leadT1ad

খামেনির পতনের আন্দোলনের শুরু ৯৯-এ, শেষ কি ২৬-এ

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ১৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত ২৮ ডিসেম্বর জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বছরের শেষ সময়ে এসে সরকারের এই সিদ্ধান্ত যেন মানুষের ধৈর্যের বাঁধে শেষ আঘাত হানে। নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম আর রিয়ালের দরপতনে সাধারণ মানুষ আগে থেকেই দিশেহারা ছিল। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঘোষণা আসতেই ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। শুরুতে যা ছিল কেবল অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া, তা খুব দ্রুতই রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে।

তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা শাটার নামিয়ে ধর্মঘটের ডাক দেন। মাশহাদ ও ইস্পাহানের মতো বড় শহরগুলোতেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে ৮ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাত থেকে। তেহরানসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাজপথ প্রকম্পিত হয় ‘খামেনির মৃত্যু চাই’ স্লোগানে। মানুষের কণ্ঠে শোনা যায় স্বাধীনতার ডাক।

কাস্পিয়ান সাগরের বন্দর নগরী রাশত ও দক্ষিণ ফারস প্রদেশে সরকারি ভবনগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য উপড়ে ফেলে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিক্ষোভ দমাতে সরকার বৃহস্পতিবার রাত থেকে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে টেলিফোন লাইনও বিচ্ছিন্ন। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-র তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও ৪ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম স্বীকার করেছে শুধু হামাদান শহরেই ৬ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার সকালে রাস্তায় মরদেহ পড়ে থাকার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ইরান সরকারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন নতুন নয়। আজকের এই বারুদমাখা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের ইতিহাস মূলত দমন আর প্রতিরোধের দীর্ঘ আখ্যান। বিপ্লবের শুরুর দিনগুলোতে মানুষ ভেবেছিল তারা মুক্তির স্বাদ পাবে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, হতাশার মেঘ তত ঘন হয়েছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই হতাশা রূপ নিয়েছে চূড়ান্ত ক্ষোভে। এই ক্ষোভের উৎস সন্ধানে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

১৯৯৯: ছাত্রাবাসে বাতি নেভার রাত

আশির দশকটা কেটেছিল যুদ্ধের ভয়াবহতায়। ইরাক-ইরান যুদ্ধ মানুষকে এক কাতারে রেখেছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষে এসে সেই বাঁধন আলগা হতে শুরু করে। সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির আমল ছিল তখন। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাস। ‘সালাম’ নামের সংস্কারপন্থি পত্রিকা বন্ধ করে দেয় আদালত। এর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। তারা রাস্তায় নামে। কিন্তু এর জবাব আসে ভয়াবহ নির্মমভাবে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত মাসুদ কাজেমজাদেহ’র ম্যাস প্রোটেস্টস ইন ইরান: ফ্রম রেজিস্ট্যান্স টু ওভারথ্রো বইয়ের তথ্যমতে, ১৯৯৯ সালের ৮ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসে হামলা চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। জানালা দিয়ে নিচে ছুড়ে ফেলা হয় অনেককে। আগুন দেওয়া হয় ছাত্রাবাসের কক্ষে। এই ঘটনা পুরো ইরানে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাবরিজ থেকে মাশহাদ—সব শহরের ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে। সেবারই প্রথম ১৯৭৯ সালের পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে। খাতামি সরকার ছাত্রদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। কঠোর হাতে দমন করা হয় সেই আন্দোলন। সেই দিনেই ইরানের ছাত্রসমাজ বুঝে গিয়েছিল যে এই ব্যবস্থায় সংস্কার সম্ভব নয়।

২০০৯: সবুজ বিপ্লব ও হারানো নির্বাচন

দশ বছর পর ২০০৯ সালে ইরানি জনগণ আবার আশায় বুক বেঁধেছিল। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন মীর হোসেন মুসাভি। ভোটের দিন মানুষ উৎসবের মেজাজে ভোটকেন্দ্রে যায়। কিন্তু নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ ব্যবধানে আহমাদিনেজাদকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। মুসাভি দাবি করেন, ভোট চুরি হয়েছে।

লাখ লাখ মানুষ নেমে আসে তেহরানের রাজপথে। তাদের সবার হাতে ছিল সবুজ পতাকা বা রিস্টব্যান্ড। এই আন্দোলন ইতিহাসে ‘সবুজ আন্দোলন’ বা গ্রিন মুভমেন্ট নামে পরিচিতি পায়। তাদের স্লোগান ছিল একটাই—আমার ভোট কোথায়? এই মিছিলে কোনো সহিংসতা ছিল না। মানুষ নীরব মিছিল করেছে। কিন্তু সেই নীরবতাই শাসকের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আর বাসিজ মিলিশিয়ারা সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের গুলিতে রাজপথেই লুটিয়ে পড়ে নেদা আঘা সুলতান নামের এক তরুণী। মোবাইলে ধারণ করা তাঁর মৃত্যুর সেই দৃশ্য পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। খোলা চোখে নেদার পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি হয়ে ওঠে ইরানের প্রতিরোধের প্রতীক। নেতাদের গৃহবন্দি করা হয়। হাজার হাজার মানুষকে জেলে ভরা হয়। সবুজ আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের মনের ঘৃণা তখন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

