ড. মো. আবু সালেহ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তটি কেবল বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সীমান্তই নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির এক অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রায়শই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই সম্পর্কের বহুমাত্রিক ইতিবাচক অর্জন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ করে 'পুশইন' ও 'পুশ ব্যাক' এর ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের সম্পর্কে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের জন্ম দিয়েছে।
সমসাময়িক ভূ-রাজনীতিতে এই দুটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ, অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার জাতীয় তাগিদ, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সীমান্তরেখা এখন এক অস্থির রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পুশ ইন এবং পুশ ব্যাকের এই অনিয়মিত ও একতরফা চর্চা কেবল সীমান্তে মানবাধিকারের সংকটই তৈরি করছে না, বরং তা দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গুরুতর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে 'পুশব্যাক' এবং 'পুশইন' শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও প্রায়োগিক অর্থ বহন করে। সহজ ভাষায়, 'পুশব্যাক' হলো কোনো একটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অনুপ্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসীদের কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই, জুডিশিয়াল রিভিউ (আদালতি পর্যালোচনা) বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে ফেরত পাঠানো। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির নাগরিকত্ব বা পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পূর্ণ একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমান্তরেখা থেকেই এদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, 'পুশইন' হলো আরও বেশি আক্রমণাত্মক এবং একতরফা একটি কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে (যাদের তারা অবৈধ বা অবাঞ্ছিত মনে করে) কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে 'পুশইন' বলা হয়। পুশ ইনের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় যে, যাদের পুশ ইন করা হচ্ছে, তারা আদতে কোন দেশের নাগরিক তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়, অথবা তারা সুদীর্ঘকাল ধরে ওই রাষ্ট্রের ভেতরেই বসবাস করে আসছিল।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই দুই প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'নন-রিফোলমেন্ট' নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো রাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয় চায় বা প্রবেশ করে, তবে তাকে এমন কোনো দেশে বা পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (ওএইচসিএইচআর) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা (যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ ব্যাক এবং পুশ ইনের এই চর্চা সরাসরি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (আইসিসিপিআর) এর লঙ্ঘন। এটি ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কেড়ে নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রহীনতার এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে, যা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে পড়া মানুষের মৌলিক অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাক'-এর ঘটনাপ্রবাহকে কেবল দুটি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ বা সাধারণ সীমান্ত উত্তেজনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অসমতা এবং আধিপত্যবাদের আলোকে এর ব্যবচ্ছেদ করলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে।
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর 'হেজিমনি' বা আধিপত্যবাদের আলোচনায় দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি শক্তিশালী বা শাসক শ্রেণী কেবল সরাসরি বলপ্রয়োগ নয়, বরং পরোক্ষ সম্মতি এবং কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের এজেন্ডা বা কর্তৃত্ব বজায় রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারতকে একটি 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভৌগোলিক বিশালতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের অবস্থান অনেক সুবিধাজনক ও প্রভাবশালী।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এই হেজিমনি বা আধিপত্যবাদের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে পুশ ব্যাক বা পুশ ইনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা গ্রামসীয় তত্ত্বের 'বলপ্রয়োগের রাজনীতি'র রূপ পরিগ্রহ করে। এখানে সম্মতি বা যৌথ সিদ্ধান্তের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত এজেন্ডাই প্রধান হয়ে ওঠে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিবেশীর ওপর এই একতরফা নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত আঞ্চলিক হেজিমনিরই বহিঃপ্রকাশ, যা সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতিকে সংকুচিত করে ফেলে।
সীমান্তে মানুষের ওপর এই বলপ্রয়োগের প্রক্রিয়াটিকে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর 'বায়োপলিটিক্স' বা 'বায়োপাওয়ার' এবং ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের 'স্টেট অব এক্সেপশন' তত্ত্বের আলোকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ফুকোর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং মানুষের জীবন, শরীর এবং জনসংখ্যাকেও তার ক্ষমতার বলয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্তে পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের শিকার মানুষদের রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার স্বার্থে 'অপছন্দনীয় জনসংখ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের শরীর ও জীবনকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে দেয়।
