সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার, বিপদ দেখছে বিজিএমইএ-বিকেএমইএ
স্ট্রিম প্রতিবেদকঢাকা

স্থানীয় স্পিনিং শিল্পকে সুরক্ষায় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এতে পোশাক কারখানাগুলোর কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যয় ও জটিলতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে এই খাতের সংগঠনগুলো।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এনবিআরের কাস্টমস (রপ্তানি ও বন্ড) শাখার এক অফিস আদেশে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আদেশটি এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। অবশ্য প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল প্রাপ্তি সহজ করতে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় বন্ডেড সুবিধার আওতায় থাকা রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকেও এইচএস কোড ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতাভুক্ত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টি প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। এক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে জমা দিতে হবে। আমদানি করা সুতার তৈরি পোশাক রপ্তানির পর সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে এই ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত হবে।
যা বলছে এনবিআর
এনবিআর জানিয়েছে, স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সুপারিশ এনবিআরে পাঠিয়েছিল। তবে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরে গত ২০ আগস্ট বর্তমান সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়। নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই।
সেই সভার কার্যবিবরণীর ৫(ক) অংশে ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানির কথা বলা হয়েছে। ৫(খ) অংশে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় সুতার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
সিদ্ধান্ত বাতিল চায় পোশাক খাত
নতুন সিদ্ধান্তে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যয় ও জটিলতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
সিদ্ধান্তটি বাতিলের দাবি জানিয়ে মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যৌথভাবে চিঠি দিয়েছে পোশাক খাতের এই দুই শীর্ষ সংগঠন। এতে দাবি করা হয়েছে, বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সেই সভায় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার কিংবা স্থানীয় উৎস থেকে ৫০ শতাংশ সুতা সংগ্রহের বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভার আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি ছিল না। সভা শেষে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল। তখন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনকে (বিটিএমএ) যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আলোচ্যসূচির বাইরে থাকা বিষয়টি পরবর্তী সময়ে সভার কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর অভিযোগ, পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের পোশাক শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের বন্ড ব্যবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তন আনা হলে অথবা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
সংগঠন দুটি আরও বলেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ করা হলেও বাংলাদেশে উল্টো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে পোশাক শিল্পে রপ্তানি আদেশ তুলনামূলক কম। এ কারণে সুতার চাহিদাও কম। আর চাহিদা কম থাকলে দামও কম থাকার কথা। অথচ স্থানীয় বাজারে সুতার দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় মিল থেকে অর্ধেক সুতা কেনার বাধ্যবাধকতা এবং বন্ড সুবিধার পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত একসঙ্গে কার্যকর হলে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ব্যয় বাড়বে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নেওয়া উচিত হয়নি। যেকোনো আমদানি প্রক্রিয়াতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সুতা আমদানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকে সিকিউরিটি ডিপোজিট রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে ৫০ শতাংশ সুতা কেনার বাধ্যবাধকতা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ, তখন মনোপলি করে সুতার দাম বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আমরা স্থানীয় স্পিনিং শিল্পের স্বার্থের বিরোধিতা করছি না। তবে একটি শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’
দেশীয় স্পিনিং শিল্পের সংকট
গত ২০ আগস্ট আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় দেশীয় স্পিনিং শিল্পের সংকটের কথা তুলে ধরে ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
সংগঠনটির যুক্তি, কম দামে আমদানি, বিশেষ করে ভারত থেকে আসা সুতা স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোকে অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিটিএমএ জানিয়েছিল, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেশের প্রায় ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অন্তত ৫০টি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই সময় ভারত থেকে সুতা আমদানি এক বছরে প্রায় ১৩৭ শতাংশ বাড়ার কথা জানিয়েছিল বিটিএমএ।
বিটিএমএর মতে, আমদানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন খাতের জন্য বাজার নিশ্চিত করা না হলে স্থানীয় স্পিনিং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা আরও কমবে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দুর্বল হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, আমদানির তুলনায় দেশে উৎপাদিত সুতার দাম বেশি। কটন সুতার মূল উপাদান কাঁচা তুলার প্রায় পুরোটাই আসে দেশের বাইরে থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া সরকার গত বছর একদিকে তুলা আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে, অন্যদিকে নগদ প্রণোদনার হার কমিয়েছে।
এসব কারণে দেশীয় সুতার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। দেশে তৈরি ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতার দাম কেজিপ্রতি প্রায় ২ ডলার ৯৫ সেন্ট থেকে ৩ ডলার ৫ সেন্ট। অন্যদিকে, আমদানি করা সুতা পাওয়া যায় কেজিপ্রতি ২ ডলার ৫০ সেন্ট থেকে ২ ডলার ৭০ সেন্টে। দামের এই পার্থক্যের ফলে পোশাক কারখানাগুলো আমদানির সুতার দিকে বেশি ঝুঁকছে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ভারত থেকে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট সুতা আমদানির ৭৮-৮২ শতাংশই আসে দেশটি থেকে।
.png)




-4fa442-256x144.webp)

-e3d250-256x144.webp)