আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার

১ মের পর ট্রাম্প কি ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন

আমেরিকার ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ অনুযায়ী, বিদেশের মাটিতে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য প্রেসিডেন্টকে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে আগামী ১ মে। যেখানে কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়া অনিশ্চিত, সেখানে ট্রাম্প কি অতীতের প্রেসিডেন্টদের মতো কোনো আইনি ফাঁকফোকর খুঁজবেন? নাকি সকল নিয়মনীতি উপেক্ষা করেই এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন তিনি?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৪১
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও আর আলোচনার কোনো ডেডলাইন জানাননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি শুধু জানিয়েছেন, ইরানের ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকবে এবং পরবর্তী আলোচনার জন্য ইরানের দিক থেকে প্রস্তাবের অপেক্ষায় থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দৃশ্যত অন্য এক ডেডলাইন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে ১ মে পর্যন্ত সময় আছে। আইনি বিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, চলমান সংঘাতে সেনা মোতায়েনের ৬০ দিন পার হওয়ার পর প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই যুদ্ধ সীমিত করতে হবে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর সুনির্দিষ্ট অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে।

অনুমোদন পেতে হলে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষ অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটকে ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যৌথ প্রস্তাব পাস করতে হবে। এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। তবে, ট্রাম্পের পূর্বসূরিরা অন্যান্য কর্তৃত্বের দোহাই দিয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে এই আইনকে পাশ কাটিয়ে গেছেন।

ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট ও আইনি বাধ্যবাধকতা

বিদেশের মাটিতে সশস্ত্র সংঘাতে দেশকে জড়ানোর ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই ১৯৭৩ সালে এই ফেডারেল আইন পাস হয়েছিল। আইন অনুযায়ী, সামরিক পদক্ষেপ শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসকে পুরো বিষয় অবহিত করতে হবে। কংগ্রেস যদি অতিরিক্ত ৩০ দিনের মেয়াদ না বাড়ায় অথবা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির অনুমোদন না দেয়, তবে প্রেসিডেন্ট কেবল ৬০ দিনের জন্য সেনা মোতায়েন বহাল রাখতে পারবেন।

কলোরাডো ল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক মরিয়ম জামশিদি জানান, ৬০ দিনের সময়সীমাকে আরও ত্রিশ দিন বাড়াতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে। আবেদনে ট্রাম্পকে নিশ্চিত করতে হবে, সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত ব্যবহার অপরিহার্য এবং একে ‘অনিবার্য সামরিক প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে দেখছেন তিনি।

জামশিদি আরও জানান, কংগ্রেস সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন না দিলে, ৯০ দিন পর সেনা মোতায়েন বাতিল করতে বাধ্য থাকবেন ট্রাম্প। তবে প্রেসিডেন্টকে এই শর্ত মানতে বাধ্য করার জন্য কংগ্রেসের কাছে সুস্পষ্ট আইনি পথ নেই। অতীতের প্রেসিডেন্টরা এই শর্তকে অসাংবিধানিক দাবি করে তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

কংগ্রেসের অনুমোদনের সম্ভাবনা রাজনৈতিক মেরুকরণ

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়, কংগ্রেস ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যকার রাজনৈতিক বিভাজন সংশয়কে আরও জোরালো করছে। গত ১৫ এপ্রিল ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন ব্যবহার করে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা সিনেটে ৫২-৪৭ ভোটে পরাজিত হয়।

রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস সম্প্রতি লিখেছেন, আমেরিকানদের জীবন ও স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্টের নেওয়া পদক্ষেপকে তিনি সমর্থন করেন। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বাইরে সামরিক পদক্ষেপকে তিনি সমর্থন করবেন না। ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক কারণে তিনি এমন অবস্থান নিচ্ছেন।

মার্কিন গণমাধ্যমকে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ডন বেকন বলেছেন, আইন অনুযায়ী কংগ্রেসকে চলমান অভিযানের অনুমোদন দিতে হবে, নয়তো তা বন্ধ করতে হবে।

যেসব রিপাবলিকান এতদিন ইরানে ট্রাম্পের আগ্রাসনকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে আসছিলেন, তারাও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সম্ভাবনায় অস্বস্তি প্রকাশ করছেন।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ জুয়াড়ি মানসিকতা

মে মাসের প্রথম দিনের সময়সীমা পার হওয়ার পরও ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোডোইন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সালার মোহেন্দেসি বলেন, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য ভয়াবহ প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপ ক্রমাগত দেখাচ্ছে, মার্কিন জনগণ এই যুদ্ধের বিরোধী। তারপরও তিনি সম্ভবত কোনো না কোনো উপায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।

