মাহবুব হাসান

শিল্প-সাহিত্যের অলিগলি চিনেন অথচ সালভাদর দালির নাম শোনেন নাই, এমন পাবলিক হয়তো আছেন। তবে দালির তাতে কিচ্ছু যাইত-আসত না। লোকটা এতটাই আত্মপ্রেমে ডুইবা ছিলেন যে তার নাকি ঘুম থিকা উঠলেই আনন্দ লাগতো। কিসের আনন্দ জানেন? দালি হওয়ার আনন্দ!
ক্রিঞ্জ শিট, রাইট? কিন্তু এইখানেই তো শেষ না । এরপর দালি ভাবতেন, ‘মহান দালি না জানি আজ সারাদিন কী কী মহান কাজ করবেন!’ ওবামা নিজেরে নিজে মেডেল পড়িয়ে দিচ্ছে–এমন একটা মিম আছে না? দালি লোকটা ছিলেন ঠিক ওইরকমই। অথচ পপ কালচারের আইডিয়া ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে আধুনিক পপ কালচারের প্রায় সব ধরনের সেগমেন্টে কোনো না কোনো ওয়েতে দালির কাজের রেফারেন্স আছে। দালির জন্ম-মৃত্যুর সন-তারিখের উইকিপিডিয়া আলাপের বাইরে গিয়ে চলেন দালির ‘দালি’ হয়ে ওঠার গল্প আর তার মগজের ভিতর চলা অদ্ভুত কারখানার তালাশে নামি।

ঘুম ঘোরে মনোহর : দ্য দালি থিং
ফিলিপ হ্যালসম্যালের তোলা দালির সেই বিখ্যাত ছবিটার কথা মনে পড়তেছে । দালি ঘুমায়ে আছে, আর তার মাথার উপরে লেখা— ‘Dali is working!’ প্রথমবার ছবিটা দেইখা খুবই মজা পাইছিলাম। আমার মতো আইলসা কেউ ছবিটা দেখলে হয়তো ভাবতে পারে, ‘মালটা আইলসামিরে জাস্টিফাই করতেছে।’ কিন্তু একাডেমিতে ভর্তি হইবার পরে যখন দালির ফিলোসফি আর স্যুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো সমন্ধে জানার সুযোগ হইলো, তখন বুঝতে পারলাম ঐ ছবিটা আসলে দালির ডিপ সাইকোলজিক্যাল হ্যাবিটের একটা ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন।
মানে, দালির কাছে ঘুম খালি রেস্ট ছিল না। ঘুম তার কাছে ছিল ক্রিয়েটিভ প্রসেসের একটা টেকনিক্যাল দিক। দালি বিলিভ করতেন, জাগ্রত অবস্থায় আমাদের ব্রেইন যে র্যাশনালিটি দিয়ে সবকিছু বিচার করে, ওই জিনিসটা পিওর আর্টের জন্য একটা অবস্টাকলের ঘটনা । তাই উনি সচেতন আর অবচেতনের মাঝখানের যে ঝাপসা সময়, যারে একাডেমিক ভাষায় Hypnagogic State বলা হয়, সেইটারে কাজে লাগাইতে চাইতেন। অর্থাৎ, ফিজিক্যালি উনি যখন ইনঅ্যাক্টিভ, তার ব্রেইন তখন ব্যস্ত থাকতো স্বপ্নের দুনিয়া থেকে পরাবাস্তব সব এলিমেন্ট খোঁজায়। প্রচলিত শ্রমের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, স্বপ্নের জগতকে শিল্পের কাঁচামালে পরিণত করাই ছিল তার সিগনেচার স্টাইল, দ্য ক্লাসিক দালি থিং !
কিন্তু দালি কি অনলি স্বপ্নই দেখতেন? যদি তাই হইতো স্বপ্নরে উনি ক্যানভাসে নিয়ে আসতেন কেমনে ? কাহিনির এই মোড়েই দালির সাথে একাডেমিক সায়েন্সের দেখা হয়, আর মঞ্চে আইসা হাজিরা দেন উস্তাদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড। দালির যে এই ঘুমায়ে কাজ করা বা অবচেতন নিয়ে কাজ কারবার, এইটার পেছনে যে একটা থিয়োরিটিক্যাল বেজমেন্ট আছে তা প্রথম আবিষ্কার হয় সেই সময়। ফ্রয়েড সাবকনশাস মাইন্ড, স্বপ্ন আর সাপ্রেসড ডিজায়ারের কথা এন্ডোর্স করার পর দালি যেন একলাই সেই আলাপ লুইফা নিলেন! ফ্রয়েডের ঐ থিওরিরেই দালি শিল্পের ক্যানভাসে রূপ দিলেন, যার পোশাকি নাম হইলো স্যুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ।
সহজ ভাষায়, স্যুররিয়ালিজম হইলো যুক্তির শিকলরে ছিঁড়ে ফেইলা অবচেতন মনের লাগামহীন ভ্রমণ। দালি ফ্রয়েডের ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন বা স্বপ্নের যুক্তির মতো ধারণাগুলোরে কাজে লাগায়ে নিজস্ব এক মেথড তৈরি করেছিলেন, যার নাম দিছিলেন প্যারানয়াক ক্রিটিকাল মেথড। এই প্রসেসে দালি ইচ্ছা কইরাই নিজেরে একটা বিভ্রমের জগতে নিয়ে যাইতেন, যেখানে উনি বাস্তব কিছুর মধ্যে অবাস্তব সব কানেকশন খুঁইজা বের করতেন। সোজা কথায়, জাইগা থাইকাই স্বপ্ন দেখার প্র্যাকটিস করতেন দালি।
এই মেথডের সবচেয়ে সুন্দর এক্সামপল দালির আইকনিক আর্টওয়ার্ক ‘The Persistence of Memory’।

