leadT1ad

হা হা রিপাবলিক: জাস্ট একটা রিঅ্যাক্ট নাকি ডিজিটাল রিভল্ট?

স্ট্রিম গ্রাফিক

সকাল সাড়ে ৮টা। বাসের ভিতর বইসা আছেন বিখ্যাত বিজয় সরণির জ্যামে। শুধু যে জ্যাম খাইতেছেন, তা কিন্তু না। এর সাথে বোনাস হিসেবে আছে ধুলা আর পোড়া তেলের ধোঁয়াও। গত ২০ মিনিটে বাস একচুলও নড়ে নাই। আপনি বইসাই আছেন, ওইদিকে অফিসে ঢোকার টাইম একটু একটু আগায়ে আসতেছে। রিয়েলিটি ভুইলা থাকার জন্য আপনি চট কইরা ফেসবুকে ঢুকলেন। ক্যাট মিম আর ওয়েডিং ওয়েভ পার কইরা হঠাৎ আপনার চোখ আটকায় গেল একটা নিউজ রিপোর্টে: 'কোনো এক হোমড়াচোমড়ার দাবি, ঢাকার বাতাস আসলে প্যারিসের চেয়েও ভালো।'

শুধু আঙ্গুল না, নিউজ হেডলাইন দেখার পর আপনার পুরা জীবনটাই থমকায় যাওয়ার কথা। আপনি নিউজটাতে কী রিঅ্যাক্ট দিবেন? অ্যাংরি রিঅ্যাকশনটা একটু ভারী হইবার কথা; ওইটা দেয়ার মতো আপনার হয়তো কোনোরকম মেন্টাল এনার্জি আর অবশিষ্ট নাই। স্যাড রিঅ্যাকশন ক্লিক করা মানেই সেলফ ডিফিট একনোলেজ করার মতো একটা ঘটনা হইতে পারে ৷ এরপর আর কিছু না ভাইবাই আপনি হাহা রিএকশন প্রেস করলেন।

খেয়াল কইরা দেখবেন, ইউ আর নট এলোন। আরও কমপক্ষে পাঁচ হাজার লোক আপনার আগে একই কাজ করছেন। ফর অ্যা মোমেন্ট, আপনি সাডেনলি ফিল করবেন, সবার সাথে আপনার একটা অদ্ভুত কানেকশন তৈরি হইছে। যেন বা আপনি আর ট্রাফিকের নাদান শিকার নন, আপনি এখন বিশাল এক কমেডি শোয়ের অডিয়েন্স সাইডের একজন।

কিন্তু অস্বস্তিকর সত্যিটা কি জানেন? ব্যাপারটা শুধুই হাস্যকর বইলা আমরা আর হাসতেছিনা। আমরা হাসতেছি, কারণ ভিতরে ভিতরে আমরা আসলে প্যারা খাইতেছি।

কামু বলছিলেন, এই চক্কররে হার মানানোর একটাই উপায়,
Imagine Sisyphus happy।
জীবনের এই অ্যাবসার্ড টর্চাররে মক করতে পারাই হয়তো-বা আমাদের একমাত্র ফ্রিডম। ফলে, দেশের দূরাবস্থা নিয়ে বানানো কোনো মিম আপনি যখন LOL বা xD লিখে শেয়ার করেন আপনি তখন সিসিফাসের মতোই হয়ে যান, দেবতাদের চোখের দিকে তাকিয়ে হয়তো বোঝাইতে চান: আমার শান্তি শৃঙ্খলার বারোটা হয়তো তুমি বানাইছো ঠিকই, কিন্তু আমার স্পিরিটের গায়ে একটা ফুলের টোকা দেয়ার সাধ্য বা ক্ষমতা তোমার নাই।

মিখাইল বাখতিন। ছবি সংগৃহীত
মিখাইল বাখতিন। ছবি সংগৃহীত

রাশান ফিলোসফার মিখাইল বাখতিনের 'কার্নিভালেস্ক' থিয়োরি কী বলে? বাখতিনের মতে, মেডিয়েভাল পিরিয়ডে একমাত্র কার্নিভাল বা উৎসবের টাইমেই গরিব প্রজারা শিরশ্ছেদের ডর ছাড়া কিং বা কুইনদের নিয়া মজা নেওয়ার সাহস পাইত এবং এই জিনিসটা একটা তৎকালীন সোসাইটির জন্য চাপায় রাখা ক্ষোভরে বের করে দেয়ার সাময়িক সুযোগ বা একটা সেফটি ভালভের মতো কাজ করত।

আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের কনটেক্সটে ইন্টারনেট হইল আমাদের সেই কার্নিভাল।

সাইবার সুরক্ষা আইনের নামে যাচ্ছেতাই নজরদারি ও খবরদারিতে ঘেরা এই তল্লাটে যেইখানে সামান্য ৩০০ শব্দের স্ট্যাটাস বা একটা অওসাম ফ্রেশ বেকড মিম আপনারে আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাইতে পারে, সেইখানে 'হা হা' রি অ্যাকশনই গরিবের মেইন ঢাল। শুধু ঢাল বললে অনেকেই হয়তো 'হা হা' রি অ্যাকশনরে একটু খাটো কইরা দেখবার সুযোগ পান। তাই একটু সুগারকোটিং কইরাই বলতে চাই, কন্টেম্পরারি টাইমে হা হা রিঅ্যাক্ট একটা পজিবল ডিনায়াবিলিটি বা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক মকারি থিকা আত্মরক্ষার সবচেয়ে সেরা কৌশল। কারণ, পাওয়ারের এগেইন্সটে ডিরেক্ট ফাইট না দিয়ে তারে লঘু কইরা ফেলা কেবলমাত্র একমাত্র হা হা রিঅ্যাক্টের পক্ষেই সম্ভব।

ফ্রেঞ্চ সমাজবিজ্ঞানী জঁ বদ্রিয়াঁর 'সিমুলাক্রাম' নামে একটা আইডিয়া আছে। বদ্রিয়াঁ সিমুলাক্রাম নামে এমন একটা অবস্থাকে এক্সপ্লেইন করছিলেন যেইখানে রিয়েলিটি বা বাস্তবতা ফেইক সিম্বল আর ইমেজ দিয়া দারুণভাবে রিপ্লেইসড হয়ে যায়। বাংলাদেশের পলিটিক্সের দিকে যদি তাকান দেখবেন, পলিটিক্স আর খালি জনসেবার ঘটনা না। পলিটিশিয়ানরা এইটারে একটা পার্ফরমেন্স আর্টের মঞ্চ বানায়া রাখছেন।

জঁ বদ্রিয়াঁ। ছবি সংগৃহীত
জঁ বদ্রিয়াঁ। ছবি সংগৃহীত

তো এমন একটা অবস্থায় আপনার বাস্তবতা যখন নিরাপত্তার অভাব, প্রতিটা ক্রাইমের বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিন্ডিকেটের দখলে থাকা বাজার বা ইত্যাদি ইত্যাদি তখন সিমুলাক্রাম স্টেটে আপনি দেখবেন খালি ঝকঝকে প্রেস ব্রিফিংয়ে খালি ভালো ভালো কথায় উন্নয়নের গালগপ্প আর বিচারিক আশ্বাসের নামে সরকারি পিআরের কচকচানি। সরকারি হোমড়াচোমড়া বা প্রথিতযশা পলিটিশিয়ানরা যখন ডাহা মিথ্যা বলেন, আর আমি আপনি তাতে হা হা দিই, আমরা মূলত এটা বুঝাইতেই দেই যে আমরা এই মিথ্যাগুলা, সিস্টেমের শাক দিয়ে রিয়েলিটির মাছ ঢাকাটা বুঝতে পারতেছি ৷ ফলে হাহা রিঅ্যাকশনকে এত নিরীহ ভাবে, ফাজলামি হিসেবে দেখার কিছু নাই ৷ এটাকে রিভোল্ট হিসেবে রিড করতে পারলেই ভালো।

