেখানে দেশের স্বার্থ অনুযায়ী চীনা বিনিয়োগ বজায় রাখা, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতিকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও নিয়মনির্ভর রাখা, যাতে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে না পড়ে।

ঢাকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য

ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতির সময় তারেক রহমান এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যখন বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বড় শক্তিগুলো বেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় আছে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—যেখানে সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক; জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে।

তবে বাস্তবতা হলো, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। এটি নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্রনীতি হঠাৎ নাটকীয়ভাবে বদলে যায় না; বরং ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়। তাই ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় ছোট ছোট পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হতে পারে, এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

বাংলাদেশের এই রায় দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন করে সমন্বয়ের সুযোগ দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে কীভাবে সে প্রতিযোগিতামূলক শক্তিগুলোর মধ্যে নিজের কৌশলগত পরিসর অক্ষুণ্ণ রেখে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে।

আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবীন নাফিসা

Ad 300x250

সম্পর্কিত