প্রতিক্রিয়া

রাশিয়ার শ্রমবাজারে এক লাখ বাংলাদেশী কর্মী: আমাদের জন্য বড় সুযোগ

লেখা:
লেখা:
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১৬: ০৮
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

রাশিয়ায় এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক দিক। বর্তমানে দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই। দেশে বিনিয়োগের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, রপ্তানি আয়ে পতন দেখা যাচ্ছে এবং আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। এ অবস্থায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে দেশের দারিদ্র্যের হার আরও অন্তত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নানা সংকটের মধ্যেও আমাদের প্রবাসী আয় ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তা, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো একযোগে কাজ করলে দেশে বেকারত্ব হ্রাসের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব।

তবে, রাশিয়ার মতো একটি দেশে বিশাল সংখ্যক কর্মী প্রেরণের এই উদ্যোগে যেমন বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। এই উদ্যোগকে সফল ও টেকসই করতে হলে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এবং কিছু কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর খবরে অনেকেই আশঙ্কা করতে পারেন, এই কর্মীদের হয়তো যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাশিয়া এই কর্মীদের নিচ্ছে তাদের মূল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে, বিশেষ করে নির্মাণ (কনস্ট্রাকশন) খাতে। বর্তমানে রাশিয়ায় প্রচুর নির্মাণকাজ চলছে এবং বাংলাদেশ তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে কর্মী সরবরাহ করতে পারে বলেই তারা আগ্রহী।

তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক সময় কর্মীরা বেশি অর্থের লোভে স্বেচ্ছায় বা না বুঝে যুদ্ধবিগ্রহ বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। আবার কোনো কোম্পানি যদি কনস্ট্রাকশন বা রেস্টুরেন্টের কাজের কথা বলে কর্মীদের যুদ্ধকবলিত এলাকায় বা বর্ডারের কাছাকাছি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্টে নিয়ে যায়, সেটিও চরম বিপদের কারণ হতে পারে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্টদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যেন আমাদের কর্মীদের কোনোভাবেই জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বা যুদ্ধে সম্পৃক্ত করা না হয়। কর্মীদের শোভন কর্মপরিবেশ এবং জীবনের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তাদের পাঠাতে হবে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট হলো আইনি জটিলতা। বৈধ লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সরকারের সকল নিয়ম, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স ও দূতাবাসের সত্যায়ন মেনেই কর্মী পাঠায়। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর কোনো কর্মী যদি নিজের ইচ্ছায় পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে অন্য দেশে পালানোর চেষ্টা করে, কিংবা বেশি টাকার লোভে অনৈতিক কাজ বা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন এর পুরো দায়ভার এসে পড়ে রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর।

সরকার ও সংশ্লিষ্টদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যেন আমাদের কর্মীদের কোনোভাবেই জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বা যুদ্ধে সম্পৃক্ত করা না হয়। কর্মীদের শোভন কর্মপরিবেশ এবং জীবনের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তাদের পাঠাতে হবে।

ঢালাওভাবে এসব এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচার বা চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়, লাইসেন্স বাতিল করা হয়। মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু এজেন্সি যে নেই, তা নয়। কিন্তু কর্মীদের ব্যক্তিগত অপরাধ বা অসচেতনতার দায় যদি বৈধভাবে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপানো হয়, তবে ভালো উদ্যোক্তারা এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি প্রবল। তাই এজেন্সির পাশাপাশি কর্মীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

এই সংকট সমাধানে কর্মী পাঠানোর আগে একটি শক্তিশালী ‘স্ক্রিনিং বোর্ড’ বা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই বোর্ড বিদেশ গমনেচ্ছুকদের ফ্লাইট উড্ডয়নের ৭ থেকে ১৫ দিন আগে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেবে।

কর্মীরা কত টাকা খরচ করে যাচ্ছে, কোন কাজে যাচ্ছে এবং তারা কোনোভাবেই যুদ্ধে বা অবৈধ কোনো কাজে জড়াবে না—এই বিষয়গুলো বোর্ডের সামনে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষদের মধ্যে ইউরোপ বা উন্নত দেশে যাওয়ার জন্য প্রতারিত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। তা সত্বেও চরম ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে মানুষের মধ্যে। লিবিয়া বা ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরার ঝুঁকি জেনেও তারা অবৈধ পথে পা বাড়ায়। এই মানসিকতা দূর করতে দেশব্যাপী ব্যাপক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। মিডিয়াকে এখানে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

শুধু রাশিয়ায় কর্মী পাঠালেই হবে না, আমাদের ট্রেডিশনাল শ্রমবাজারগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার, দুবাই ও আবুধাবির মতো বাজারগুলো বর্তমানে নানা কারণে বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে আছে। এগুলো পুনরায় চালুর জন্য জোর কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। পাশাপাশি জাপানের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে ভালো বেতনের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যার জন্য প্রয়োজন ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, শুধু বিএ-এমএ পাস করে কোনো লাভ নেই। দেশে যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলেও সেখান থেকে কর্মমুখী আউটপুট আসছে না। শুধু কিছু বেকার সার্টিফিকেটধারী তৈরি হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই গৎবাঁধা ‘অদক্ষ লেবার’ পাঠানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর বদলে কর্মমুখী শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অতি-দক্ষ কর্মী, নার্স, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রফেশনালস তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে হবে। তবেই আমরা আগামী অর্থবছরে ৪৫ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয়ের স্বপ্ন দেখতে পারব।

রাশিয়ায় ১ লাখ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগটিকে সফল করতে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’-এর কোনো বিকল্প নেই। একসময় প্রচুর বাংলাদেশি রাশিয়ায় পড়াশোনা করতে যেতেন। বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, কর্মীদের শোভন কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত বেতন ও জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগানো উচিত।

তবে সবার আগে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো বৈধ কর্মী প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান হয়রানির শিকার না হয় এবং কোনো কর্মী বিদেশে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদে না পড়ে।

  • হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ: চেয়ারম্যান, মেসার্স মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (রিক্রুটিং এজেন্সি)

সম্পর্কিত