একটা বিচে কয়েকটা ঘড়ি গলে মাখনের মতো পইড়া আছে। প্রথমবার ছবিটা দেইখা মনে হইছিলো গরমে হয়তো ঘড়ি গলে গেছে! পরে বুঝলাম, এই গলে যাওয়া ঘড়ি আসলে ফ্লুইড টাইমের সিম্বল। স্বপ্নে যেমন সময়ের কোনো আগামাথা থাকে না, দালির ঘড়িও তেমনই–হার্ড রিয়েলিটিরে রিফিউজ কইরা গইলা যাচ্ছে। মজার ফ্যাক্ট হইলো, দালি নাকি একদিন দুপুরের রইদে গলতে থাকা ক্যামেমবার্ড চিজ দেইখা এই ছবির আইডিয়া পাইছিলেন!
ফ্রয়েড যখন এলো, তখন অবধারিতভাবেই সেক্স বা যৌনতার প্রসঙ্গ চইলা আসে। দালির বিভিন্ন কাজে যৌনতা, মৃত্যুভয় আর অবসেশনের মতো জিনিস বারবার দেখা গেছে। দালির সময়কালে এই জিনিসগুলারে আর্টে অনেক রোমান্টিকভাবে পোর্ট্রে করতে দেখা যাইতো । কিন্তু দালির কাজে এই সাব্জেক্টগুলা বেশ স্ক্যারি ওয়েতে আইসা হাজির হইলো।

উদাহরণ হিসেবে ‘The Great Masturbator’ ছবিটার কথাই ধরি। দেখেন, একটা বিশাল পাথরের মতো স্ট্রাকচার, এর গায়ে লেপ্টায়ে আছে এক নারীর মুখ আর একটা ফড়িং (দালি ফড়িং মারাত্মক ডরাইতেন)। এই ছবিটা মূলত দালির সেক্সুয়াল এংজাইটির একটা ক্রিটিক্যাল প্রেজেন্টেশন। চাইল্ডহুডে বাপের কাছে শোনা সেক্সুয়াল ডিজিজের ভয়ংকর সব গল্প তার মনে যে ট্রমা তৈরি করছিল, ঐটাই যেন দালি চান্সে উগড়ায় দিলেন।
আরেকটা ছবির কথা মনে আসলো! ‘Dream Caused by the Flight of a Bee Around a Pomegranate a Second Before Awakening’ । টাইটেল তো না, যেন একটা ছোটখাটো প্যারাগ্রাফ! নামের মতো ছবিটাও বেশ উইয়ার্ড। একটা ঘুমন্ত নারীর পাশে আনার ফাইটা মাছ বের হয়ে আসতেছে, মাছের মুখ থেকে বাঘ, আর বাঘ ঐ নারীর দিকে বন্দুকের বেয়নেট তাক করে রাখছে–সব মিলায়ে একটা জগাখিচুড়ি সিচুয়েশন। ফ্রয়েড বলতেন, বাইরের কোনো টাচ বা সাউন্ড ঘুমের ভেতরে আমাদের মস্তিষ্কে অদ্ভুত সব স্বপ্নের প্লট তৈরি করে। কীভাবে এক সেকেন্ডের এক্সটার্নাল স্টিমুলি একটা অ্যাকশন প্যাকড স্বপ্নের জন্ম দিতে পারে–দালি সম্ভবত এই ছবিতে ঠিক ওই মেকানিজমটাই আঁকার ট্রাই করছিলেন!