জর্জিও আগামবেন এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন তাকে 'স্টেট অব এক্সেপশন' বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা কাঁটাতারের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি এমন এক আইনি শূন্যতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেখানে পুশব্যাক বা পুশইনের শিকার মানুষগুলো কোনো দেশেরই আইনি সুরক্ষা পায় না। তারা পরিণত হয় 'বেয়ার লাইফ' বা স্রেফ অধিকারহীন জীবে, যাদের না আছে কোনো নাগরিক পরিচয়, না আছে মানুষের ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকার। এই তাত্ত্বিক অবস্থানটি প্রমাণ করে যে, পুশ ইন ও পুশ ব্যাক কেবল একটি সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতার প্রদর্শনী এবং আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির নিষ্ঠুর রাজনৈতিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সীমান্ত সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে। বর্তমানের পুশইন বা পুশব্যাকের ঘটনাপ্রবাহকে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক বিবর্তনকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে হবে।
১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারতের ঐতিহাসিক দেশভাগ এবং র্যাডক্লিফ লাইনের অবাস্তব সীমানা নির্ধারণের মধ্য দিয়েই এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল। কোনো দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক ও ভৌগোলিক সমীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে আঁকা এই সীমান্তরেখা কোটি কোটি মানুষের জীবন ও পরিবারকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার কারণে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতার পর বিশালসংখ্যক শরণার্থী বাংলাদেশে ফিরে এলেও, একটি বড় অংশের মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ সীমান্তের ওপারে থেকে যায়। এই দীর্ঘ ও অনিয়মিত জনসংখ্যা স্থানান্তরের ঐতিহাসিক রূপরেখাই পরবর্তীকালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে 'অবৈধ অনুপ্রবেশ'-এর স্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়।
সীমান্ত সমস্যা নিরসনে ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক 'ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি' একটি মাইলফলক ছিল। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল সীমান্ত নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময় এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সংসদে এই চুক্তি অনুমোদিত না হওয়া এবং ২০১৫ সালে এসে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হওয়ার মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা বিরাজ করছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ সামরিক বা নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে, যা দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক যাতায়াতকে সম্পূর্ণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে।
পুশইন ও পুশব্যাকের ঘটনা কিন্তু একেবারে নতুন নয়; এর আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত এই একতরফা নীতি প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের তৎকালীন এনডিএ সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে (বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তে) কয়েকশ বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক পুশ ব্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে এ নিয়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় এবং নো-ম্যানস ল্যান্ডে দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষরা দিনের পর দিন আটকে থাকে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বিশেষ মেরুকরণ বা নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, তখনই সীমান্তকে কঠোর করার এবং তথাকথিত 'অনুপ্রবেশকারী' তাড়ানোর একটি রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়, যার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আদর্শিক রূপান্তর, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং সীমান্ত অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার মতো গভীর কারণ বিদ্যমান।
প্রথমত, পুশব্যাক এবং পুশইনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমসাময়িক এজেন্ডা। বিশেষ করে ভারতের আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (এনআরসি) এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে প্রণীত 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন' (সিএএ) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ন্যারেটিভে দীর্ঘকাল ধরে দাবি করা হচ্ছে যে, বিশালসংখ্যক 'অবৈধ বাংলাদেশি' ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায়) বসবাস করছে।
ভোটার তালিকা এবং জনমিতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অনুপ্রবেশের অভিযোগকে একটি সংবেদনশীল নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব প্রমাণের দীর্ঘ পথ এড়িয়ে, অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলমানদের জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক তাগিদ তৈরি হয়।
দ্বিতীয় প্রধান কারণটি নিহিত রয়েছে দুই দেশের সীমান্ত প্রশাসনের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও মনস্তত্ত্বের মধ্যে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এই সীমান্তকে একটি 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ' অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধে বিএসএফ প্রায়শই আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রটোকল লঙ্ঘন করে একতরফা ও আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর অবস্থান হলো-কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যথাযথ আইনি উপায়ে ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বিএসএফ যখন রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষকে পুশ ইন করার চেষ্টা করে, বিজিবি তখন তা কঠোরভাবে প্রতিহত করে। দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি সীমান্তে স্থায়ী উত্তেজনার জন্ম দেয়।
তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে এই সংকটের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুই পাশেই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। গবাদি পশু, মাদক এবং মানব পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রগুলো এই দরিদ্র মানুষকে ব্যবহার করে অবৈধ পারাপার সচল রাখে। ভারত যখন এই জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটিকে স্রেফ একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখে এবং ঢালাওভাবে পুশ ব্যাকের নীতি প্রয়োগ করে, তখন তা সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
সীমান্তের এই পুশ ইন এবং পুশ ব্যাকের রাজনীতি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে দুই দেশই 'কৌশগত অংশীদারিত্বের সুবর্ণ অধ্যায়' হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। কিন্তু সীমান্তে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো একতরফা পদক্ষেপ এই সুসম্পর্কের ভিত্তি অর্থাৎ 'পারস্পরিক বিশ্বাস'-কে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী, যেকোনো সীমান্ত সমস্যার সমাধান হতে হয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও যৌথ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কিন্তু ভারতের এই একতরফা বলপ্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অনাস্থা তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অংশীদারিত্বের নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভারত এখনও হেজিমনিক বা একতরফা নীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সীমান্ত উত্তেজনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের একতরফা পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের নীতি যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ তৈরি হয়।
এই অঞ্চলের অপর বৃহৎ শক্তি চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় অংশীদার। সীমান্তে ভারতের এই ক্রমাগত চাপ ও অনমনীয় মনোভাব ঢাকাকে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে ভারতের এই সীমান্ত নীতি পরোক্ষভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাবকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্ষতিকর প্রভাবটি পড়ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে। সীমান্তে পুশ ইনের শিকার নারী, শিশু এবং অসহায় মানুষের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র যখন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসে, তখন তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যার বেদনাদায়ক ইতিহাস।
এই মানবিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের জনমানসে একটি স্থায়ী 'ভারত-বিরোধী' ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ জনমত বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে। ফলে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তোলে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং মানবিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এই সংকট নিরসনে যে পদক্ষেপগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তা হলো:
ভারতকে 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে হবে। বিএসএফ এবং বিজিবি-এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে কেবল আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক নয়, বরং রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্তকে একটি 'শান্তি অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
যদি কোনো দেশে আসলেই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুযায়ী তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক পুশ ইন করার পরিবর্তে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ এবং আইনি প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
উভয় রাষ্ট্রকেই জাতিসংঘের 'নন-রিফোলমেন্ট' নীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানুষকে আটকে রেখে রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন জীবে পরিণত করার নিষ্ঠুর চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষাকে স্রেফ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর একটি মানবিক রূপ দিতে হবে।
সীমান্ত হত্যা এবং পুশ ব্যাকের মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থবির করে দেয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে যৌথ পরামর্শক কমিশন (জেসিসি) এবং শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই নির্দিষ্ট এজেন্ডাটি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যা দুই দেশের মধ্যকার অনাস্থার সংকট দূর করতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পুশইন ও পুশব্যাকের ভূ-রাজনীতি কেবল একটি ভূখণ্ডগত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইনি দ্বন্দ্ব নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের এক বাস্তব প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ অঞ্চলের স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক একতরফা বলপ্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না।
ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভূগোলের বন্ধনে আবদ্ধ এই দুই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার নীতির ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো সংকটগুলোর কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত 'সুবর্ণ অধ্যায়' নিশ্চিত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তটি কেবল বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সীমান্তই নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির এক অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রায়শই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বের অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই সম্পর্কের বহুমাত্রিক ইতিবাচক অর্জন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ করে 'পুশইন' ও 'পুশ ব্যাক' এর ঘটনাপ্রবাহ দুই দেশের সম্পর্কে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের জন্ম দিয়েছে।
