leadT1ad

সরকারে বসেই সামলাতে হবে অর্থনৈতিক ৫ চ্যালেঞ্জ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ১৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে লুটপাট, বিপুল বৈদেশিক ঋণ ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের আর্থিক খাত নেমেছিল তলানিতে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে সেই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় আছে অর্থনীতি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আসতে যাওয়া নতুন সরকারের ‘মাথাব্যথার’ কারণ হতে পারে ধুঁকতে থাকা এই অর্থনীতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতায় বসার পরই নতুন সরকারকে বেকারত্ব, ঋণের বোঝা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভেঙে পড়া ব্যাংক খাতসহ অন্তত পাঁচটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এই সংকট সামলানোর ওপর মোটাদাগে নির্ভর করছে দেশ ও সরকারের ভবিষ্যৎ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ এনে উচ্চ খরচে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকেও নেওয়া হয় বৃহৎ অঙ্কের ঋণ। পাশাপাশি দেশের একাধিক ব্যাংক দখল করে রীতিমতো লুটপাট চালায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। এসব অর্থের বড় অংশই আবার বিদেশে পাচার করে তারা। এতে কার্যত ভেঙে পড়ে দেশের অর্থনীতি।

এমন পরিস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন সংস্কারের কারণে লুটপাট বন্ধ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় ডলার সংকট কাটলেও আর্থিক খাতে এখনও স্বস্তি ফেরেনি। এ ছাড়া পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় বেড়েছে বেকারত্ব। বিনিয়োগ সংকটে তেমন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি। ফলে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বেসরকারি খাতকে চাঙা করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, নতুন সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে দায়িত্ব নিতে হবে। এজন্য কিছু বিষয়কে শুরু থেকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। অভিজ্ঞদের দায়িত্ব দিতে হবে। আগের মতো যেনতেনভাবে অর্থনীতি চালানোর চিন্তা করলে বিপদে পড়তে হবে।

কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ও উচ্চশিক্ষিত বেকার

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাঁকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। এক মাস ধরে কাজপ্রত্যাশী এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি এক ঘণ্টাও কাজ করার সুযোগ না পান, তাঁদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুসারে, দেশে এখন এমন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যাই ৮ লাখ ৮৫ হাজার। সেই হিসাবে প্রতি তিনজন বেকারের মধ্য একজন উচ্চশিক্ষিত।

অথচ ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ওই বছর স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার ছিলেন চার লাখের মতো। ৮ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমার মধ্যে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ২ বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন ১৭ শতাংশের বেশি তরুণ। এ ছাড়া উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ২ বছরের বেশি বেকার থাকার হার ৮ শতাংশ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই– এমন তরুণদের মধ্যে বেকারের হার ১ শতাংশের মতো।

বিপুল এই বেকার জনগোষ্ঠী হতে পারে নতুন সরকারের জন্য বড় বোঝা। কারণ, এই বেকারত্ব কমাতে কর্মসংস্থান তৈরিতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন তা অল্প সময়ে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে গত দেড় বছরে দেশে বিনিয়োগ কমেছে। সরকার চেষ্টা করলেও বিদেশি বিনিয়োগ আসছে নামকাওয়াস্তে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন সরকারকে এসেই দ্রুত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নাহলে বেকারত্বের চাপে অর্থনীতি এগোবে না।

মূল্যস্ফীতির কশাঘাত

দেশে আরেক বড় সংকট উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতিসংঘ পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। সেটিও হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।

গত তিন বছর ধরেই দেশে এমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনেরও অন্যতম কারণ ছিল, ক্রমাগত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণের হাতের নাগালে আনতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

বৈদেশিক ঋণের পাহাড় ও রিজার্ভ

২০১০ সালে বিদেশি ঋণের স্থিতি ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে থাকলেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা ১১২ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। এর মধ্যে সরকারি খাতের ঋণ ৯২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার ও বেসরকারি খাতের ১৯ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। সরকারি খাতের ঋণ দীর্ঘমেয়াদি হলেও এর একটি বড় অংশ শোধ দিতে হবে আগামী বছর। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধে নজর দিতে হবে নতুন সরকারকে।

অর্থপাচার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন দেশে মার্কিন ডলারের সংকট চলছিল। এতে গত সরকারের মেয়াদে ডলারের দাম উঠেছিল ১২৮ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে অর্থপাচার কমায় এবং প্রবাসী আয় বাড়ায় সেই সংকট অনেকটা কমেছে। এখন ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে হচ্ছে ডলার লেনদেন। ডলারের সংকট কাটায় রিজার্ভও বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে মোট রিজার্ভের পরিমাণ ৩২.৬২ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

ডলার বাজার স্বাভাবিক ও রিজার্ভ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়। এখন মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের আয় আসছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। তবে রপ্তানি বাড়িয়ে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে নতুন সরকারকে। এতে কর্মসংস্থানও বাড়বে।

স্থবির পুঁজিবাজার ও বেসরকারি খাত

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মূলধন পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম শেয়ারবাজার। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছরের মাথায় দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লুটপাটটি হয়। ওই সময় ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। এরপর গত ১৪ বছরেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশের শেয়ারবাজার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের নেতিবাচক প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধস নামিয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক কমে এখন ৪ হাজার ৯৫৮ পয়েন্টে নেমেছে। কিন্তু পুঁজিবাজার ঠিক করতে না পারলে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এতে বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও বাড়বে না। কাটবে না অর্থনৈতিক স্থবিরতা।

ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত ও রেকর্ড খেলাপি ঋণ

দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা এখন ব্যাংকিং খাত। লুটপাটের কারণে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়া দেশের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। তবে ব্যাংক পাঁচটির ৭৫ লাখ হিসাবধারীর এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা আমানত ফেরত দেওয়া হবে পরবর্তী সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এসব আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়নও করতে হবে নতুন সরকারকে।

এদিকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। যদিও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। এ ছাড়া অনেকে পালিয়ে যাওয়ার তাদের ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আবার চালু করে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। তবে নতুন কারখানা করে কর্মসংস্থান তৈরি সময়সাপেক্ষ বিষয়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত