এক্সপ্লেইনার

শ্রাবণের মেঘগুলো… শিক্ষিকার রিল নিয়ে কেন এত আলোচনা, কী আছে চাকরিবিধিতে

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে, দূর অজানায় চায় হারাতে...!’ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই গানের সুরে তৈরি একটি ছোট্ট ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের টাইমলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ছিল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের। গত ২৩ জুলাই বিউটি রানী তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করেন। এরপর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভিডিও। শুরু হয় সমালোচনা, ট্রল ও বিতর্ক।

এখানেই শেষ নয়। বিউটি রানী পাল চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন কি না, তা জানতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশের বিপুল সংখ্যক নারী শিক্ষক পাশে দাঁড়িয়েছেন বিউটি রানী পালের। তাঁরা প্রতিবাদস্বরূপ সেই গানের সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব ছবি ও ভিডিও ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশ করছেন।

শিক্ষক মানেই কি সব সময় গুরুগম্ভীর

আমাদের সমাজে শিক্ষককে শুধু একজন পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং নৈতিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে একজন শিক্ষক যখন অন্য সবার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করেন, তখন অনেকেই সেটিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিবর্তে পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে শুরু করেন। এ কারণেই একই ধরনের ভিডিও কোনো সাধারণ ব্যবহারকারী পোস্ট করলে সেটি হয়তো খুব একটা আলোচনায় আসে না, কিন্তু একজন প্রধান শিক্ষক পোস্ট করায় তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।

এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও ২০২৪ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) এক শিক্ষিকাকে টিকটকে ভিডিও প্রকাশ করার কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০২৫ সালে পাশের দেশ ভারতের উত্তরপ্রদেশের হাপুর জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনজন নারী শিক্ষক ক্লাসরুমের ভেতরে বসে একটি বলিউড গানের সঙ্গে রিল বা ভিডিও তৈরি করে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন। এই ‘অপরাধে’ তাঁদের একসঙ্গে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এটি শুধু বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমন উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের এক শিক্ষিকাও ২০২৪ সালে টিকটক ভিডিওর কারণে বরখাস্ত হন।

ট্রল ট্রেন্ড: মনোবিজ্ঞান কী বলে

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জন সুলার প্রথম ২০০৪ সালে অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট সাইবার সাইকোলজি অ্যান্ড বিহেভিয়ার শীর্ষক গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন মানুষ খোলামেলা, আক্রমণাত্মক বা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে, যা সামনাসামনি সাধারণত করে না, তা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নিজের পরিচয় ও সামাজিক জবাবদিহির চাপ কম অনুভব করে। ফলে বাস্তবে যা করতে মানুষ সংকোচ বোধ করে, অনলাইনে তা সহজেই করতে পারেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট’ বলা হয়।

আবার কোনো একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ আর সেটিকে কোনো ব্যক্তির ভিডিও না ভেবে সেটিকে একটি ‘ট্রেন্ড’ মনে করে। ফলে অনেকেই না ভেবেই অন্যদের অনুসরণ করে ট্রলে অংশ নেন। মনোবিজ্ঞানে এটিকে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়।

প্রধান শিক্ষিকা দাবি করেছেন, ভিডিওটি স্কুল চলাকালীন নয়, ছুটির সময় ধারণ করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, একটি ফেসবুক পেজ নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে ভিডিওটি ভাইরাল করেছে।

আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় মানুষ নিজের নৈতিক অবস্থান প্রকাশ করতে গিয়ে অন্যের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। একে বলা হয় ‘মোরাল পুলিশিং’। যেহেতু শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা ও মূল্যবোধ জড়িত, তাই অনেকেই মনে করেন শিক্ষককে সব সময় নির্দিষ্ট ছাঁচে আচরণ করতে হবে। আর এই ভাবনার কারণে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত যেকোনো কাজকর্ম এই ছাঁচের বাইরে গেলে তা সহজেই সমালোচনার মধ্যে পড়ে যায়।

এদিকে শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, বিউটি রানী পালের ভিডিওটি সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রধান শিক্ষিকা দাবি করেছেন, ভিডিওটি স্কুল চলাকালীন নয়, ছুটির সময় ধারণ করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, একটি ফেসবুক পেজ নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে ভিডিওটি ভাইরাল করেছে।

কী বলা আছে সরকারি চাকরিবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশনায়

সরকারি কর্মচারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের সরকারি কর্মচারী বিধিমালা, ১৯৭৯-তে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও চাকরির মর্যাদা বজায় রাখার বিষয়ে নানা বিধান রয়েছে। তবে সেখানে এমন কোনো বিধান নেই যেখানে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা গান, নাচ বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারবে না।

তবে ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা’ ২০১৯-এ বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা যেন এমন কোনো কনটেন্ট প্রকাশ না করেন, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, সরকারি কর্মচারীর নিরপেক্ষতা ও পেশাগত মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করে, রাষ্ট্র, সরকার বা সংবেদনশীল বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং যা শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির পরিপন্থী হয়।

নির্দেশিকায় কোথাও গান ব্যবহার করে ব্যক্তিগত রিল বা ভিডিও তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এমন স্পষ্ট বিধান নেই। তবে সরকারি কর্মচারী হিসেবে এমন আচরণ এড়াতে বলা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে বা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে

যদি তদন্তে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি বা সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য শৃঙ্খলামূলক বিধান অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিরস্কার, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাধা, বেতন থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়, নিম্নপদে বা নিম্ন বেতন স্কেলে অবনমন, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ ও বরখাস্ত। তবে কোন ঘটনায় এসবের কোনটি প্রযোজ্য হবে, তা অভিযোগের ধরন, তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘একজন শিক্ষক সংস্কৃতিমনা হবেন, নাচ-গান করবেন, এটাই হওয়া উচিত। আনন্দের সঙ্গে বাচ্চাদের শেখানো, গান-নাচের মাধ্যমে শেখানো যেটাকে আমরা জয়ফুল লার্নিং (আনন্দপূর্ণ শিখন) বলি।’

শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের ভিডিও নিয়ে সমালোচনাকারীদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা এ বিষয়টির প্রতিবাদ করছেন, তারা একপেশে। শিক্ষকের সংস্কৃতিমনা হওয়াটা তার একটি গুণ। এখন বিভিন্ন মতাবলম্বীর মানুষ থাকেন, বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে নেবেন। কিন্তু শিশুশিক্ষা আনন্দদায়ক হবে, আর আনন্দদায়ক করতে গেলেই বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা, গান-বাজনা ইত্যাদিতে শিক্ষককে অংশগ্রহণ করতে হবে এটাই স্বাভাবিক।’

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খাইরুন নাহার লিপি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিশুদের আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা দেওয়ার জন্য গান, নাচ, গল্প বলা বা বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। তাঁর মতে, কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অশালীন না হলে বা দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত না ঘটালে সেটাকে নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়।’

বিউটি রাণী পালের ভিডিওটি শাস্তিযোগ্য আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি সৃজনশীল শিক্ষাচর্চার অংশ হিসেবে দেখা হবে সেটি নির্ধারিত হবে তদন্তের ফলাফলের পর। তবে বিতর্কটি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও সরকারি কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, সৃজনশীলতার সীমা কতটুকু সেই বিষয়টিকে সামনে এনেছে।

তথ্যসূত্র: বোস্টন হেরল্ড, সরকারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশিকা ২০১৯, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ ও সেইজ জার্নাল

Ad 300x250

সম্পর্কিত