২০১৭-২০১৮: পেটের ক্ষুধা ও মনের ক্ষোভ

সবুজ আন্দোলনের পর কিছুদিন সব শান্ত ছিল। সেই শান্তি ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে আবার মানুষ রাস্তায় নামে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। মাশহাদ শহরে এই আন্দোলনের শুরু। প্রথমে মনে হয়েছিল আন্দোলন বুঝি কেবল অর্থনৈতিক। ডিমের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

দ্রুতই এই বিক্ষোভ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ছোট ছোট শহর আর মফস্বলের খেটে খাওয়া মানুষ এতে যোগ দেয়। এবারের স্লোগান আর নির্বাচনের কারচুপি নিয়ে ছিল না। মানুষ সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূলনীতির বিরুদ্ধেই কথা বলতে শুরু করে। গরিব মানুষ যারা এতদিন এই শাসনের ভিত্তি ছিল তারাই এবার সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তারা বুঝতে পারে দেশের টাকা সিরিয়া বা লেবাননে খরচ করা হচ্ছে। অথচ নিজেরা না খেয়ে মরছে। নিরাপত্তা বাহিনী বরাবরের মতো কঠোর হাতে এই বিক্ষোভ দমন করে। কিন্তু তারা মানুষের পেটের ক্ষুধা আর মনের ক্ষোভ—কোনোটিই মেটাতে পারেনি।

২০১৯: রক্তস্নাত নভেম্বর ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট

মাত্র দুই বছরের মাথায় ইরান দেখে তার ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস। সরকার হুট করে তেলের দাম তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাতারাতি মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই নেওয়া এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় গাড়ি রেখে রাস্তা আটকে দেয়। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ মুহূর্তে রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে।

সরকার তখন অদ্ভুত কৌশল নেয়। তারা পুরো দেশের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। বিশ্ব থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ঠিক আজকের মতো এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে মাত্র কয়েকদিনে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। শহরের পর শহর তখন রক্তে ভেসে গেছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে মানুষের ওপর। জলাশয়ে লুকিয়ে থাকা প্রতিবাদকারীদের ওপর ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। সেই ঘটনা ইরানিদের মনে চিরস্থায়ী আতঙ্কের জন্ম দেয়। তারা বুঝতে পারে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই শাসকগোষ্ঠী যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারে।

২০২২: নারী, জীবন, স্বাধীনতা

সবাই ভেবেছিল ২০১৯-এর হত্যাযজ্ঞের পর মানুষ আর রাস্তায় নামার সাহস পাবে না। কিন্তু ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ঘটে অভাবনীয় ঘটনা। ২২ বছর বয়সী কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনি। পরিবারের সঙ্গে তেহরানে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। ঠিকঠাক হিজাব না পরার অজুহাতে ‘নৈতিকতা পুলিশ’ বা মোরাল পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়।

এবার আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি নয়। সব বয়সের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। নারীরা তাদের মাথার হিজাব ছুড়ে ফেলে। তারা চুল কেটে প্রতিবাদ জানায়। তাদের মুখে তখন একটাই স্লোগান—নারী, জীবন, স্বাধীনতা। এই আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক ছিল না, ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভয়কে জয় করে ফেলেছিল। স্কুলের ছাত্রীরা সর্বোচ্চ নেতার ছবি নামিয়ে ফেলছে। তারা প্রকাশ্যে শাসকদের ধিক্কার জানাচ্ছে। এমন দৃশ্য ১৯৭৯ সালের পর ইরান আর দেখেনি। মাসের পর মাস ধরে এই আন্দোলন চলেছিল। হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। তবুও এই আন্দোলনের স্পিরিট বা চেতনা মরে যায়নি।

আজকের এই বিক্ষোভ তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রশ্ন জাগছে, এটিই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ বিস্ফোরণ কিনা। ১৯৪৯ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ইরানের জনগণ বারবার রাস্তায় নেমেছে। প্রতিবারই তাদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু ছাইচাপা আগুনের মতো ক্ষোভ তুষের নিচে জ্বলেছে। এখন সেই আগুনই দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ইরানে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, মিডিল ইস্ট আই, তেহরান টাইমস, ইরান ইন্টারন্যাশনাল এবং মাসুদ কাজেমজাদেহ’র ম্যাস প্রোটেস্টস ইন ইরান: ফ্রম রেজিস্ট্যান্স টু ওভারথ্রো ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত