জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

আফগানিস্তান কেন ড্রোন বানাচ্ছে

দ্য ডিপ্লোম্যাট
দ্য ডিপ্লোম্যাট

স্ট্রিম গ্রাফিক

আধুনিক যুদ্ধে আকাশপথের আধিপত্য বা ‘এয়ার সুপিরিয়রিটি’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত এবং এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ওই সময়ে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী আফগান আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল, তালেবানের আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা দুর্বল!

এমন পরিস্থিতিতে তালেবানরাও বুঝে যায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ছাড়া উপায় নেই। তাই তারা এই মুহূর্তে ‘আনম্যানড সিস্টেম’ বা চালকহীন ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নের দিকেই সবচেয়ে বেশি মনযোগ দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তালেবান সরকার সাময়িক দুর্বলতা কাটাতে ও কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ড্রোন শিল্প গড়ে তুলতে চাইছে।

আফগানিস্তানে বিমান বাহিনী গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) সম্পৃক্ততা রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত সহায়তায় আফগানিস্তান তাদের বাগরাম বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করেছিল। এরপর ১৯৭৯-১৯৮৯ সালের যুদ্ধের সময়েও আফগান সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ক্ষমতায় বসায় হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে। তখন কারসাই সরকারকে সামরিক সরঞ্জাম ও সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর বিশ বছর পর ২০২১ সালে তালেবানদের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে যায় মার্কিন সেনাবাহিনী। রেখে যায় প্রায় ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সম্পদ। সেই সম্পদগুলো দখলে নেয় তালেবান সরকার। তার মধ্যে ৭৮টি উড়োজাহাজও ছিল।

আফগানিস্তান-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব

আফগানিস্তানে সংঘাত-সংঘর্ষের একটি বড় কারণ হলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) তৎপরতা। ইসলামাবাদের অভিযোগ, তালেবানরা টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে। যদিও তালেবান সরকার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সংঘাত থেমে নেই। পাকিস্তান বারবার আফগানিস্তানের খোস্ত, পাকতিয়া এবং নানগারহার প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরেও কাবুলে টিটিপি নেতা নূর আলী মেহসুদকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। তখন আরেকবার আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

এর আগে ২০২২ সালে কাবুলে মার্কিন ড্রোন হামলায় আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরিও নিহত হয়েছিলেন।

তালেবানের কৌশল

তালেবান সরকার এখনো আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এই সরকারকে বিশ্বের অনেক দেশই এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। এসব কারণে আফগানিস্তান কোনো টেকসই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে না। এখন তাদের হাতে যেসব যুদ্ধবিমান আছে, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বলে তাদের খুচরা যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষ লোকবল পাচ্ছে না তালেবান সরকার। অন্যদিকে নতুন যুদ্ধবিমান কেনার অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নেই তাদের।

নতুন বিমান কেনার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা বিক্রেতা দেশ—কোনোটিই তালেবানের নেই। এছাড়া স্থল বাহিনী ও সাঁজোয়া ইউনিট ব্যবহার করে তারা পাকিস্তান সীমান্তকেও সংঘাতমুক্ত রাখতে পারছে না। এসব সীমাবদ্ধতাই তাদের ড্রোন শিল্পের দিকে ধাবিত করেছে।

‘মাখনের বদলে ড্রোন’

আফগানিস্তানে ড্রোন শিল্প তৈরির জন্য কিছু মৌলিক অবকাঠামো আগে থেকেই ছিল। সাবেক ন্যাটো ঘাঁটি এবং গত কয়েক দশকের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রকৌশলীদের একটি দল তাদের রয়েছে। কাবুলের উপকণ্ঠে অবস্থিত সাবেক মার্কিন ঘাঁটি ‘ক্যাম্প ফিনিক্স’-এ তারা ড্রোন তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানরা তুরস্ক, চীন, রাশিয়া এবং ইরানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে। ‘ডিনিট টেকনোলজি’ নামক একটি ফ্রন্ট কোম্পানির মাধ্যমে তারা চোরাবাজার থেকে জিপিএস মডিউল, মোটর এবং সেন্সরের মতো বেসামরিক যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে সামরিক ড্রোনে রূপান্তর করছে। তারা মার্কিন ‘এমকিউ-৯ রিপার’ এবং ইরানের ‘শাহেদ-১৩৬’ মডেলকে অনুসরণ করছে। গত বছরের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম একটি ‘স্টিলথ ড্রোন’ পরীক্ষা করেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

আফগান অর্থনীতি ভঙ্গুর হলেও সরকার সামাজিক বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বদলে সামরিক খাতে, বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তিতে বিপুল বাজেট বরাদ্দ করছে। ঐতিহাসিক ‘বন্দুক বনাম মাখন’ তত্ত্বে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর যে ধারা দেখা যায়, তালেবান সরকার যেন এখন সেই ‘মাখনের বদলে ড্রোন’ নীতি গ্রহণ করেছে।

ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ

আফগানিস্তানে ড্রোন প্রযুক্তির এই বিস্তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, এই প্রযুক্তি টিটিপি বা আইএস-কের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর হাতে পৌঁছে যাওয়া। ইতিমধ্যে (গত জানুয়ারিতে) টিটিপি তাদের নিজস্ব ‘বিমান শাখা’ খোলার ঘোষণা দিয়েছে।

তালেবানের এই ড্রোন সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টায় ইরান ও রাশিয়া ভবিষ্যতে অংশীদার হতে পারে। কারণ এই দেশগুলোও বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন। ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়ে তারা নিজেরাই ব্যতিব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে তালেবানকে বড় কোনো সহায়তা দেওয়াও তাদের পক্ষে কঠিন। সবমিলিয়ে আফগানিস্তানের এই সামরিকীকরণ বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য একটি নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন মারুফ ইসলাম

সম্পর্কিত