জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

হরমুজে অচলাবস্থা, চাপে বাংলাদেশের শিল্পখাত

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৩: ২১
হরমুজে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত ও শিল্পখাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। স্ট্রিম গ্রাফিক

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা নেমে এসেছে। এই নৌপথে প্রতিদিন গড়ে বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবহন হয়। হরমুজে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত ও শিল্পখাত বড় ধরনের চাপে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর জ্বালানির দেশ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাঘাতের প্রভাব সরাসরি শিল্পখাতে পড়বে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে আসে পেট্রোলিয়াম পণ্য। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিরোধ হিসেবে মিত্র এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, দূতাবাস ও স্থাপনায় হামলা করছে তেহরান। আক্রান্ত দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি। বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় পুরোটা এবং এলএনজির বড় অংশ এই পথে আসে।

এলএনজি নিয়ে উদ্বেগ

হরমজু প্রণালি বন্ধের পাশাপাশি ইরানের ড্রোন হামলার পর এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি। এতে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেছে দাম। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশ কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে।

পেট্রোবাংলার তথ্যে, বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। বাংলাদেশ তার মোট এলএনজির প্রায় ৭২ শতাংশ আমদানি করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০ ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। আগামী তিন মাসে (মার্চ-জুন) ২২ কার্গো আসার কথা, যার ১৮টিই আসবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে।

অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম। আগেই দৈনিক ১৩০ কোটি ঘনফুটের বেশি ঘাটতি ছিল। এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলে দ্রুত সংকট দেখা দিতে পারে। স্পট মার্কেটে বিকল্প এলএনজি আনতে হলে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি দাম গুনতে হবে।

জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী কাতার এনার্জি। তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চালান পাঠায়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতে আমরা উদ্বিগ্ন। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে।

যদিও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেছেন, কয়েকটি নিয়ে শঙ্কা থাকলেও সাম্প্রতিক চালানের অধিকাংশ এলএনজি কার্গো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। নির্ধারিত ৯টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে সাতটি রুট অতিক্রম করেছে। বাকি দুটি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।

তেল নিয়ে আপাতত শঙ্কা নেই

এলএনজি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তেল নিয়ে আপাতত শঙ্কা নেই। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদ তাৎক্ষণিক সংকট এড়ানোর জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে ডিজেলের মজুত প্রায় ১৫ দিন, পেট্রোলের ১৫, অকটেনের ২৫, ফার্নেস অয়েলের ৯০ ও কেরোসিনের ১০০ দিনের মজুদ রয়েছে।

বিপিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, আগামী আড়াই থেকে তিন মাসের নিরাপদ মজুদ রয়েছে। জুন পর্যন্ত বৈধ চুক্তির আওতায় ভিন্ন রুটে অন্যান্য দেশ থেকেও পরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, জুন পর্যন্ত তেল নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আনা হচ্ছে। আমদানির ক্ষেত্রে এসব দেশের হরমুজ প্রণালির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সিপিডির ফেলো অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেছেন, তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কম হলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেশের জ্বালানি এবং শিল্পখাতের জন্য বড় আঘাত হতে পারে। জ্বালানির বাজার অস্থির হলে অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলার হতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। জ্বালানি কম আমদানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলে শিল্পখাতে কমে যাবে উৎপাদন।

যদিও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানিয়েছেন, বিকল্প হিসেবে তারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিয়েছেন। শিগগির উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। আর পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রগুলো চালাতে এক মাসের জন্য পর্যাপ্ত কয়লার মজুদ রয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্পে উদ্বেগ

তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। এই খাত সরাসরি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে এবং জ্বালানির দাম বাড়লে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পখাত বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি বন্ধের ফলে শিল্পখাতে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ এতে বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ব্যবসার খরচ বাড়াবে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমাবে এবং পোশাক শিল্পে অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানির দাম বাড়বে, বিদ্যুতের মূল্য বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে মুনাফা কমবে এবং প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাবে।

সম্পর্কিত