এক্সপ্লেইনার
মাহজাবিন নাফিসা

এক সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি শক্তি ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানা, সিএনজি, এমনকি রান্নার চুলাও অনেকটাই চলত দেশে উৎপাদিত গ্যাসে। কিন্তু এখন চিত্রটা উল্টো। রাজধানী থেকে শিল্পাঞ্চল—সবখানেই কমবেশি গ্যাসের চাপ কম, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরবরাহ থাকে না, আবার কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে শুধু গ্যাসের অভাবে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি গ্যাস শেষ হয়ে গেছে?
উত্তর হলো—না। সমস্যা শুধু মাটির নিচে গ্যাস থাকার বা না থাকার নয়, সমস্যা হলো চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে তৈরি হওয়া বড় ব্যবধান।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও সব সময় সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় সরবরাহ নেমে আসে ২৫০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ প্রতিদিনই বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, পরিবহন এবং আবাসিক খাতে।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহেও ধাক্কা লাগলে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রয়টার্সের মতে, কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যে এলএনজি আসে, যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি এলএনজি কিনতে হয়। তবু ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণেও এক দফায় সারা দেশে প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। তখন শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এদিকে পাঁচ দিনেও কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের ত্রুটি মেরামত করা যায়নি। এই কারণে দেশজুড়ে গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে। এলএনজি টার্মিনালের বয়লার ক্যাবলে আগুনের কারণে ত্রুটি দেখা দেয়। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আনার পর ত্রুটি শনাক্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ত্রুটি মেরামত হবে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন স্ট্রিমকে জানান, বৃহস্পতিবার বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আসার পরই কাজ শুরু হয়েছে। কবে নাগাদ টার্মিনাল সচল হবে, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। আরও দুই-চার দিন লেগে যেতে পারে।’

গ্যাসের এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একদিকে দেশীয় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমেছে, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। ফলে এখন শুধু ‘গ্যাস আছে কি নেই’—এটা নয়, ‘যত গ্যাস দরকার, ততটা আমরা কোথা থেকে পাব’—এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের গ্যাস সংকট বোঝার জন্য একটি বিষয় আগে পরিষ্কার করতে হবে—সমস্যার শুরু আমদানি থেকে নয়, দেশীয় উৎপাদন থেকেই। কারণ যে ঘাটতি পূরণ করতে আজ এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, সেটি তৈরি হয়েছে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইন্সপাইরা অ্যাডভাইসরি অ্যান্ড কনসালটেন্সির তথ্য মতে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের দিকে বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উৎপাদন করত। কিন্তু ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেই উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ এমএমসিএফডিতে। অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে দেশের মোট চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০–৪ হাজার এমএমসিএফডি। ফলে প্রতিদিনই এক হাজার এমএমসিএফডির বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর স্বাভাবিক ক্ষয়। গ্যাসক্ষেত্র কোনো অনন্ত ভান্ডার নয়। একটি ক্ষেত্র থেকে বছরের পর বছর গ্যাস তোলা হলে সেখানে চাপ কমে যায়, ফলে আগের মতো গ্যাস ওঠে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র—যেমন তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও রশিদপুর—দশকের পর দশক ধরে উৎপাদনে রয়েছে। এখন এসব ক্ষেত্রের অনেক কূপ থেকেই আগের তুলনায় অনেক কম গ্যাস উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বের সব গ্যাসক্ষেত্রেই ঘটে। তবে উৎপাদন ধরে রাখতে হলে সময়মতো নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার বা নতুন কূপ খনন করতে হয়।
দ্বিতীয় কারণ, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি অনেক ধীর হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৫ সালে। এরপর বিশেষ করে ষাটের দশকে তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা, রশিদপুরের মতো বড় বড় ক্ষেত্র পাওয়া যায়। কিন্তু গত এক দশকে কয়েকটি ছোট আবিষ্কার হলেও দেশের চাহিদার চিত্র বদলে দেওয়ার মতো বড় কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় কারণ, অনুসন্ধান ও উন্নয়নে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পাওয়া। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন কূপ খনন, ত্রিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ (থ্রিডি সিসমিক সার্ভে) এবং গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান—এসব কাজ সময়মতো বড় পরিসরে এগোয়নি। ফলে সম্ভাব্য অনেক এলাকায় গ্যাস আছে কি না, সেটিই এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিজার্ভ বা মজুত। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসের মোট মজুত ছিল প্রায় ২৮.৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ২০ টিসিএফেরও বেশি ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ অবশিষ্ট মজুত আগের তুলনায় অনেক কম। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশে আর গ্যাস নেই। আগের মতো সহজে ও বেশি পরিমাণে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ কমে এসেছে।