গালা সুপ্রিমেসি : দ্য মিউজ এন্ড মাস্টারমাইন্ড
আমার মনে হয়, দালির পাগলামির রিমোট কন্ট্রোল যার হাতে ছিল তার নাম গালা (হেলেনা দিয়াকোনোভা)। গালা ছিলেন দালির ওয়াইফ অ্যান্ড মিউজ। শুধু তা-ই না, দালির ম্যানেজার অ্যান্ড পিআর এজেন্টও ছিলেন মেবি উনি। দালির পেইন্টিংয়ে অনেকবার গালাকে দেখা গেছে। গালা আর দালির রিলেশনশিপের ডাইমেনশনটা দালিরে বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। দালির চেয়ে প্রায় ১০ বছরের বড় ছিলেন গালা। দালি যখন গালার প্রেমে পড়েন, তখন দালি ছিলেন সোশ্যাল এংজাইটিতে ভয়ানক ডিসফাংশনাল একটা মানুষ। দালি নিজের আত্মজীবনী 'The Secret Life of Salvador Dalí'-তে বলতেছিলেন, ট্রেনের টিকিট কাটা, রাস্তা পার হওয়া বা জুতার ফিতা বাঁধার মতো সাধারণ কাজগুলাও উনি একা একা করতে পারতেন না। গালা ম্যানচাইল্ড দালিরে বাচ্চার মতো দেখাশোনা করতেন।

দালি গালার প্রতি কতটা অবসেসড ছিলেন, একটা লিগ্যাল ফ্যাক্ট ধইরাই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। দালি নিজের ছবির নিচে সাইন করতেন ‘Gala Salvador Dali’ নামে। দালি গালারে ক্যাসেল অব পুবোল নামের একটা মধ্যযুগীয় রাজপ্রাসাদ কিনে দিছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হইতেছে, গালার রিটেন ইনভাইটেশন ছাড়া দালির ঐ রাজপ্রাসাদে যাওয়া নিষেধ ছিল। Soft Self-Portrait of Salvador Dali ডকুমেন্টারি যদি দেইখা থাকেন, অইখানে দেখবেন, দালি যখন কথা বলতেন, গালা তখন বাচ্চার মায়ের মতো পাশে বইসা থাকতেন। দালি অল্প বয়সে মায়েরে হারাইছেন। তার মধ্যে গালাকেন্দ্রিক অডিপাস কমপ্লেক্সের ঘটনা থাকলেও থাকতে পারে। তবে যা-ই হোক, আই থিঙ্ক দালির সাকসেসফুল হবার পেছনে গালার এই ‘মম অ্যান্ড ম্যানেজার’ রোলটা খুবই ইফেক্টিভলি কাজ করছে। দালি যখন ক্যানভাসে রঙ ছড়াইতেছিলেন, গালা তখন গ্যালারি-মালিকদের সাথে হার্ডকোর বার্গেনিং করতেছেন। প্রেম, ডমিনেন্স আর ব্যবসার এমন ডেডলি কম্বিনেশন আর্ট হিস্ট্রিতে কি আর আছে? না মেবি।
আভিদা ডলারস: পপ কালচারের দালি
দালি নিজেরে বহুবার পপ আর্টিস্ট দাবি করছেন। অ্যান্ডি ওয়ারহলের অনেক আগেই দালি বুঝতে পারছিলেন, আর্ট শুধু মিউজিয়ামে ঝুইলা থাকার জিনিস না। পণ্যের মোড়ক, বিজ্ঞাপন আর পপ কালচারের মধ্যেও আর্ট থাকতে পারে।
ছোটবেলায় আমরা অনেকেই Chupa Chups ললিপপ খাইছি। চুপা চুপসের ওই বিখ্যাত ফুলকপির মতো লোগোটা কার ডিজাইন করা জানেন? সালভাদর দালির! ১৯৬৯ সালে একটা কফিশপে বইসা ন্যাপকিনের ওপর তিনি এই লোগোটা আঁকছিলেন।

শুধু তা-ই না, দালি টিভি কমার্শিয়ালে অভিনয় করেছেন, এমনকি অ্যালফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ সিনেমাতে স্বপ্নের দৃশ্যও ডিজাইন কইরা দিছেন। ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওর লগে কাজ করেছেন ‘ডেস্টিনো’ নামের প্রজেক্টে।

