ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ
স্ট্রিম ডেস্ক

টানা কয়েক দশক ধরে ভারত সরকার বিদেশি দাতাগোষ্ঠীদের সহায়তায় জনগণের উদ্দেশে একটি বার্তা প্রচার করেছে—‘তোমরা অতিরিক্ত সন্তান জন্ম দিচ্ছো’। ১৯৬০-এর দশকে স্কুল ভবনের দেয়ালে দেয়ালে লেখা থাকত, দুই-তিনটি সন্তানই যথেষ্ট। ১৯৭০-এর দশকে এই প্রচারণা আরও তীব্র রূপ নিয়েছিল। সে সময় সরকারি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে লাখ লাখ তরুণ-তরুণীকে বন্ধ্যাকরণ করা হয়। ওই তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই ছিল দরিদ্র পরিবারের এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জোর করে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।
তবে এ বছর গ্রীষ্মে ভারতের স্কুলের পাঠ্যবইগুলো বদলে যাচ্ছে। পুনর্মুদ্রিত বইগুলোতে খুব কম সন্তান জন্মদানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত এখন জন্মহার কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশটির মোট প্রজনন হার (টিএফআর) এখন ১ দশমিক ৯ শতাংশ, অর্থাৎ একজন নারী গড়ে ১ দশমিক ৯টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এই হার ক্রমাগত কমছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত ২ দশমিক ১ শতাংশ প্রজনন হারের প্রয়োজন হয়।
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে জন্মহার এখন ইউরোপের অনেক উন্নত দেশের মতোই কম। দক্ষিণের তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রজনন হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ফিনল্যান্ডের সমান। আবার মুম্বাইয়ের অন্তর্ভুক্ত মহারাষ্ট্রে এই হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা নরওয়ের সমপর্যায়ের।
ভারতের জনসংখ্যার কথা বললে সাধারণত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয় না। তবে জন্মহার দ্রুত কমতে থাকায় ভারতের কিছু অঞ্চলের জনসংখ্যার চিত্র এখন সেই দেশগুলোর মতো হয়ে উঠছে। ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৪৫ কোটি হলেও দেশটির জনসংখ্যা এখনও কিছু সময় বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কারণ জন্মহার কমে গেলেও তার প্রভাব মোট জনসংখ্যার ওপর পড়তে সময় লাগে। তবে ইতিমধ্যেই জন্মসংখ্যা ২০০১ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।
তামিলনাড়ু রাজ্যে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে গত বছর ১ হাজার ২০০টি স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, এসব স্কুলে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, তাদের অনেকেই এখন একক পরিবারে ভাইবোন ছাড়া বেড়ে উঠছে। ভারত ধনী হওয়ার আগেই বৃদ্ধ জনসংখ্যার দেশে পরিণত হতে পারে এমন আশঙ্কা করছে দেশটির সরকার। তাদের উদ্বেগ, দেশটি জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চীনের মতো পথ অনুসরণ করছে, যেখানে জনসংখ্যা ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে আবার কমতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতে কিছু রাজনীতিবিদ সন্তান জন্মদানে মানুষকে উৎসাহিত করতে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন প্রণোদনার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
ভারতের এই জনমিতিক পরিবর্তন আসলে একটি বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন। এখন আর শুধু ধনী দেশগুলোতেই নয়, বিশ্বের বহু মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশেও পরিবারগুলো কম সন্তান নিচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সন্তান নিচ্ছেই না। বর্তমানে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশের মোট প্রজননহার (টিএফআর) জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেছে।
ব্রাজিল, ইরান, থাইল্যান্ড ও তুরস্কের মতো মধ্যম আয়ের দেশগুলো বহু বছর ধরেই প্রতিস্থাপন হারের নিচে রয়েছে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর অনেকেই একই পথে এগোচ্ছে। শ্রীলঙ্কার টিএফআর বর্তমানে মাত্র ১ দশমিক ৩ এবং তিউনিসিয়ার ১ দশমিক ৬ শতাংশ। মরক্কোও প্রতিস্থাপন হারের নিচে নেমে গেছে। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিও সেই সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক দেশে বিয়ে প্রায় সর্বজনীন থাকা সত্ত্বেও এবং নারীদের বড় অংশের আনুষ্ঠানিক চাকরি না থাকলেও জন্মহার দ্রুত কমছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়াও জন্মহার হ্রাসের একটি কারণ। শিশু জন্মহারের নিশ্চয়তা বাড়লে অভিভাবকরাও বেশি সন্তান নেওয়ার আগ্রহবোধ করে না। তবে জনসংখ্যাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছেন, মেয়েদের শিক্ষাই এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ।
শিক্ষিত মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই গ্রহণ করে। ১৯৯০ এর দশকে ভারত ও আফ্রিকার বহু দেশে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কেবল সেইসব অঞ্চলেই প্রজনন হার তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত রয়েছে, যেখানে অধিকাংশ মেয়েই এখনও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে। যেমন, নাইজার, উত্তর নাইজেরিয়া ও চাদ।
শিক্ষা আরেকভাবেও জন্মহার কমিয়ে দেয়। বাবা-মায়েরা যত বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হন, সন্তানের পেছনে তাদের তত বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। বিশেষ করে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান খারাপ হলে এই প্রবণতা আরও দ্রুত বাড়ে। গত বছর ভারতে ৩৯ শতাংশ শিশু বেতনভুক্ত (ফি-নির্ভর) স্কুলে পড়েছে, যেখানে ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৩২ শতাংশ। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের শিক্ষিতকরণ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এখন অভিভাবকরা কম সন্তান নিয়ে তাদের শিক্ষিতকরণে বেশি ব্যয় করে এবং অন্যদের দেখে যদি একই বিনিয়োগ নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে না করে, তাহলে তারা শিক্ষার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাই বিশ্বের বহু দেশে জন্মহার দ্রুত হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ দশকে ভারতের গ্রামাঞ্চলে কেবল টেলিভিশন আসার কারণে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ধারণা করা হয়, নগরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত নারী এবং ছোট পরিবারের জীবনচিত্র তুলে ধরে টেলিভিশন ধারাবাহিক নাটকগুলো, যা মানুষের সামাজিক মানদণ্ড ও প্রত্যাশা চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল। যদিও অনেকে মজা করে বলেন, মানুষ হয়তো পরিবার পরিকল্পনার চেয়ে টিভি দেখতেই বেশি সময় ব্যয় করত।
বর্তমানে স্মার্টফোন আরও শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে মনোযোগ বিভ্রান্তিকর একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চলের মানুষও ধনী ও উন্নত জীবনযাপনের উদাহরণগুলো সহজেই দেখতে পাচ্ছে, যা তাদের জীবনধারা ও পরিবার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
কারণ যাই হোক না কেন, জন্মহার কমে যাওয়ার এই প্রবণতা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। জাতিসংঘ, যারা এ ধরনের পূর্বাভাস দেয়, তাদের প্রধান অনুমান অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যা সম্পর্কে যে হিসাব করা হয়েছিল, সেখানে এই দ্রুত জন্মহার পতনের বিষয়টি পুরোপুরি ধরা পড়েনি।
ফলে তাদের তুলনামূলক কম জনসংখ্যার পূর্বাভাসটিই বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। এই ধারণা অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন (১৬০ কোটি) পর্যন্ত পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। এরপর ধীরে ধীরে তা কমে শতাব্দীর শেষে এক বিলিয়নের (১০০ কোটি) কিছু নিচে নেমে আসতে পারে।
এশিয়ার সামগ্রিক জনসংখ্যাও ২০৪০-এর দশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আর বিশ্ব জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা সম্ভবত অনেকের ধারণার চেয়েও আগে, অর্থাৎ ২০৫০ এর দশকের মধ্যেই এসে যেতে পারে। এর একটি কারণ হলো আফ্রিকার জনসংখ্যা আগের অনুমানের মতো এত বেশি নাও হতে পারে। যেসব দেশ বা অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং সংঘাতে জর্জরিত, সেখানে জন্মহার বেশি থাকলেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকবে। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, ভবিষ্যতে নাইজেরিয়ার জনসংখ্যা ৫০ কোটি বা আফ্রিকার মোট জনসংখ্যা ৩৮০ কোটি হবে—এ ধরনের পূর্বাভাসকে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জন্মহার কমে যাচ্ছে। ফলে শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে অভিবাসী শ্রমিক আমদানির ওপর নির্ভর করা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ভারতের জন্মহার প্রতিস্থাপন হারের নিচে নেমে এসেছে এমন এক পর্যায়ে, যখন দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক নিচে। সে সময় ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মালয়েশিয়া, মেক্সিকো ও তুরস্কের একই পর্যায়ের আয়ের অর্ধেকেরও কম।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। চীন ও ভিয়েতনাম আরও কম আয়ের স্তরে এই সীমা অতিক্রম করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি নীতিনির্ধারণকে আরও জটিল করে তুলবে। বিশেষ করে ভারত এবং ভারতের মতো দেশগুলোকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই পেনশন, প্রবীণদের সেবা ও বার্ধক্যজনিত কল্যাণ খাতে সীমিত সরকারি সম্পদের বড় অংশ ব্যয় করতে হবে।
এ কারণে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, করের আওতা বাড়াতে এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে আরও বেশি মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের, ভারতের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
জন্মহার হ্রাসের পেছনের কারণগুলো মেয়েদের শিক্ষার প্রসার, শিশুমৃত্যুর হার কমে আসা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে ভারত ও অন্যান্য দেশ দ্রুত জনমিতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো অতটা সহজ হবে না।
(ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

টানা কয়েক দশক ধরে ভারত সরকার বিদেশি দাতাগোষ্ঠীদের সহায়তায় জনগণের উদ্দেশে একটি বার্তা প্রচার করেছে—‘তোমরা অতিরিক্ত সন্তান জন্ম দিচ্ছো’। ১৯৬০-এর দশকে স্কুল ভবনের দেয়ালে দেয়ালে লেখা থাকত, দুই-তিনটি সন্তানই যথেষ্ট। ১৯৭০-এর দশকে এই প্রচারণা আরও তীব্র রূপ নিয়েছিল। সে সময় সরকারি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে লাখ লাখ তরুণ-তরুণীকে বন্ধ্যাকরণ করা হয়। ওই তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই ছিল দরিদ্র পরিবারের এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জোর করে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।
তবে এ বছর গ্রীষ্মে ভারতের স্কুলের পাঠ্যবইগুলো বদলে যাচ্ছে। পুনর্মুদ্রিত বইগুলোতে খুব কম সন্তান জন্মদানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত এখন জন্মহার কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশটির মোট প্রজনন হার (টিএফআর) এখন ১ দশমিক ৯ শতাংশ, অর্থাৎ একজন নারী গড়ে ১ দশমিক ৯টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এই হার ক্রমাগত কমছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত ২ দশমিক ১ শতাংশ প্রজনন হারের প্রয়োজন হয়।
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে জন্মহার এখন ইউরোপের অনেক উন্নত দেশের মতোই কম। দক্ষিণের তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রজনন হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ফিনল্যান্ডের সমান। আবার মুম্বাইয়ের অন্তর্ভুক্ত মহারাষ্ট্রে এই হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা নরওয়ের সমপর্যায়ের।
ভারতের জনসংখ্যার কথা বললে সাধারণত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয় না। তবে জন্মহার দ্রুত কমতে থাকায় ভারতের কিছু অঞ্চলের জনসংখ্যার চিত্র এখন সেই দেশগুলোর মতো হয়ে উঠছে। ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৪৫ কোটি হলেও দেশটির জনসংখ্যা এখনও কিছু সময় বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কারণ জন্মহার কমে গেলেও তার প্রভাব মোট জনসংখ্যার ওপর পড়তে সময় লাগে। তবে ইতিমধ্যেই জন্মসংখ্যা ২০০১ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।