এক সময় বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে গ্যাস কেনার প্রয়োজনই পড়ত না। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন কমতে শুরু করার পর সরকার বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস। ২০১৮ সালে মহেশখালীতে প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু করে।
এরপর থেকে চিত্রটি দ্রুত বদলে যায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৫৬টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, ৪৯টি স্পট মার্কেট থেকে এবং ৪টি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কেনা হয়েছে। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়িয়ে প্রায় ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮৬টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসার কথা।

অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এলএনজি জরুরি বিকল্প থেকে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।
এর কারণ খুবই সহজ। বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন যেখানে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ এমএমসিএফডি, সেখানে চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি এমএমসিএফডি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করার মতো নতুন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র না পাওয়ায় সরকারকে বিদেশি এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। দেশীয় গ্যাস নিজের হলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং সরবরাহও নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু এলএনজি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। আবার যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে প্রয়োজনীয় গ্যাস সময়মতো পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্যাসবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘গ্যাস আউটলুক’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করেছে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪৭,৩০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩.০২ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬,৮০০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১০,৪০০ কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে আমদানিকৃত কার্গোর সংখ্যাও ৮৬ থেকে বেড়ে ১০৯টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বেশি গ্যাস কিনতে হয়েছে, আবার তার জন্য বেশি অর্থও ব্যয় করতে হয়েছে।
পেট্রোবাংলার বাজেটেও এই চাপ স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানির জন্যই প্রায় ৫৭,৯২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, যখন এলএনজি আমদানি শুরু হয়, তখন এই ব্যয় ছিল প্রায় ১৮,৮১৩ কোটি টাকা। কয়েক বছরের মধ্যেই আমদানি ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের এলএনজির বড় অংশ আসে কাতার থেকে। মার্কিন ট্রেড করপোরেশন এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে কাতারের কাছ থেকে। ফলে কাতারে কোনো সমস্যা হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে পড়ে।
২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার কারণে কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার খবর শুনলে অনেকেই ভাবেন, এটি শুধু রান্নার চুলার সমস্যা। বাস্তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ খাত। কারণ বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্যাসের সবচেয়ে বড় অংশই ব্যবহার হয় এই দুই খাতে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৪০–৪২ শতাংশ যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এরপর বড় অংশ ব্যবহার করে শিল্প, ক্যাপটিভ পাওয়ার, সার কারখানা ও অন্যান্য খাত। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমলেই প্রথমে চাপ পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চলে।
এ কারণেই সরকার অনেক সময় শিল্প খাতে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরবরাহ বাড়ায়। আবার বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে শিল্পে চাপ আরও কমে যায়। অর্থাৎ এক খাতকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য খাতকে ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা দিনের পর দিন খুব কম চাপের গ্যাস পেয়েছে। কোথাও কোথাও চাপ এতটাই কম ছিল যে বয়লারই চালু করা যায়নি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন শিল্প সংগঠন বলছে, অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলে চালিত বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, কিন্তু সব বিদ্যুৎকেন্দ্র সব সময় চালানো যায় না। কারণ অনেক কেন্দ্রই গ্যাসনির্ভর।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস’ (আইইইএফএ) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যখন গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, তখন কিছু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন কমাতে হয়। সেই ঘাটতি পূরণে তেল বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হয়, যেগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি। ফলে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ে। সম্প্রতি দেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ এতটাই কমে যায় যে বাংলাদেশ তখন জাতীয় চাহিদার মাত্র ৫৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করতে পারছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক এলাকায়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিদিনই বর্তমান গ্যাস সংকটের তীব্রতা ও জনগণের ভোগান্তি নিয়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে আবাসিক গ্রাহকেরা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস পান না। অনেক এলাকায় রান্না করতে রাত বা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, কারণ সরবরাহ কম থাকায় অনেক স্টেশন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়।