সমসাময়িক ভূ-রাজনীতিতে এই দুটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তথাকথিত 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' ঠেকানোর রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ, অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার জাতীয় তাগিদ, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সীমান্তরেখা এখন এক অস্থির রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পুশ ইন এবং পুশ ব্যাকের এই অনিয়মিত ও একতরফা চর্চা কেবল সীমান্তে মানবাধিকারের সংকটই তৈরি করছে না, বরং তা দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গুরুতর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন আইনের ক্ষেত্রে 'পুশব্যাক' এবং 'পুশইন' শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও প্রায়োগিক অর্থ বহন করে। সহজ ভাষায়, 'পুশব্যাক' হলো কোনো একটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অনুপ্রবেশকারী, আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসীদের কোনো ধরনের আইনি যাচাই-বাছাই, জুডিশিয়াল রিভিউ (আদালতি পর্যালোচনা) বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে ফেরত পাঠানো। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির নাগরিকত্ব বা পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পূর্ণ একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমান্তরেখা থেকেই এদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, 'পুশইন' হলো আরও বেশি আক্রমণাত্মক এবং একতরফা একটি কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে (যাদের তারা অবৈধ বা অবাঞ্ছিত মনে করে) কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে 'পুশইন' বলা হয়। পুশ ইনের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় যে, যাদের পুশ ইন করা হচ্ছে, তারা আদতে কোন দেশের নাগরিক তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়, অথবা তারা সুদীর্ঘকাল ধরে ওই রাষ্ট্রের ভেতরেই বসবাস করে আসছিল।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই দুই প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'নন-রিফোলমেন্ট' নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো রাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয় চায় বা প্রবেশ করে, তবে তাকে এমন কোনো দেশে বা পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (ওএইচসিএইচআর) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা (যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ ব্যাক এবং পুশ ইনের এই চর্চা সরাসরি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (আইসিসিপিআর) এর লঙ্ঘন। এটি ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কেড়ে নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রহীনতার এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে, যা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে পড়া মানুষের মৌলিক অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাক'-এর ঘটনাপ্রবাহকে কেবল দুটি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ বা সাধারণ সীমান্ত উত্তেজনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অসমতা এবং আধিপত্যবাদের আলোকে এর ব্যবচ্ছেদ করলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে।
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর 'হেজিমনি' বা আধিপত্যবাদের আলোচনায় দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি শক্তিশালী বা শাসক শ্রেণী কেবল সরাসরি বলপ্রয়োগ নয়, বরং পরোক্ষ সম্মতি এবং কাঠামোগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের এজেন্ডা বা কর্তৃত্ব বজায় রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারতকে একটি 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভৌগোলিক বিশালতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের অবস্থান অনেক সুবিধাজনক ও প্রভাবশালী।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এই হেজিমনি বা আধিপত্যবাদের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে পুশ ব্যাক বা পুশ ইনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা গ্রামসীয় তত্ত্বের 'বলপ্রয়োগের রাজনীতি'র রূপ পরিগ্রহ করে। এখানে সম্মতি বা যৌথ সিদ্ধান্তের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত এজেন্ডাই প্রধান হয়ে ওঠে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিবেশীর ওপর এই একতরফা নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত আঞ্চলিক হেজিমনিরই বহিঃপ্রকাশ, যা সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতিকে সংকুচিত করে ফেলে।
সীমান্তে মানুষের ওপর এই বলপ্রয়োগের প্রক্রিয়াটিকে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর 'বায়োপলিটিক্স' বা 'বায়োপাওয়ার' এবং ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের 'স্টেট অব এক্সেপশন' তত্ত্বের আলোকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ফুকোর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং মানুষের জীবন, শরীর এবং জনসংখ্যাকেও তার ক্ষমতার বলয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্তে পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের শিকার মানুষদের রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার স্বার্থে 'অপছন্দনীয় জনসংখ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের শরীর ও জীবনকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে দেয়।
জর্জিও আগামবেন এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন তাকে 'স্টেট অব এক্সেপশন' বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা কাঁটাতারের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি এমন এক আইনি শূন্যতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেখানে পুশব্যাক বা পুশইনের শিকার মানুষগুলো কোনো দেশেরই আইনি সুরক্ষা পায় না। তারা পরিণত হয় 'বেয়ার লাইফ' বা স্রেফ অধিকারহীন জীবে, যাদের না আছে কোনো নাগরিক পরিচয়, না আছে মানুষের ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকার। এই তাত্ত্বিক অবস্থানটি প্রমাণ করে যে, পুশ ইন ও পুশ ব্যাক কেবল একটি সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতার প্রদর্শনী এবং আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির নিষ্ঠুর রাজনৈতিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সীমান্ত সংকটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে। বর্তমানের পুশইন বা পুশব্যাকের ঘটনাপ্রবাহকে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক বিবর্তনকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে হবে।