তামিলনাড়ু রাজ্যে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে গত বছর ১ হাজার ২০০টি স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, এসব স্কুলে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, তাদের অনেকেই এখন একক পরিবারে ভাইবোন ছাড়া বেড়ে উঠছে। ভারত ধনী হওয়ার আগেই বৃদ্ধ জনসংখ্যার দেশে পরিণত হতে পারে এমন আশঙ্কা করছে দেশটির সরকার। তাদের উদ্বেগ, দেশটি জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চীনের মতো পথ অনুসরণ করছে, যেখানে জনসংখ্যা ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে আবার কমতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতে কিছু রাজনীতিবিদ সন্তান জন্মদানে মানুষকে উৎসাহিত করতে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন প্রণোদনার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
ভারতের এই জনমিতিক পরিবর্তন আসলে একটি বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন। এখন আর শুধু ধনী দেশগুলোতেই নয়, বিশ্বের বহু মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশেও পরিবারগুলো কম সন্তান নিচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সন্তান নিচ্ছেই না। বর্তমানে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশের মোট প্রজননহার (টিএফআর) জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেছে।
ব্রাজিল, ইরান, থাইল্যান্ড ও তুরস্কের মতো মধ্যম আয়ের দেশগুলো বহু বছর ধরেই প্রতিস্থাপন হারের নিচে রয়েছে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর অনেকেই একই পথে এগোচ্ছে। শ্রীলঙ্কার টিএফআর বর্তমানে মাত্র ১ দশমিক ৩ এবং তিউনিসিয়ার ১ দশমিক ৬ শতাংশ। মরক্কোও প্রতিস্থাপন হারের নিচে নেমে গেছে। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিও সেই সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক দেশে বিয়ে প্রায় সর্বজনীন থাকা সত্ত্বেও এবং নারীদের বড় অংশের আনুষ্ঠানিক চাকরি না থাকলেও জন্মহার দ্রুত কমছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়াও জন্মহার হ্রাসের একটি কারণ। শিশু জন্মহারের নিশ্চয়তা বাড়লে অভিভাবকরাও বেশি সন্তান নেওয়ার আগ্রহবোধ করে না। তবে জনসংখ্যাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছেন, মেয়েদের শিক্ষাই এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ।
শিক্ষিত মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই গ্রহণ করে। ১৯৯০ এর দশকে ভারত ও আফ্রিকার বহু দেশে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কেবল সেইসব অঞ্চলেই প্রজনন হার তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত রয়েছে, যেখানে অধিকাংশ মেয়েই এখনও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে। যেমন, নাইজার, উত্তর নাইজেরিয়া ও চাদ।
শিক্ষা আরেকভাবেও জন্মহার কমিয়ে দেয়। বাবা-মায়েরা যত বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হন, সন্তানের পেছনে তাদের তত বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। বিশেষ করে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান খারাপ হলে এই প্রবণতা আরও দ্রুত বাড়ে। গত বছর ভারতে ৩৯ শতাংশ শিশু বেতনভুক্ত (ফি-নির্ভর) স্কুলে পড়েছে, যেখানে ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৩২ শতাংশ। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের শিক্ষিতকরণ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এখন অভিভাবকরা কম সন্তান নিয়ে তাদের শিক্ষিতকরণে বেশি ব্যয় করে এবং অন্যদের দেখে যদি একই বিনিয়োগ নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে না করে, তাহলে তারা শিক্ষার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাই বিশ্বের বহু দেশে জন্মহার দ্রুত হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ দশকে ভারতের গ্রামাঞ্চলে কেবল টেলিভিশন আসার কারণে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ধারণা করা হয়, নগরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত নারী এবং ছোট পরিবারের জীবনচিত্র তুলে ধরে টেলিভিশন ধারাবাহিক নাটকগুলো, যা মানুষের সামাজিক মানদণ্ড ও প্রত্যাশা চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল। যদিও অনেকে মজা করে বলেন, মানুষ হয়তো পরিবার পরিকল্পনার চেয়ে টিভি দেখতেই বেশি সময় ব্যয় করত।
বর্তমানে স্মার্টফোন আরও শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে মনোযোগ বিভ্রান্তিকর একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চলের মানুষও ধনী ও উন্নত জীবনযাপনের উদাহরণগুলো সহজেই দেখতে পাচ্ছে, যা তাদের জীবনধারা ও পরিবার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
কারণ যাই হোক না কেন, জন্মহার কমে যাওয়ার এই প্রবণতা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। জাতিসংঘ, যারা এ ধরনের পূর্বাভাস দেয়, তাদের প্রধান অনুমান অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যা সম্পর্কে যে হিসাব করা হয়েছিল, সেখানে এই দ্রুত জন্মহার পতনের বিষয়টি পুরোপুরি ধরা পড়েনি।
ফলে তাদের তুলনামূলক কম জনসংখ্যার পূর্বাভাসটিই বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। এই ধারণা অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন (১৬০ কোটি) পর্যন্ত পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। এরপর ধীরে ধীরে তা কমে শতাব্দীর শেষে এক বিলিয়নের (১০০ কোটি) কিছু নিচে নেমে আসতে পারে।
এশিয়ার সামগ্রিক জনসংখ্যাও ২০৪০-এর দশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আর বিশ্ব জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা সম্ভবত অনেকের ধারণার চেয়েও আগে, অর্থাৎ ২০৫০ এর দশকের মধ্যেই এসে যেতে পারে। এর একটি কারণ হলো আফ্রিকার জনসংখ্যা আগের অনুমানের মতো এত বেশি নাও হতে পারে। যেসব দেশ বা অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং সংঘাতে জর্জরিত, সেখানে জন্মহার বেশি থাকলেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকবে। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, ভবিষ্যতে নাইজেরিয়ার জনসংখ্যা ৫০ কোটি বা আফ্রিকার মোট জনসংখ্যা ৩৮০ কোটি হবে—এ ধরনের পূর্বাভাসকে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জন্মহার কমে যাচ্ছে। ফলে শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে অভিবাসী শ্রমিক আমদানির ওপর নির্ভর করা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ভারতের জন্মহার প্রতিস্থাপন হারের নিচে নেমে এসেছে এমন এক পর্যায়ে, যখন দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক নিচে। সে সময় ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মালয়েশিয়া, মেক্সিকো ও তুরস্কের একই পর্যায়ের আয়ের অর্ধেকেরও কম।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। চীন ও ভিয়েতনাম আরও কম আয়ের স্তরে এই সীমা অতিক্রম করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি নীতিনির্ধারণকে আরও জটিল করে তুলবে। বিশেষ করে ভারত এবং ভারতের মতো দেশগুলোকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই পেনশন, প্রবীণদের সেবা ও বার্ধক্যজনিত কল্যাণ খাতে সীমিত সরকারি সম্পদের বড় অংশ ব্যয় করতে হবে।
এ কারণে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, করের আওতা বাড়াতে এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে আরও বেশি মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের, ভারতের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
জন্মহার হ্রাসের পেছনের কারণগুলো মেয়েদের শিক্ষার প্রসার, শিশুমৃত্যুর হার কমে আসা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে ভারত ও অন্যান্য দেশ দ্রুত জনমিতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো অতটা সহজ হবে না।
(ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

বর্তমান সময়ের মতো তথ্যের এমন সহজলভ্যতা মানুষের ইতিহাসে আগে কখনো ছিল না। এখন কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা আমাদের সামনে চলে আসে। তাই কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। আগে কোনো খবর সম্পর্কে জানতে হলে কখন তা টিভিতে দেখাবে বা পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হতো।
২ ঘণ্টা আগে
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বলে গতকাল রোববার (১৪ জুন) খবর প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে আলোচনায় এসেছে ‘ইন্টারপোল’ শব্দটি।
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র খরা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকের মনে গভীর শঙ্কা। প্রখর রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, তাদের জীবন ও কৃষির প্রধান ভিত্তি ভূগর্ভস্থ পানি; সেটিই দ্রুত কমে যাচ্ছে।
১ দিন আগে
‘এল নিনো’ কী? এর অর্থ কী এবং এই নাম এলো কীভাবে? অয়ন বায়ুকে কেন ‘বাণিজ্য বায়ু’ বলা হয়? বাংলাদেশে কীভাবে আসে এল নিনো, কবে নাগাদ প্রভাব ফেলতে পারে?
২ দিন আগে