মোহেন্দেসি আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের পুরো রাজনৈতিক পরিচিতি জেতার ওপর নির্ভরশীল। তিনি আমেরিকান জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইরানের কাছ থেকে তিনি ভালো চুক্তি আদায় করতে পারবেন। তিনি আরও বলেছিলেন, কোনো যুদ্ধে তিনি জড়াবেন না। বর্তমানে তাঁর দল জর্জরিত অবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।

ট্রাম্প চাইলে এখনো পিছু হটতে পারেন এবং রক্তপাত থামাতে পারেন। কিন্তু তার অর্থ হবে পরাজয় মেনে নেওয়া। মোহেন্দেসি মনে করেন, ট্রাম্প স্বভাবগতভাবে জুয়াড়ি। সামনে কোনো ধরনের বিজয়ের আশায় এই যুদ্ধের উত্তেজনা তিনি আরও বাড়িয়ে তুলবেন, এমন সম্ভাবনা প্রবল

কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর আইনি ফাঁকফোকর ও অতীত নজির

বিশেষজ্ঞরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প এই যুদ্ধ যেকোনো রূপে চালিয়ে যাবেন এবং প্রয়োজন হলে মার্কিন কংগ্রেসকে তিনি কীভাবে পাশ কাটানোর চেষ্টা করবেন। চলমান অভিযানের জন্য সম্ভাব্য আইনি ভিত্তি হতে পারে ‘অথরাইজেশন ফর ইউজ অব মিলিটারি ফোর্স’ বা এইউএমএফ। এই আইন প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়।

২০০১ সালে এগারোই সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার সুযোগ দিতে প্রথম এই আইন পাস করে। সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত এবং ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের অনুমোদনের জন্য ২০০২ সালে এই আইন পুনরায় পাস করা হয়।

পরের প্রশাসনগুলো এই অনুমোদন ব্যবহার করেই নানা সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে বাগদাদে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার জন্য ২০০২ সালের এইউএমএফ ব্যবহার করেছিলেন।

২০১৫ সালের কংগ্রেসনাল রিপোর্টে দেখা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০১ সালের এইউএমএফ-এর ওপর নির্ভর করেছিলেন শুধু আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্যই নয়। আইএসআইএলের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করার জন্যও তিনি আইনের সাহায্য নিয়েছিলেন।

২০১৪ সালে সিরিয়ায় প্রথমবারের মতো মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করার পর ওবামা প্রশাসন দাবি করেছিল, আইএসআইএলের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান এই অনুমোদনের আওতাতেই পড়ে।

বাস্তবে ১৯৭৩ সালের পর থেকে এবং চলতি শতাব্দীর শুরুতে এইউএমএফ কার্যকর হওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়াই নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। নানা আইনি যৌক্তিকতা ও কর্তৃত্বের দোহাই দিয়ে তাঁরা এসব পদক্ষেপ নিয়েছেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁর আট বছরের মেয়াদে নব্বইয়ের দশকে ইরাক ও সোমালিয়া-সহ বেশ কিছু সামরিক অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে কসোভোর আলবেনীয়দের ওপর সার্বীয় জাতিগত নিধনের কারণে ক্লিনটন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করেছিলেন।

সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি টম ক্যাম্পবেল মামলা দায়ের করে যুক্তি দিয়েছিলেন, ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টের অধীনে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ক্লিনটন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন না। সেই আইনি লড়াই সফল হয়নি এবং যুগোস্লাভিয়ায় সামরিক অভিযান ঊনআশি দিন স্থায়ী হয়েছিল।

২০১১ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে লিবিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযানের সময় ওবামা প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, তাদের মিশন ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশনের অধীনে শত্রুতার আইনি সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। ফলে প্রশাসন অবস্থান নিয়েছিল, লিবিয়ায় অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য কংগ্রেসের কাছ থেকে সুস্পষ্ট অনুমোদন নেওয়ার কোনো প্রয়োজন তাদের নেই।

সব মিলিয়ে, ১ মের সময়সীমা ট্রাম্পের জন্য শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বড় মাপের রাজনৈতিক পরীক্ষাও বটে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অতীত প্রেসিডেন্টদের নজির ব্যবহার করে ট্রাম্প হয়তো আইনি ফাঁকফোকর বের করবেন। তবে এমন সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের বর্তমান নড়বড়ে অবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

সম্পর্কিত