১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারতের ঐতিহাসিক দেশভাগ এবং র্যাডক্লিফ লাইনের অবাস্তব সীমানা নির্ধারণের মধ্য দিয়েই এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল। কোনো দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক ও ভৌগোলিক সমীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে আঁকা এই সীমান্তরেখা কোটি কোটি মানুষের জীবন ও পরিবারকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার কারণে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতার পর বিশালসংখ্যক শরণার্থী বাংলাদেশে ফিরে এলেও, একটি বড় অংশের মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ সীমান্তের ওপারে থেকে যায়। এই দীর্ঘ ও অনিয়মিত জনসংখ্যা স্থানান্তরের ঐতিহাসিক রূপরেখাই পরবর্তীকালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে 'অবৈধ অনুপ্রবেশ'-এর স্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়।
সীমান্ত সমস্যা নিরসনে ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক 'ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি' একটি মাইলফলক ছিল। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল সীমান্ত নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময় এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তবে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সংসদে এই চুক্তি অনুমোদিত না হওয়া এবং ২০১৫ সালে এসে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হওয়ার মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা বিরাজ করছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ সামরিক বা নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে, যা দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক যাতায়াতকে সম্পূর্ণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে।
পুশইন ও পুশব্যাকের ঘটনা কিন্তু একেবারে নতুন নয়; এর আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত এই একতরফা নীতি প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের তৎকালীন এনডিএ সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে (বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তে) কয়েকশ বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক পুশ ব্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে এ নিয়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় এবং নো-ম্যানস ল্যান্ডে দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষরা দিনের পর দিন আটকে থাকে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বিশেষ মেরুকরণ বা নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, তখনই সীমান্তকে কঠোর করার এবং তথাকথিত 'অনুপ্রবেশকারী' তাড়ানোর একটি রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়, যার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আদর্শিক রূপান্তর, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং সীমান্ত অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার মতো গভীর কারণ বিদ্যমান।
প্রথমত, পুশব্যাক এবং পুশইনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমসাময়িক এজেন্ডা। বিশেষ করে ভারতের আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত 'জাতীয় নাগরিক পঞ্জি' (এনআরসি) এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে প্রণীত 'নাগরিকত্ব সংশোধন আইন' (সিএএ) এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ন্যারেটিভে দীর্ঘকাল ধরে দাবি করা হচ্ছে যে, বিশালসংখ্যক 'অবৈধ বাংলাদেশি' ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায়) বসবাস করছে।
ভোটার তালিকা এবং জনমিতিক ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অনুপ্রবেশের অভিযোগকে একটি সংবেদনশীল নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব প্রমাণের দীর্ঘ পথ এড়িয়ে, অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলমানদের জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক তাগিদ তৈরি হয়।
দ্বিতীয় প্রধান কারণটি নিহিত রয়েছে দুই দেশের সীমান্ত প্রশাসনের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও মনস্তত্ত্বের মধ্যে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এই সীমান্তকে একটি 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ' অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধে বিএসএফ প্রায়শই আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রটোকল লঙ্ঘন করে একতরফা ও আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর অবস্থান হলো-কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যথাযথ আইনি উপায়ে ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বিএসএফ যখন রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষকে পুশ ইন করার চেষ্টা করে, বিজিবি তখন তা কঠোরভাবে প্রতিহত করে। দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি সীমান্তে স্থায়ী উত্তেজনার জন্ম দেয়।
তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে এই সংকটের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুই পাশেই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। গবাদি পশু, মাদক এবং মানব পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রগুলো এই দরিদ্র মানুষকে ব্যবহার করে অবৈধ পারাপার সচল রাখে। ভারত যখন এই জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কটিকে স্রেফ একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি' হিসেবে দেখে এবং ঢালাওভাবে পুশ ব্যাকের নীতি প্রয়োগ করে, তখন তা সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
