leadT1ad

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি, রিজার্ভ হবে ৩৫ বিলিয়ন: গভর্নর

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩: ২৪
এমসিসিআই কার্যালয়ে সেমিনারে বক্তৃতা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ছবি: প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা ছাড়াই চলতি অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। এই রিজার্ভকে তিনি অর্থনীতির জন্য ‘খুবই স্বস্তিকর স্তর’ বলে উল্লেখ করেন।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ‘অর্থনীতির স্পন্দন বুঝতে পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা: পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)-এর গুরুত্ব’ শীর্ষক এই সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই আয়োজন করে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, আইএমএফের অর্থ ছাড় পাওয়া গেলে তা অতিরিক্ত সুবিধা হবে। তিনি বলেন, ‘আইএমএফের অর্থ কেকের ওপর আইসিং। এটি কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়।’ আইএমএফের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ে বিলম্ব হলেও দেশের অর্থনীতিতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি বলে তিনি জানান।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন এফসিডিওর হেড অব প্রসপারিটি অ্যান্ড ইকোনমিক গ্রোথ ইসাম মোসাদ্দেক। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ও নুরুন নাহারও সেমিনারে অংশ নেন। এ সময় এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান। তিনি জানান, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা বহাল থাকবে। বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যে শুল্ক সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবেও আগ্রহী বলে তিনি জানান।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এই অঙ্কটি আইএমএফের অপেক্ষমাণ কিস্তির তুলনায় অনেক বেশি। গভর্নর জানান, টাকার মান দুর্বল না করেই ডলার কেনা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় বাজারে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন টাকা প্রবেশ করানো হয়েছে।

গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টস উদ্বৃত্ত অবস্থায় রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বেড়েছে। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেও ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরছে। বৈদেশিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, রপ্তানি খাত এখনো একটি দুর্বল দিক হিসেবে রয়ে গেছে।

ড. মনসুর বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ কমেছে। অন্যান্য পণ্যের দামও স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে আমদানি ৬ শতাংশ বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যেও বাণিজ্য কার্যক্রমের ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহের বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন গভর্নর। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক রেমিট্যান্স ১৭ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। মাসিক হিসেবে আগের মাসের প্রায় ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে।

ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে গ্রাহক খুঁজবে
ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নর বলেন, আগে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অর্থ সরবরাহ কমে যায়। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে চলে যায়। সে সময় লাখ লাখ কোটি টাকা অর্থনীতির বাইরে চলে গিয়েছিল।

বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ২০ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে অতিরিক্ত ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার কোটির বেশি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে।

তারল্যকে অর্থনীতির জন্য অক্সিজেন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি ছিল, তা এখন শেষের পথে।’ অর্থনীতিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরছে বলে তিনি জানান।

ড. মনসুর বলেন, ব্যাংকগুলোর হাতে এখন অতিরিক্ত তারল্য জমছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সামনে ঋণ বিতরণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ব্যাংকগুলো এখন নিজ উদ্যোগে ভালো গ্রাহক খুঁজবে।

তিনি জানান, ভালো গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ইতোমধ্যে প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে এই হার ১১ থেকে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। ভালো ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি সুদহার আরও কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা আগামী দিনে আরও জোরদার হবে। ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে বলে তিনি আশা করেন।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখনো সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার ৮ শতাংশের বেশি। এই হার টেকসইভাবে ৫ শতাংশের নিচে নামানো জরুরি। এর আগে নীতিগত সুদের হার শিথিল করা হবে না।

গভর্নর সতর্ক করে বলেন, শর্টকাট পথে গেলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি ১ শতাংশের বেশি কমলে ধাপে ধাপে নীতি সুদের হার কমানো হবে। বিশেষ করে ভালো ও ঋণযোগ্য গ্রাহকদের জন্য ২ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। সুদের হার হঠাৎ কমানো হবে না। এতে বাজারে ধাক্কা লাগতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নীতি সুদের হার সমন্বয় নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য ও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়তা
ড. মনসুর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নীতিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসার পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি উদার অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে। যেখানে সম্ভাবনা থাকবে, সেখানে ব্যবসাকে সহায়তা দেওয়া হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে গভর্নর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার আরও উদার করা হবে। এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তারের সুযোগ দেওয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের করপোরেট পতাকা উড়ুক।’ এই কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। নির্বাচনের পর অর্থনীতিতে গতি আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মানি মার্কেটে ইতোমধ্যে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। বড় পরিসরের বিনিয়োগ বাড়বে বলেও তিনি আশাবাদী।

পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)
সেমিনারে বিশেষ গুরুত্ব পায় পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই। এই সূচকটি নতুন একটি অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণ টুল হিসেবে চালু করা হয়েছে। এটি মাসিক ভিত্তিতে প্রকাশ করছে এমসিসিআই। এতে যুক্তরাজ্যের সহায়তা রয়েছে।

ডিসেম্বর মাসে পিএমআই সূচক দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ২ পয়েন্টে। এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে সামান্য দুর্বলতা লক্ষ করা গেছে।

গভর্নর ড. মনসুর পিএমআইকে স্বাগত জানান। তিনি একে উচ্চমাত্রার তথ্যভিত্তিক সূচকের তালিকায় ‘নতুন সংযোজন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। দৈনিক বিনিময় হার, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও সুদের হারের মতো সূচকের সঙ্গে পিএমআই যুক্ত হওয়ায় নীতিনির্ধারণ সহজ হবে। বাস্তব সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে এখন আর ‘ক্রিস্টাল বল’ দরকার হবে না।

তিনি জানান, বেসরকারি খাত যদি পিএমআই তৈরি করে, তাতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। তবে সূচকটি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। নিয়মিত প্রকাশই এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।

সবশেষে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমান নীতিগুলো অর্থনীতিকে আরও সহনশীল ও উদার করবে। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে। এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, পিএমআই একটি কার্যকর রিয়েল-টাইম সূচক। জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এই সূচক সহায়ক হবে। এটি প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক তথ্য পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এফসিডিওর প্রতিনিধি ইসাম মোসাদ্দেক পিএমআইয়ের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত