জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

শুধু খাল খনন নয়, পরিবেশগত বাস্তবতার আলোকে চাই বহুমুখী মাস্টারপ্ল্যান

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক ইতিহাসের পাতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে গৃহীত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আজও ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়, পিতার সাফল্যের উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক এক মাসের মাথায়, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ ১৬ মার্চ (সোমবার) দিনাজপুরের কাহারোলে নিজে কোদাল হাতে নিয়ে এই বৃহৎ প্রকল্পের সূচনা করেন তিনি। একই দিনে দেশের ৫৩টি স্থানে একযোগে এই কর্মসূচির কাজ শুরু হয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী বা খাল খননের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সাহসী। তবে এই বিশাল প্রকল্প যেন নিছক কোনো ঐতিহাসিক কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি বা রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে এবং যথাসম্ভব ত্রুটি-বিচ্যুতি মুক্ত হয়ে সফলতার মুখ দেখে, সেজন্য পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে এর ইতিবাচক দিক ও শঙ্কাগুলো নিয়ে নির্মোহ আলোচনা হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও খাল খননের প্রাচীন ইতিহাস

আমাদের এই বাংলাদেশ মূলত একটি নদীবিধৌত পলল অঞ্চল বা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ। হিমালয় থেকে নেমে আসা প্রধান তিনটি বৃহৎ নদী—গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) এবং মেঘনা ও কুশিয়ারার সম্মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়ার পথে হাজার বছর ধরে পলি জমিয়ে এই ভূখণ্ড তৈরি করেছে। এই তিনটি প্রধান নদীর অসংখ্য শাখা-প্রশাখা, উপনদী ও খালবিলের সমন্বয়ে আমাদের পললভূমি ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বন্যা, নদীভাঙন—এসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই অঞ্চলে কৃষিকাজ ও মানববসতি গড়ে উঠেছে।

তবে ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় ভূমি উঁচু-নিচু হয়ে যায়, নদীর গতিপথ বদলে যায়। আমাদের ভূতাত্ত্বিক গঠন বা শিলার প্রকৃতির কারণে এবং সর্বোপরি মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার ফলে খাল-বিল শুকিয়ে যায়। নদীশাসন, বাঁধ নির্মাণ, উজানে পানি প্রত্যাহার ইত্যাদি কারণে আজ আমাদের এই উর্বর পললভূমির অনেক অংশেই পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

খাল খনন এই ভূখণ্ডে কোনো নতুন ধারণা নয়। আবহমানকাল ধরে—প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো এই ধারা চলে আসছে। মূলত দুটি প্রধান কারণে ঐতিহাসিকভাবে খাল খনন করা হতো—এক. কৃষিকাজে সেচ প্রদান এবং দুই. যোগাযোগ বা নৌ-পরিবহনের জন্য নাব্যতা রক্ষা।

জিয়াউর রহমানের আমলের সাফল্য ও বর্তমান বাস্তবতা

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের উন্নয়ন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, দারিদ্র্য বিমোচন ও ভাগ্য উন্নয়নের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে তিনি হেঁটে সারা দেশ ঘুরেছেন। একদিনে ৩১ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটেছেন শুধু মানুষের অবস্থা সরাসরি দেখার জন্য। কৃষক, জেলে, কামার, কুমারসহ সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে তিনি একটি বড় সমস্যা চিহ্নিত করেন—শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব।

অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তারও একটি সমীক্ষা থাকা দরকার। পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—এই তিন দিক থেকেই প্রকল্পের যথার্থতা প্রমাণিত হতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিওই) এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

সে সময় দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ জমি ছিল এক ফসলি। বর্ষায় পানি থাকলেও শীতে নদী-নালা শুকিয়ে যেত। এই বিপুল পরিমাণ জমিকে যদি সেচের আওতায় এনে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করা যায়, তবেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব—এই ভাবনা থেকেই তিনি খাল খনন কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করেন। ১৯৭৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে নিজে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিয়ে তিনি প্রথম এই কর্মসূচির সূচনা করেন। এরপর তা উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কৃষিতে ব্যাপক বিপ্লব সাধিত হয়।

কিন্তু আজ প্রায় ৪০-৪৫ বছর পর প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। জলবায়ু, নদীর গতিপথ, ভূ-প্রকৃতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তারেক রহমান অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই কর্মসূচির শতভাগ সুফল পেতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও কারিগরি সতর্কতা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক।

সফলতার পূর্বশর্ত: ফিজিবিলিটি স্টাডি ও নদী খনন

খাল কাটলেই যে তাতে পানি থাকবে, বিষয়টি এখন আর এত সহজ নয়। গত ৪০ বছরে আমাদের ৫৪টি অভিন্ন নদীর উজানে প্রতিবেশী দেশ ভারত অসংখ্য ছোট-বড় বাঁধ নির্মাণ করেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের বড় নদীগুলোতেই এখন পানি থাকে না। বড় নদীতে পানি না থাকলে খালের মধ্যে পানি আসবে কোত্থেকে? খালে পানি থাকার দুটি উপায়—হয় নদী থেকে আসা পানি, নয়তো বৃষ্টির পানি আটকে রাখা।

আমাদের অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণের কারণে ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন হয়েছে। অনেক স্থানে নদীর চেয়ে খাল উঁচু হয়ে গেছে। তাই কোনো খাল খননের আগে তার ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ বা উপযোগিতা যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি। খালের নিচের মাটির স্তর যদি বেলে বা বালুময় হয়, তবে পানি চুইয়ে নিচে চলে যাবে; পানি ধরে রাখতে হলে কাদামাটি প্রয়োজন। যদি মাটির গুণাগুণ অনুকূলে না থাকে, তবে তলদেশ পানি ধারণ বা বহমানতার উপযোগী করে তারপর খাল চালু করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, খাল খননের আগে নদীর খনন বা ড্রেজিং জরুরি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে আগে জীবন্ত করতে হবে। নদীতে পানি আসার ক্ষেত্রে উজানের দেশের সাথে সমঝোতা এবং স্থানীয়ভাবে পানি আটকে রাখার জন্য রাবার ড্যাম বা নদীশাসনের যথাযথ ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে। খালের সঠিক ঢাল বা ইলিভেশন নির্ধারণ না করলে এই কর্মসূচি অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

পরিবেশগত ঝুঁকি ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব

খাল খনন করতে গিয়ে যেন নতুন কোনো দুর্যোগ সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। অনেক সময় উজানের দেশ বাঁধ খুলে দিলে হঠাৎ বিপুল পানির ঢল নেমে আসে। খননকৃত খালগুলো দিয়ে সেই পানি প্রবল বেগে প্রবেশ করে স্থানীয় জনপদে নতুন করে নদীভাঙন বা বন্যার প্রকোপ বাড়াবে কিনা, তা আগেই নিরূপণ করতে হবে।

খালগুলোকে হতে হবে 'মাল্টিপারপাস' বা বহুমুখী। একদিক থেকে যেমন কৃষিকাজে সেচের পানি পাওয়া যাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ যোগাযোগ ও নৌ-পরিবহনে গতি আসবে, এবং মৎস্য চাষের মাধ্যমে বিপুল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

পাশাপাশি, এটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তারও একটি সমীক্ষা থাকা দরকার। পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—এই তিন দিক থেকেই প্রকল্পের যথার্থতা প্রমাণিত হতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিওই) এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, যত্রতত্র খাল খনন বা অপরিকল্পিত খননের ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বা অ্যাকোয়াটিক লাইফ (জলজ প্রাণী) মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। অনেক সংবেদনশীল জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল যেন ধ্বংস না হয়, সেদিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা বাঞ্ছনীয়।

বহুমুখী সুবিধা: জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু ও ভূগর্ভস্থ পানি

সব সতর্কতা মেনে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে খালগুলো পুনর্খনন করা যায়, তবে এটি দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে অভাবনীয় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারেক রহমান ২০ হাজার কিলোমিটারের যে কথা বলেছেন, তা নতুন করে খোঁড়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা যে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক বা পুরোনো খালগুলো রয়েছে, সেগুলোকেই সংস্কার ও চ্যানেলাইজেশন করলে ১০-১৫ হাজার কিলোমিটারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব।

এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সুবিধা হবে আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ। গত তিন-চার দশকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ ও পানের জন্য বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলনের ফলে আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে গেছে। খালগুলোতে যদি সারা বছর পানি ধরে রাখা যায়, তবে তা রিচার্জ এরিয়া হিসেবে কাজ করবে এবং আমাদের অ্যাকুইফার বা ভূগর্ভস্থ জলস্তরে পানির স্তর পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।

দ্বিতীয়ত, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এটি বড় ভূমিকা রাখবে। খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ, পরিযায়ী পাখি এবং স্থানীয় বন্যপ্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। খালে পানি থাকলে এই ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র আবার প্রাণ ফিরে পাবে। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর অভয়ারণ্য সৃষ্টি হবে।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এই জলাধারগুলো রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। বিস্তীর্ণ এলাকায় খালে পানি থাকলে বাতাসে আর্দ্রতা বাড়বে। শুষ্ক বা রুক্ষ এলাকায় ফসলের উৎপাদন কম হয়। বাতাসে আর্দ্রতা বাড়লে সার্বিকভাবে কৃষির প্রোডাক্টিভিটি বাড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করবে।

সর্বোপরি, খালগুলোকে হতে হবে 'মাল্টিপারপাস' বা বহুমুখী। একদিক থেকে যেমন কৃষিকাজে সেচের পানি পাওয়া যাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ যোগাযোগ ও নৌ-পরিবহনে গতি আসবে, এবং মৎস্য চাষের মাধ্যমে বিপুল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

খাল খনন কর্মসূচির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি এর বাস্তবায়নে চরম পেশাদারত্বের পরিচয় দিতে হবে। খাল খননের পূর্বশর্ত হিসেবে হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে ও সারফেস ওয়াটার ডিস্ট্রিবিউশনের ওপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ 'মাস্টার প্ল্যান' প্রণয়ন করতে হবে। যে নদীখেকোরা বা অবৈধ দখলদাররা নদী ও খালের প্রবাহ আটকে রেখেছে, তাদের উচ্ছেদ করে খালগুলোকে অবমুক্ত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আমি মনে করি এটি তার নিছক রাজনৈতিক চমক না হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সমীক্ষা, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে যদি পরিচালিত হয়, তবে এটি কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ হবে না; বরং এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, সজীব ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হবে। পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান—এই তিনের অপূর্ব সমন্বয়ে খাল খনন কর্মসূচি হয়ে উঠুক বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের এক নতুন মাইলফলক।

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক

সম্পর্কিত