দালির সমসাময়িক অনেকেই মনে করতেন দালির টাকা কামানোর নেশা আছে। স্যুররিয়ালিস্ট গ্রুপের বস আন্দ্রে ব্রেঁতো তার নাম দিছিলেন ‘আভিদা ডলারস’ যারে বাংলায় ট্যাকার কাঙাল বলা যায় । কিন্তু দালি এতে প্যারা না খাইয়া উল্টা এঞ্জয় করতেন।
আজকের নেটফ্লিক্স যুগেও দালি প্রবলভাবে রেলিভ্যান্ট হয়ে আছেন। জনপ্রিয় স্প্যানিশ সিরিজ ‘মানি হাইস্ট’ (La Casa de Papel) দেখলেই তা টের পাওয়া যায়। ঐ সিরিজে ডাকাতরা যে মুখোশ পরে চুরি করতে ঢোকে, সেই বাঁকানো গোঁফওয়ালা মুখোশটি কার? সালভাদর দালির! এই মুখোশ এখন সারা ওয়ার্ল্ডে রিভোল্টের সিম্বল হইয়া উঠছে।
দালি আধুনিক আর্ট আর ডিজাইনেরও একজন পায়োনিয়ার লোক। ঠোঁটের আকৃতির সোফা (Mae West Lips Sofa), লবস্টার টেলিফোনের মতো অদ্ভুত সব আসবাব ডিজাইন কইরা গেছেন উনি। আজকের ইন্টেরিয়র ডিজাইন বা ফ্যাশন শোতে যে অ্যাবস্ট্রাক্ট ইন্সটলেশন দেখা যায়, তার বীজ দালিই বুইনা গেছেন বইলা মনে করেন দেশ বিদেশের আর্ট ক্রিটিকরা। আর এই জন্যই স্পেনের পোর্ট লিগাত বা ফিগুয়েরেসে তার থিয়েটার মিউজিয়ামটা আজও পর্যটকদের কাছে হলি প্লেসের মতো।
গত ২৩ জানুয়ারি ছিল দালির ডেথ এনিভার্সারি। ক্যালেন্ডারের হিসেবে ১৯৮৯ সালে উনি মারা গেছেন ঠিকই, কিন্তু পপ কালচারের টাইমলাইনে দালি ইজ স্টিল অ্যালাইভ অ্যান্ড কিকিং। আজকের যুগে আমরা যারা পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং, ভিউজ আর এটেনশন ইকোনমি নিয়া চিল্লাই, দালি ছিলেন তাদের সবার গডফাদার। উনি আমাদের শিখাইয়া গেছেন কীভাবে নিজের জীবনটারে একটা লিভিং আর্টপিস বানায় ফেলতে হয়।
মানি হাইস্টের মুখোশে, চুপা চুপসের লোগোতে, কিংবা আমাদের অবচেতন মনের উদ্ভট স্বপ্নে দালি আছেন, দালি থাকবেন। শুরুর সেই ছবিটার কথা মনে আছে তো? যেইখানে দালি ঘুমাইতেছিল আর লেখা ছিল Dali is working? আমার ধারণা, দালি মরার পরেও এই সিন-সিনারি খুব একটা বদলায় নাই। হয়তো পরপারে বইসাও তার মাথার ওপর এখনো অদৃশ্য কালিতে লেখা আছে 'Dali is working!'
কারণ, দালির মতো জিনিয়াসদের কোনোদিন ছুটি হয় না।
প্রিয় দালি, আমাদের হাত ধইরা আপনার পাগলামি বাইচা থাকুক অনন্তকাল।

শিল্প-সাহিত্যের অলিগলি চিনেন অথচ সালভাদর দালির নাম শোনেন নাই, এমন পাবলিক হয়তো আছেন। তবে দালির তাতে কিচ্ছু যাইত-আসত না। লোকটা এতটাই আত্মপ্রেমে ডুইবা ছিলেন যে তার নাকি ঘুম থিকা উঠলেই আনন্দ লাগতো। কিসের আনন্দ জানেন? দালি হওয়ার আনন্দ!
ক্রিঞ্জ শিট, রাইট? কিন্তু এইখানেই তো শেষ না । এরপর দালি ভাবতেন, ‘মহান দালি না জানি আজ সারাদিন কী কী মহান কাজ করবেন!’ ওবামা নিজেরে নিজে মেডেল পড়িয়ে দিচ্ছে–এমন একটা মিম আছে না? দালি লোকটা ছিলেন ঠিক ওইরকমই। অথচ পপ কালচারের আইডিয়া ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে আধুনিক পপ কালচারের প্রায় সব ধরনের সেগমেন্টে কোনো না কোনো ওয়েতে দালির কাজের রেফারেন্স আছে। দালির জন্ম-মৃত্যুর সন-তারিখের উইকিপিডিয়া আলাপের বাইরে গিয়ে চলেন দালির ‘দালি’ হয়ে ওঠার গল্প আর তার মগজের ভিতর চলা অদ্ভুত কারখানার তালাশে নামি।

ঘুম ঘোরে মনোহর : দ্য দালি থিং
ফিলিপ হ্যালসম্যালের তোলা দালির সেই বিখ্যাত ছবিটার কথা মনে পড়তেছে । দালি ঘুমায়ে আছে, আর তার মাথার উপরে লেখা— ‘Dali is working!’ প্রথমবার ছবিটা দেইখা খুবই মজা পাইছিলাম। আমার মতো আইলসা কেউ ছবিটা দেখলে হয়তো ভাবতে পারে, ‘মালটা আইলসামিরে জাস্টিফাই করতেছে।’ কিন্তু একাডেমিতে ভর্তি হইবার পরে যখন দালির ফিলোসফি আর স্যুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো সমন্ধে জানার সুযোগ হইলো, তখন বুঝতে পারলাম ঐ ছবিটা আসলে দালির ডিপ সাইকোলজিক্যাল হ্যাবিটের একটা ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন।
মানে, দালির কাছে ঘুম খালি রেস্ট ছিল না। ঘুম তার কাছে ছিল ক্রিয়েটিভ প্রসেসের একটা টেকনিক্যাল দিক। দালি বিলিভ করতেন, জাগ্রত অবস্থায় আমাদের ব্রেইন যে র্যাশনালিটি দিয়ে সবকিছু বিচার করে, ওই জিনিসটা পিওর আর্টের জন্য একটা অবস্টাকলের ঘটনা । তাই উনি সচেতন আর অবচেতনের মাঝখানের যে ঝাপসা সময়, যারে একাডেমিক ভাষায় Hypnagogic State বলা হয়, সেইটারে কাজে লাগাইতে চাইতেন। অর্থাৎ, ফিজিক্যালি উনি যখন ইনঅ্যাক্টিভ, তার ব্রেইন তখন ব্যস্ত থাকতো স্বপ্নের দুনিয়া থেকে পরাবাস্তব সব এলিমেন্ট খোঁজায়। প্রচলিত শ্রমের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, স্বপ্নের জগতকে শিল্পের কাঁচামালে পরিণত করাই ছিল তার সিগনেচার স্টাইল, দ্য ক্লাসিক দালি থিং !
কিন্তু দালি কি অনলি স্বপ্নই দেখতেন? যদি তাই হইতো স্বপ্নরে উনি ক্যানভাসে নিয়ে আসতেন কেমনে ? কাহিনির এই মোড়েই দালির সাথে একাডেমিক সায়েন্সের দেখা হয়, আর মঞ্চে আইসা হাজিরা দেন উস্তাদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড। দালির যে এই ঘুমায়ে কাজ করা বা অবচেতন নিয়ে কাজ কারবার, এইটার পেছনে যে একটা থিয়োরিটিক্যাল বেজমেন্ট আছে তা প্রথম আবিষ্কার হয় সেই সময়। ফ্রয়েড সাবকনশাস মাইন্ড, স্বপ্ন আর সাপ্রেসড ডিজায়ারের কথা এন্ডোর্স করার পর দালি যেন একলাই সেই আলাপ লুইফা নিলেন! ফ্রয়েডের ঐ থিওরিরেই দালি শিল্পের ক্যানভাসে রূপ দিলেন, যার পোশাকি নাম হইলো স্যুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ।
সহজ ভাষায়, স্যুররিয়ালিজম হইলো যুক্তির শিকলরে ছিঁড়ে ফেইলা অবচেতন মনের লাগামহীন ভ্রমণ। দালি ফ্রয়েডের ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন বা স্বপ্নের যুক্তির মতো ধারণাগুলোরে কাজে লাগায়ে নিজস্ব এক মেথড তৈরি করেছিলেন, যার নাম দিছিলেন প্যারানয়াক ক্রিটিকাল মেথড। এই প্রসেসে দালি ইচ্ছা কইরাই নিজেরে একটা বিভ্রমের জগতে নিয়ে যাইতেন, যেখানে উনি বাস্তব কিছুর মধ্যে অবাস্তব সব কানেকশন খুঁইজা বের করতেন। সোজা কথায়, জাইগা থাইকাই স্বপ্ন দেখার প্র্যাকটিস করতেন দালি।
এই মেথডের সবচেয়ে সুন্দর এক্সামপল দালির আইকনিক আর্টওয়ার্ক ‘The Persistence of Memory’।

একটা বিচে কয়েকটা ঘড়ি গলে মাখনের মতো পইড়া আছে। প্রথমবার ছবিটা দেইখা মনে হইছিলো গরমে হয়তো ঘড়ি গলে গেছে! পরে বুঝলাম, এই গলে যাওয়া ঘড়ি আসলে ফ্লুইড টাইমের সিম্বল। স্বপ্নে যেমন সময়ের কোনো আগামাথা থাকে না, দালির ঘড়িও তেমনই–হার্ড রিয়েলিটিরে রিফিউজ কইরা গইলা যাচ্ছে। মজার ফ্যাক্ট হইলো, দালি নাকি একদিন দুপুরের রইদে গলতে থাকা ক্যামেমবার্ড চিজ দেইখা এই ছবির আইডিয়া পাইছিলেন!
ফ্রয়েড যখন এলো, তখন অবধারিতভাবেই সেক্স বা যৌনতার প্রসঙ্গ চইলা আসে। দালির বিভিন্ন কাজে যৌনতা, মৃত্যুভয় আর অবসেশনের মতো জিনিস বারবার দেখা গেছে। দালির সময়কালে এই জিনিসগুলারে আর্টে অনেক রোমান্টিকভাবে পোর্ট্রে করতে দেখা যাইতো । কিন্তু দালির কাজে এই সাব্জেক্টগুলা বেশ স্ক্যারি ওয়েতে আইসা হাজির হইলো।

উদাহরণ হিসেবে ‘The Great Masturbator’ ছবিটার কথাই ধরি। দেখেন, একটা বিশাল পাথরের মতো স্ট্রাকচার, এর গায়ে লেপ্টায়ে আছে এক নারীর মুখ আর একটা ফড়িং (দালি ফড়িং মারাত্মক ডরাইতেন)। এই ছবিটা মূলত দালির সেক্সুয়াল এংজাইটির একটা ক্রিটিক্যাল প্রেজেন্টেশন। চাইল্ডহুডে বাপের কাছে শোনা সেক্সুয়াল ডিজিজের ভয়ংকর সব গল্প তার মনে যে ট্রমা তৈরি করছিল, ঐটাই যেন দালি চান্সে উগড়ায় দিলেন।
আরেকটা ছবির কথা মনে আসলো! ‘Dream Caused by the Flight of a Bee Around a Pomegranate a Second Before Awakening’ । টাইটেল তো না, যেন একটা ছোটখাটো প্যারাগ্রাফ! নামের মতো ছবিটাও বেশ উইয়ার্ড। একটা ঘুমন্ত নারীর পাশে আনার ফাইটা মাছ বের হয়ে আসতেছে, মাছের মুখ থেকে বাঘ, আর বাঘ ঐ নারীর দিকে বন্দুকের বেয়নেট তাক করে রাখছে–সব মিলায়ে একটা জগাখিচুড়ি সিচুয়েশন। ফ্রয়েড বলতেন, বাইরের কোনো টাচ বা সাউন্ড ঘুমের ভেতরে আমাদের মস্তিষ্কে অদ্ভুত সব স্বপ্নের প্লট তৈরি করে। কীভাবে এক সেকেন্ডের এক্সটার্নাল স্টিমুলি একটা অ্যাকশন প্যাকড স্বপ্নের জন্ম দিতে পারে–দালি সম্ভবত এই ছবিতে ঠিক ওই মেকানিজমটাই আঁকার ট্রাই করছিলেন!

গালা সুপ্রিমেসি : দ্য মিউজ এন্ড মাস্টারমাইন্ড
আমার মনে হয়, দালির পাগলামির রিমোট কন্ট্রোল যার হাতে ছিল তার নাম গালা (হেলেনা দিয়াকোনোভা)। গালা ছিলেন দালির ওয়াইফ অ্যান্ড মিউজ। শুধু তা-ই না, দালির ম্যানেজার অ্যান্ড পিআর এজেন্টও ছিলেন মেবি উনি। দালির পেইন্টিংয়ে অনেকবার গালাকে দেখা গেছে। গালা আর দালির রিলেশনশিপের ডাইমেনশনটা দালিরে বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। দালির চেয়ে প্রায় ১০ বছরের বড় ছিলেন গালা। দালি যখন গালার প্রেমে পড়েন, তখন দালি ছিলেন সোশ্যাল এংজাইটিতে ভয়ানক ডিসফাংশনাল একটা মানুষ। দালি নিজের আত্মজীবনী 'The Secret Life of Salvador Dalí'-তে বলতেছিলেন, ট্রেনের টিকিট কাটা, রাস্তা পার হওয়া বা জুতার ফিতা বাঁধার মতো সাধারণ কাজগুলাও উনি একা একা করতে পারতেন না। গালা ম্যানচাইল্ড দালিরে বাচ্চার মতো দেখাশোনা করতেন।

দালি গালার প্রতি কতটা অবসেসড ছিলেন, একটা লিগ্যাল ফ্যাক্ট ধইরাই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। দালি নিজের ছবির নিচে সাইন করতেন ‘Gala Salvador Dali’ নামে। দালি গালারে ক্যাসেল অব পুবোল নামের একটা মধ্যযুগীয় রাজপ্রাসাদ কিনে দিছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হইতেছে, গালার রিটেন ইনভাইটেশন ছাড়া দালির ঐ রাজপ্রাসাদে যাওয়া নিষেধ ছিল। Soft Self-Portrait of Salvador Dali ডকুমেন্টারি যদি দেইখা থাকেন, অইখানে দেখবেন, দালি যখন কথা বলতেন, গালা তখন বাচ্চার মায়ের মতো পাশে বইসা থাকতেন। দালি অল্প বয়সে মায়েরে হারাইছেন। তার মধ্যে গালাকেন্দ্রিক অডিপাস কমপ্লেক্সের ঘটনা থাকলেও থাকতে পারে। তবে যা-ই হোক, আই থিঙ্ক দালির সাকসেসফুল হবার পেছনে গালার এই ‘মম অ্যান্ড ম্যানেজার’ রোলটা খুবই ইফেক্টিভলি কাজ করছে। দালি যখন ক্যানভাসে রঙ ছড়াইতেছিলেন, গালা তখন গ্যালারি-মালিকদের সাথে হার্ডকোর বার্গেনিং করতেছেন। প্রেম, ডমিনেন্স আর ব্যবসার এমন ডেডলি কম্বিনেশন আর্ট হিস্ট্রিতে কি আর আছে? না মেবি।
আভিদা ডলারস: পপ কালচারের দালি
দালি নিজেরে বহুবার পপ আর্টিস্ট দাবি করছেন। অ্যান্ডি ওয়ারহলের অনেক আগেই দালি বুঝতে পারছিলেন, আর্ট শুধু মিউজিয়ামে ঝুইলা থাকার জিনিস না। পণ্যের মোড়ক, বিজ্ঞাপন আর পপ কালচারের মধ্যেও আর্ট থাকতে পারে।
ছোটবেলায় আমরা অনেকেই Chupa Chups ললিপপ খাইছি। চুপা চুপসের ওই বিখ্যাত ফুলকপির মতো লোগোটা কার ডিজাইন করা জানেন? সালভাদর দালির! ১৯৬৯ সালে একটা কফিশপে বইসা ন্যাপকিনের ওপর তিনি এই লোগোটা আঁকছিলেন।

শুধু তা-ই না, দালি টিভি কমার্শিয়ালে অভিনয় করেছেন, এমনকি অ্যালফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ সিনেমাতে স্বপ্নের দৃশ্যও ডিজাইন কইরা দিছেন। ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওর লগে কাজ করেছেন ‘ডেস্টিনো’ নামের প্রজেক্টে।

দালির সমসাময়িক অনেকেই মনে করতেন দালির টাকা কামানোর নেশা আছে। স্যুররিয়ালিস্ট গ্রুপের বস আন্দ্রে ব্রেঁতো তার নাম দিছিলেন ‘আভিদা ডলারস’ যারে বাংলায় ট্যাকার কাঙাল বলা যায় । কিন্তু দালি এতে প্যারা না খাইয়া উল্টা এঞ্জয় করতেন।
আজকের নেটফ্লিক্স যুগেও দালি প্রবলভাবে রেলিভ্যান্ট হয়ে আছেন। জনপ্রিয় স্প্যানিশ সিরিজ ‘মানি হাইস্ট’ (La Casa de Papel) দেখলেই তা টের পাওয়া যায়। ঐ সিরিজে ডাকাতরা যে মুখোশ পরে চুরি করতে ঢোকে, সেই বাঁকানো গোঁফওয়ালা মুখোশটি কার? সালভাদর দালির! এই মুখোশ এখন সারা ওয়ার্ল্ডে রিভোল্টের সিম্বল হইয়া উঠছে।
দালি আধুনিক আর্ট আর ডিজাইনেরও একজন পায়োনিয়ার লোক। ঠোঁটের আকৃতির সোফা (Mae West Lips Sofa), লবস্টার টেলিফোনের মতো অদ্ভুত সব আসবাব ডিজাইন কইরা গেছেন উনি। আজকের ইন্টেরিয়র ডিজাইন বা ফ্যাশন শোতে যে অ্যাবস্ট্রাক্ট ইন্সটলেশন দেখা যায়, তার বীজ দালিই বুইনা গেছেন বইলা মনে করেন দেশ বিদেশের আর্ট ক্রিটিকরা। আর এই জন্যই স্পেনের পোর্ট লিগাত বা ফিগুয়েরেসে তার থিয়েটার মিউজিয়ামটা আজও পর্যটকদের কাছে হলি প্লেসের মতো।
গত ২৩ জানুয়ারি ছিল দালির ডেথ এনিভার্সারি। ক্যালেন্ডারের হিসেবে ১৯৮৯ সালে উনি মারা গেছেন ঠিকই, কিন্তু পপ কালচারের টাইমলাইনে দালি ইজ স্টিল অ্যালাইভ অ্যান্ড কিকিং। আজকের যুগে আমরা যারা পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং, ভিউজ আর এটেনশন ইকোনমি নিয়া চিল্লাই, দালি ছিলেন তাদের সবার গডফাদার। উনি আমাদের শিখাইয়া গেছেন কীভাবে নিজের জীবনটারে একটা লিভিং আর্টপিস বানায় ফেলতে হয়।
মানি হাইস্টের মুখোশে, চুপা চুপসের লোগোতে, কিংবা আমাদের অবচেতন মনের উদ্ভট স্বপ্নে দালি আছেন, দালি থাকবেন। শুরুর সেই ছবিটার কথা মনে আছে তো? যেইখানে দালি ঘুমাইতেছিল আর লেখা ছিল Dali is working? আমার ধারণা, দালি মরার পরেও এই সিন-সিনারি খুব একটা বদলায় নাই। হয়তো পরপারে বইসাও তার মাথার ওপর এখনো অদৃশ্য কালিতে লেখা আছে 'Dali is working!'
কারণ, দালির মতো জিনিয়াসদের কোনোদিন ছুটি হয় না।
প্রিয় দালি, আমাদের হাত ধইরা আপনার পাগলামি বাইচা থাকুক অনন্তকাল।

২০২৫ এর পয়লা জানুয়ারি। আপনি, আমি এবং আমাদের মতো একদল অতি উৎসাহী রিডার কসম খাইছিলাম এই বছরটা বই পইড়া একেবারে দুনিয়া উল্টায় ফেলব। গুডরিডসের রিডিং চ্যালেঞ্জে ৬০টা বই পড়ব বইলা যে হম্বিতম্বিটা করছিলাম, বছর শেষে দেখা গেল সেই চ্যালেঞ্জের নিচে চাপা পইড়া ইজ্জত যায় যায় দশা।
৬ দিন আগে
ফ্ল্যাশব্যাক ২০১৭ ৷ বাংলাদেশের বিনোদন জগতের আকাশ-বাতাস ভারী হয়া আছে সেলিব্রেটি কাপল তাহসান-মিথিলার বিচ্ছেদের কালো মেঘে৷ কেউ বিশ্বাসই করতে পারতেছেনা এই রকম একটা পারফেক্ট কাপল আলাদা হয়ে যাইতে পারে ৷
১৫ দিন আগে
পরিচিত ভাইব্রাদার, যারা স্করসেজির 'দ্য আইরিশম্যান' দেখতে দেখতে মাঝপথে ঘুমায় যাওয়ার পোস্ট দিছিলেন, তারাও দেখলাম 'রেস্ট ইন পিস লেজেন্ড' লেইখা ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস মারতেছেন ৷ আরেক দল ভাইব্রাদার আছেন যারা জিগাইতেছেন, ‘কিসের তার?’ আর সাথে সাথে গুগল সার্চবারে ডেস্পারেটলি টাইপ করতেছেন...
১৯ দিন আগে
আপনি নিউজটাতে কী রিঅ্যাক্ট দিবেন? অ্যাংরি রিএকশনটা একটু ভারী হইবার কথা; ঐটা দেয়ার মত আপনার হয়তো কোনরকম মেন্টাল এনার্জি আর অবশিষ্ট নাই। স্যাড রিএকশনে ক্লিক করা মানেই সেলফ ডিফিট একনোলেজ করার মতো একটা ঘটনা হইতে পারে ৷ এরপর আর কিছু না ভাইবাই আপনি হাহা রিএকশন প্রেস করলেন।
২১ দিন আগে