বা এইটাকে একটু অন্যভাবেও দেখা যাইতে পারে। এইবার একটু আলবেয়ার কামুর কাছে , একটু অ্যাবসার্ডিটির কাছে যাই ৷ ইন্টারনেট কালচারে এই হাহা রিঅ্যাক্টের পিছনে অ্যাবসার্ডিজমেরও কিছুটা ভূমিকা থাকতে পারে। কামু যে সিসিফাসের গল্প আমাদের শুনাইছেন সে একটা ইয়া বড় পাথর ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়চূড়ায় তুলে। চূড়ায় উঠার আগেই পাথরটা গড়ায়ে নিচে পইড়া যাইতে থাকে। সিসিফাস আবারো পাথর ঠেলতে থাকে। আমাদের রেগুলার ভোগান্তিগুলা হইতেছে ওই পাথরটা ৷ আর বাংলাদেশে আমাদের ডেইলি লাইফটা হইতেছে সেই সিসিফাসের পাহাড়।

আলবেয়ার কাম্যু। ছবি সংগৃহীত
আলবেয়ার কাম্যু। ছবি সংগৃহীত

কাম্যু বলছিলেন, এই চক্কররে হার মানানোর একটাই উপায়, Imagine Sisyphus happy। জীবনের এই অ্যাবসার্ড টর্চাররে মক করতে পারাই হয়তোবা আমাদের একমাত্র ফ্রিডম। ফলে, দেশের দুরাবস্থা নিয়ে বানানো কোন মিম আপনি যখন LOL বা xD লিখে শেয়ার করেন আপনি তখন সিসিফাসের মতই হয়ে যান, দেবতাদের চোখের দিকে তাকিয়ে হয়তো বোঝাইতে চান: আমার শান্তি শৃঙ্খলার বারোটা হয়তো তুমি বানাইছো ঠিকই, কিন্তু আমার স্পিরিটের গায়ে একটা ফুলের টোকা দেয়ার সাধ্য বা ক্ষমতা তোমার নাই।

কিন্তু এই এবসার্ডিটির গল্পের একটা ডার্ক সাইড আছে।

কাম্যু আমাদের দেখাইছিলেন পাথরের ভার সয়েও কীভাবে স্পিরিট ঠিক রাখতে হয়। কিন্তু সমস্যা হইলো, বাংলাদেশে আমরা পাথরটা এখন আর শুধু পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলতেছি না, আমরা পাথরটা গড়ায় দিচ্ছি একে অপরের দিকে।

হা হা রিঅ্যাকশন কি শুধুই পাওয়ারের বিরুদ্ধে অসহায় মানুষের ঢাল? সব সময় না। বাংলাদেশে এখন হা হা রিঅ্যাকশন হয়ে উঠছে ডিজিটাল ক্যানসেল কালচারের সবচেয়ে সাইলেন্ট কিন্তু ভায়োলেন্ট অস্ত্র। খেয়াল করলে দেখবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা এখন আর ডিবেট করি না, ডিসকাস করি না। কারো মতাদর্শ পছন্দ না? তার লজিকের কাউন্টার লজিক দেয়ার টাইম বা ঘিলু খরচ করার দরকার নাই। জাস্ট একটা হা হা দিয়ে দেন।

এইখানে হা হা মানে হাসি না, এইখানে হা হা মানে 'তোমার আলাপ এতটাই ফালতু যে এইটা নিয়া সিরিয়াসলি তর্কেরও কিছু নাই।' প্রতিপক্ষকে হিউম্যান বা র‍্যাশনাল হিসেবে গণ্য না করে, তাকে জাস্ট একটা জোক বা কৌতুক বানিয়ে ফেলার নামই এখন মতাদর্শিক লড়াই। ভিন্নমতের কাউকে সামাজিকভাবে বয়কট বা ক্যানসেল করার জন্য আমাদের এখন আর লম্বা চওড়া রচনার দরকার হয় না, একটা হলুদ ইমোজিই যথেষ্ট।