সীমান্তের এই পুশ ইন এবং পুশ ব্যাকের রাজনীতি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে দুই দেশই 'কৌশগত অংশীদারিত্বের সুবর্ণ অধ্যায়' হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। কিন্তু সীমান্তে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো একতরফা পদক্ষেপ এই সুসম্পর্কের ভিত্তি অর্থাৎ 'পারস্পরিক বিশ্বাস'-কে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। সার্বভৌম সমতার আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী, যেকোনো সীমান্ত সমস্যার সমাধান হতে হয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও যৌথ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কিন্তু ভারতের এই একতরফা বলপ্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অনাস্থা তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অংশীদারিত্বের নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভারত এখনও হেজিমনিক বা একতরফা নীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সীমান্ত উত্তেজনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের একতরফা পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের নীতি যখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ তৈরি হয়।
এই অঞ্চলের অপর বৃহৎ শক্তি চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে একটি বড় অংশীদার। সীমান্তে ভারতের এই ক্রমাগত চাপ ও অনমনীয় মনোভাব ঢাকাকে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে ভারতের এই সীমান্ত নীতি পরোক্ষভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাবকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্ষতিকর প্রভাবটি পড়ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে। সীমান্তে পুশ ইনের শিকার নারী, শিশু এবং অসহায় মানুষের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র যখন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসে, তখন তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের সীমান্ত হত্যার বেদনাদায়ক ইতিহাস।
এই মানবিক বিপর্যয়গুলো বাংলাদেশের জনমানসে একটি স্থায়ী 'ভারত-বিরোধী' ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করে। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ জনমত বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে। ফলে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তোলে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাকের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একতরফা আধিপত্যবাদী মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং মানবিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। এই সংকট নিরসনে যে পদক্ষেপগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তা হলো:
ভারতকে 'আঞ্চলিক হেজিমন' বা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে হবে। বিএসএফ এবং বিজিবি-এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে কেবল আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠক নয়, বরং রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহলের মাধ্যমে সীমান্তকে একটি 'শান্তি অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
যদি কোনো দেশে আসলেই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুযায়ী তার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক পুশ ইন করার পরিবর্তে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ এবং আইনি প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
উভয় রাষ্ট্রকেই জাতিসংঘের 'নন-রিফোলমেন্ট' নীতি এবং মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানুষকে আটকে রেখে রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন জীবে পরিণত করার নিষ্ঠুর চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষাকে স্রেফ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে এর একটি মানবিক রূপ দিতে হবে।
সীমান্ত হত্যা এবং পুশ ব্যাকের মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থবির করে দেয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে যৌথ পরামর্শক কমিশন (জেসিসি) এবং শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই নির্দিষ্ট এজেন্ডাটি নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যা দুই দেশের মধ্যকার অনাস্থার সংকট দূর করতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পুশইন ও পুশব্যাকের ভূ-রাজনীতি কেবল একটি ভূখণ্ডগত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইনি দ্বন্দ্ব নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার অসমতা এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের এক বাস্তব প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ অঞ্চলের স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক একতরফা বলপ্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না।
ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভূগোলের বন্ধনে আবদ্ধ এই দুই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌম সমতার নীতির ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো সংকটগুলোর কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত 'সুবর্ণ অধ্যায়' নিশ্চিত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের তুরস্ক সফর এবং অ্যান্টালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে (এডিএফ) অংশগ্রহণও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে শুধু সফর, চুক্তি বা বাড়তে থাকা বাণিজ্যের দিকে তাকালে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, কেন এই মুহূর্তে বাংল
৭ ঘণ্টা আগে
এপ্রিল মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতির দেয়াল ভেঙে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি সংঘাতের আগুন। লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরান ও ইয়েমেনের ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং তার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরানের মূল ভূখ
৭ ঘণ্টা আগে
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ রোববার (৭ জুন) রাতে প্রতিবেশী দেশ ভুটানে উৎপন্ন ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এমন প্রতিটি ভূকম্পনের পরই দেশজুড়ে মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়।
৯ ঘণ্টা আগে
প্রকৃতির এই মৃদু সতর্কবার্তা কি আমরা টের পাচ্ছি? রোববার (৭ জুন) রাতে প্রতিবেশী দেশ ভুটানে উৎপন্ন ৫.৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ খুব বেশি দূরে নয় (৪০০-৪২০ কিলোমিটার)।
৯ ঘণ্টা আগে