অন্যদিকে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়ে। উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, রপ্তানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও চাপ পড়ে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতির সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
গ্যাস সংকট রাতারাতি শেষ হওয়ার মতো সমস্যা নয়। কারণ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, কূপ খনন বা আমদানি অবকাঠামো তৈরি—সবই সময়সাপেক্ষ। তাই সরকার স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও করছে।
রয়টার্স ও পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অনশোর অনুসন্ধান কর্মসূচি অনুমোদন দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খনন করা হবে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮,৯০০ কোটি টাকা। সরকারের আশা, নতুন কূপ থেকে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে।
এ ছাড়াও দীর্ঘদিন স্থবির থাকা সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান আবার শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তির শর্তও সংশোধন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো আবিষ্কার এলে সেটিই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদে সরকার এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাড়াচ্ছে এবং স্পট মার্কেট থেকেও প্রয়োজনে কার্গো কিনছে। একই সঙ্গে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ এটি ব্যয়বহুল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের মতে, এই দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদার সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র টেকসই পথ হলো—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো।

এক সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি শক্তি ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানা, সিএনজি, এমনকি রান্নার চুলাও অনেকটাই চলত দেশে উৎপাদিত গ্যাসে। কিন্তু এখন চিত্রটা উল্টো। রাজধানী থেকে শিল্পাঞ্চল—সবখানেই কমবেশি গ্যাসের চাপ কম, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরবরাহ থাকে না, আবার কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে শুধু গ্যাসের অভাবে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি গ্যাস শেষ হয়ে গেছে?
উত্তর হলো—না। সমস্যা শুধু মাটির নিচে গ্যাস থাকার বা না থাকার নয়, সমস্যা হলো চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে তৈরি হওয়া বড় ব্যবধান।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও সব সময় সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় সরবরাহ নেমে আসে ২৫০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ প্রতিদিনই বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, পরিবহন এবং আবাসিক খাতে।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহেও ধাক্কা লাগলে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রয়টার্সের মতে, কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যে এলএনজি আসে, যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি এলএনজি কিনতে হয়। তবু ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণেও এক দফায় সারা দেশে প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। তখন শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এদিকে পাঁচ দিনেও কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের ত্রুটি মেরামত করা যায়নি। এই কারণে দেশজুড়ে গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে। এলএনজি টার্মিনালের বয়লার ক্যাবলে আগুনের কারণে ত্রুটি দেখা দেয়। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আনার পর ত্রুটি শনাক্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ত্রুটি মেরামত হবে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন স্ট্রিমকে জানান, বৃহস্পতিবার বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আসার পরই কাজ শুরু হয়েছে। কবে নাগাদ টার্মিনাল সচল হবে, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। আরও দুই-চার দিন লেগে যেতে পারে।’

গ্যাসের এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একদিকে দেশীয় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমেছে, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। ফলে এখন শুধু ‘গ্যাস আছে কি নেই’—এটা নয়, ‘যত গ্যাস দরকার, ততটা আমরা কোথা থেকে পাব’—এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের গ্যাস সংকট বোঝার জন্য একটি বিষয় আগে পরিষ্কার করতে হবে—সমস্যার শুরু আমদানি থেকে নয়, দেশীয় উৎপাদন থেকেই। কারণ যে ঘাটতি পূরণ করতে আজ এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, সেটি তৈরি হয়েছে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইন্সপাইরা অ্যাডভাইসরি অ্যান্ড কনসালটেন্সির তথ্য মতে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের দিকে বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উৎপাদন করত। কিন্তু ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেই উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ এমএমসিএফডিতে। অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে দেশের মোট চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০–৪ হাজার এমএমসিএফডি। ফলে প্রতিদিনই এক হাজার এমএমসিএফডির বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর স্বাভাবিক ক্ষয়। গ্যাসক্ষেত্র কোনো অনন্ত ভান্ডার নয়। একটি ক্ষেত্র থেকে বছরের পর বছর গ্যাস তোলা হলে সেখানে চাপ কমে যায়, ফলে আগের মতো গ্যাস ওঠে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র—যেমন তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও রশিদপুর—দশকের পর দশক ধরে উৎপাদনে রয়েছে। এখন এসব ক্ষেত্রের অনেক কূপ থেকেই আগের তুলনায় অনেক কম গ্যাস উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বের সব গ্যাসক্ষেত্রেই ঘটে। তবে উৎপাদন ধরে রাখতে হলে সময়মতো নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার বা নতুন কূপ খনন করতে হয়।
দ্বিতীয় কারণ, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি অনেক ধীর হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৫ সালে। এরপর বিশেষ করে ষাটের দশকে তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা, রশিদপুরের মতো বড় বড় ক্ষেত্র পাওয়া যায়। কিন্তু গত এক দশকে কয়েকটি ছোট আবিষ্কার হলেও দেশের চাহিদার চিত্র বদলে দেওয়ার মতো বড় কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় কারণ, অনুসন্ধান ও উন্নয়নে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পাওয়া। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন কূপ খনন, ত্রিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ (থ্রিডি সিসমিক সার্ভে) এবং গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান—এসব কাজ সময়মতো বড় পরিসরে এগোয়নি। ফলে সম্ভাব্য অনেক এলাকায় গ্যাস আছে কি না, সেটিই এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিজার্ভ বা মজুত। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসের মোট মজুত ছিল প্রায় ২৮.৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ২০ টিসিএফেরও বেশি ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ অবশিষ্ট মজুত আগের তুলনায় অনেক কম। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশে আর গ্যাস নেই। আগের মতো সহজে ও বেশি পরিমাণে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ কমে এসেছে।
এক সময় বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে গ্যাস কেনার প্রয়োজনই পড়ত না। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন কমতে শুরু করার পর সরকার বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস। ২০১৮ সালে মহেশখালীতে প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু করে।
এরপর থেকে চিত্রটি দ্রুত বদলে যায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৫৬টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, ৪৯টি স্পট মার্কেট থেকে এবং ৪টি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কেনা হয়েছে। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়িয়ে প্রায় ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮৬টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসার কথা।

অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এলএনজি জরুরি বিকল্প থেকে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।
এর কারণ খুবই সহজ। বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন যেখানে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ এমএমসিএফডি, সেখানে চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি এমএমসিএফডি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করার মতো নতুন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র না পাওয়ায় সরকারকে বিদেশি এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। দেশীয় গ্যাস নিজের হলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং সরবরাহও নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু এলএনজি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। আবার যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে প্রয়োজনীয় গ্যাস সময়মতো পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্যাসবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘গ্যাস আউটলুক’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করেছে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪৭,৩০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩.০২ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬,৮০০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১০,৪০০ কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে আমদানিকৃত কার্গোর সংখ্যাও ৮৬ থেকে বেড়ে ১০৯টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বেশি গ্যাস কিনতে হয়েছে, আবার তার জন্য বেশি অর্থও ব্যয় করতে হয়েছে।
পেট্রোবাংলার বাজেটেও এই চাপ স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানির জন্যই প্রায় ৫৭,৯২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, যখন এলএনজি আমদানি শুরু হয়, তখন এই ব্যয় ছিল প্রায় ১৮,৮১৩ কোটি টাকা। কয়েক বছরের মধ্যেই আমদানি ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের এলএনজির বড় অংশ আসে কাতার থেকে। মার্কিন ট্রেড করপোরেশন এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে কাতারের কাছ থেকে। ফলে কাতারে কোনো সমস্যা হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে পড়ে।
২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার কারণে কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার খবর শুনলে অনেকেই ভাবেন, এটি শুধু রান্নার চুলার সমস্যা। বাস্তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ খাত। কারণ বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্যাসের সবচেয়ে বড় অংশই ব্যবহার হয় এই দুই খাতে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৪০–৪২ শতাংশ যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এরপর বড় অংশ ব্যবহার করে শিল্প, ক্যাপটিভ পাওয়ার, সার কারখানা ও অন্যান্য খাত। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমলেই প্রথমে চাপ পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চলে।
এ কারণেই সরকার অনেক সময় শিল্প খাতে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরবরাহ বাড়ায়। আবার বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে শিল্পে চাপ আরও কমে যায়। অর্থাৎ এক খাতকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য খাতকে ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা দিনের পর দিন খুব কম চাপের গ্যাস পেয়েছে। কোথাও কোথাও চাপ এতটাই কম ছিল যে বয়লারই চালু করা যায়নি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন শিল্প সংগঠন বলছে, অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলে চালিত বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, কিন্তু সব বিদ্যুৎকেন্দ্র সব সময় চালানো যায় না। কারণ অনেক কেন্দ্রই গ্যাসনির্ভর।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস’ (আইইইএফএ) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যখন গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, তখন কিছু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন কমাতে হয়। সেই ঘাটতি পূরণে তেল বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হয়, যেগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি। ফলে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ে। সম্প্রতি দেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ এতটাই কমে যায় যে বাংলাদেশ তখন জাতীয় চাহিদার মাত্র ৫৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করতে পারছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক এলাকায়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিদিনই বর্তমান গ্যাস সংকটের তীব্রতা ও জনগণের ভোগান্তি নিয়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে আবাসিক গ্রাহকেরা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস পান না। অনেক এলাকায় রান্না করতে রাত বা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, কারণ সরবরাহ কম থাকায় অনেক স্টেশন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়।
অন্যদিকে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়ে। উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, রপ্তানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও চাপ পড়ে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতির সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
গ্যাস সংকট রাতারাতি শেষ হওয়ার মতো সমস্যা নয়। কারণ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, কূপ খনন বা আমদানি অবকাঠামো তৈরি—সবই সময়সাপেক্ষ। তাই সরকার স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও করছে।
রয়টার্স ও পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অনশোর অনুসন্ধান কর্মসূচি অনুমোদন দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খনন করা হবে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮,৯০০ কোটি টাকা। সরকারের আশা, নতুন কূপ থেকে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে।
এ ছাড়াও দীর্ঘদিন স্থবির থাকা সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান আবার শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তির শর্তও সংশোধন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো আবিষ্কার এলে সেটিই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদে সরকার এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাড়াচ্ছে এবং স্পট মার্কেট থেকেও প্রয়োজনে কার্গো কিনছে। একই সঙ্গে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ এটি ব্যয়বহুল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের মতে, এই দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদার সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র টেকসই পথ হলো—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো।
.png)

হরমুজ প্রণালিতে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা থেকে একে অন্যকে ঠেকানোর লক্ষ্যেই হামলা চালানো হচ্ছে—এমন দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এভাবেই দুই দেশ ক্রমেই আরও তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলার চক্রে জড়িয়ে পড়েছে
৫ ঘণ্টা আগে
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরকে ‘ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত’ করার উদ্যোগ নেওয়া। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে, ব্রিটিশ শাসন ও পশ্চিমা প্রভাবের ফলে ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তায় যে উত্তরাধিক
৬ ঘণ্টা আগে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসানীতির ওপর নজর রেখে প্রতিবছর বিশ্ব পাসপোর্ট সূচক প্রকাশ করে লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনারস। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সংস্থাটি শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকা প্রকাশ করেছে।
৭ ঘণ্টা আগে
টানা তিন বছর তিন মাস বঙ্গভবনে কাটানোর পর অবশেষে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে তাঁর মেয়াদের অবসান ঘটে।
২৪ জুলাই ২০২৬