মার্ক ফিশার। ছবি সংগৃহীত
মার্ক ফিশার। ছবি সংগৃহীত

এই যে আমরা একে অন্যের লজিকরে হা হা দিয়ে উড়ায় দিতেছি, এই এগ্রেশনের কারণ কী? এর উত্তর সম্ভবত পপ ফিলোসফার মার্ক ফিশারের কাছে পাওয়া যাবে। ফিশার 'রিফ্লেক্সিভ ইম্পোটেন্স' নামে একটা টার্মের কথা বলছিলেন। সোজা বাংলায়, এইটা এমন একটা মানসিক অবস্থা যেখানে লোকজন জানে যে সিস্টেম পঁইচা গেছে, কিন্তু তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নিছে যে এই সিস্টেম বদলানোর কোনো ক্ষমতা তাদের হাতে নাই।

রাষ্ট্র বা পাওয়ার যখন আমাদের নাগালের বাইরে থাকে, তখন আমাদের সব ফ্রাস্ট্রেশন গিয়া পড়ে আমাদেরই আশেপাশের মানুষের ওপর। সিস্টেমের গায়ে টোকা দিতে না পাইরা আমরা একে অন্যরে হা হা দিয়া জখম করি। আর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে? অইখানে আমরা আইরনির জগতে প্রবেশ করি।

হা হা রিপাবলিকের আসল ট্র্যাজেডিটা এই জায়গাতেই। সরাসরি রিভল্টের বদলে এই হা হা রিএকশন অনেকসময়ই অ্যানেস্থেশিয়া হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রীয় হোমড়া চোমড়ারাও এতে বেশ আরাম পান। তাদের মনে হয় ‘ইয়াংরা আমাদের ভুলভাল কথাবার্তা নিয়ে খালি মিম বানাইতেছে আর সিগমা এডিট দিতেছে, এরা অন্তত রাস্তায় নাইমা আমাদের গদি ধইরা টান দিবেনা।' ফলে আমাদের এই ডিজিটাল বিদ্রোহ অনেকসময়ই একটা নিরীহ, নির্বিষ এন্টারটেইনমেন্ট হয়াই বাঁইচা থাকে।

তাইলে দিনশেষে এই হা হা রিঅ্যাক্টের মাজেজাটা আসলে কী?

এইটা কি পাওয়ারের বিরুদ্ধে উইপন, নাকি নিজেদের অক্ষমতার সারেন্ডার? নাকি অন্যের মুখ বন্ধ করার স্কচটেপ? মেবি অল অফ দেম!

এইটা একই সাথে ট্র্যাজিক, সুন্দর এবং বিশৃঙ্খল এক স্ববিরোধিতা। ঠিক আমাদের মতোই। দেয়ালে পিঠ ঠেইকা গেলে মানুষ যখন লজিক খুঁইজা পায় না, তখন সে অর্থহীনতার অতলে ঝাঁপ দেয়। তাই রিএকশন দেওয়া থামাবেন না। মিম বানানো চালায় যান। কার্নিভাল চলতে থাকুক।

কিন্তু... মাঝে মাঝে ডিভাইসটা একটু নামায় রাখতে পারেন। খেয়াল রাখবেন, আপনার হা হা যেন অন্যের যৌক্তিক কণ্ঠস্বর থামায় দেওয়ার টুল না হয়। আর হাসতে হাসতে এতটা মশগুল হয়ে যাইয়েন না, যাতে কইরা এই হাসিটা আফিম হইয়া আপনার ভেতরের রাগটারেই বেমালুম ভুলায়া দেয়।

সার্ভাইভ করার জন্য হাসি দরকার, কিন্তু সিস্টেম বদলানোর জন্য রাগটাও জরুরি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত