জঙ্গিবাদী প্রচারমূলক বই কীভাবে সরকারি ব্যবস্থার বইমেলায় ঢুকল?

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

একজন পাঠক বই কিনতে গেলেন। হয়তো তিনি কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস পড়বেন, হয়তো ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করবেন। মোট কথা নিজের চিন্তার জগৎকে আরও বড় করবেন। কিন্তু সেখানে বইয়ের তাকেই যদি এমন ব্যক্তিদের বই সাজানো থাকে যারা সশস্ত্র সহিংসতা, নিরীহ মানুষ হত্যা এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার পক্ষে প্রচার চালিয়েছে? বিষয়টি তখন আর শুধু বই কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের তদারকি নিয়ে? প্রশ্ন ওঠে প্রকাশকের দায়িত্ব কোথায়? একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত বইমেলায় এসব বই পৌঁছাল কীভাবে?

সম্প্রতি বাংলা স্ট্রিমের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনই গুরুতর বিষয় সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব প্রাঙ্গণে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে চলমান বইমেলার অন্তত ১০টি স্টলে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তাদের মতাদর্শ প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বই পাওয়া গেছে। একই ধরনের বই বাংলাবাজারের বিভিন্ন প্রকাশনী এবং অনলাইন বই বিক্রির প্ল্যাটফর্মেও পাওয়া যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

একটি বই কোনো ছোট ব্যক্তিগত দোকানে বিক্রি হওয়া এক ধরনের বিষয়। কিন্তু সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত বইমেলায় একই ধরনের বই প্রকাশ্যে প্রদর্শিত ও বিক্রি হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে অংশ নেওয়ার আগে প্রকাশক, বই এবং প্রকাশিত কনটেন্ট সম্পর্কে অন্তত মৌলিক যাচাই থাকার কথা। সেই যাচাই না থাকলে ব্যবস্থাটির কোথাও একটি বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে ধরে নিতে হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বাংলা স্ট্রিমকে বলেছেন, আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বই মেলায় বিক্রি হওয়ার বিষয়টি তাদের আগে জানা ছিল না। তিনি বলেছেন, তারা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রকাশকদের সুযোগ দেন এবং আলেম-উলামারা কোনো বইকে আল-কায়েদার বই হিসেবে চিহ্নিত করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে একটি বই আল-কায়েদার প্রচারমূলক বই কি না, সেটি শনাক্ত করার দায়িত্ব কি শুধু মেলায় ঘুরতে আসা কোনো আলেমের? একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কি নিজস্ব যাচাই ব্যবস্থা থাকবে না? একটি বইয়ের লেখক কে, তিনি কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আছে কি না, এসব কি আগে থেকে যাচাই করা সম্ভব নয়?

আল-কায়েদা কোনো অচেনা সংগঠন নয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থায় সংগঠনটি তালিকাভুক্ত। ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল-জাওয়াহিরির মতো ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাদের সঙ্গে সংগঠনটির সম্পর্কও বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থায় আল-কায়েদা ও আইএসআইএল-সংশ্লিষ্ট তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও সত্তার বিরুদ্ধে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সত্তার অর্থায়ন, সম্পদ ও অন্যান্য সহায়তা ঠেকাতে বাংলাদেশেরও আন্তর্জাতিক দায় রয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনুসন্ধানে শুধু বইমেলার কয়েকটি স্টলের কথা উঠে আসেনি। এসব বই বিভিন্ন অনলাইন বইয়ের দোকান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকাশনা, বিপণন এবং পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এখানে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই জায়গায় প্রকাশকদের দায়ও প্রশ্নের বাইরে রাখা যায় না।

প্রশ্ন হচ্ছে যে একটি বই আল-কায়েদার প্রচারমূলক বই কি না, সেটি শনাক্ত করার দায়িত্ব কি শুধু মেলায় ঘুরতে আসা কোনো আলেমের? একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কি নিজস্ব যাচাই ব্যবস্থা থাকবে না? একটি বইয়ের লেখক কে, তিনি কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আছে কি না, এসব কি আগে থেকে যাচাই করা সম্ভব নয়?

বই প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও একটি গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু স্বাধীনতা মানে আইন ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি দায়হীনতা নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একই অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে বলে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা কিংবা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনার প্রশ্নে আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এও নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে যেকোনো মাধ্যমে প্রচারণাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল-কায়েদা ও আইএস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সন্ত্রাসী সংগঠন। তাই তাদের মতাদর্শ প্রচারকারী বই প্রকাশ বা বিক্রি নিছক প্রকাশনা-স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। এটি বিদ্যমান আইনের সুস্পষ্ট প্রয়োগযোগ্য ক্ষেত্র।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলার আয়োজক কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন প্রকাশকের প্রতিষ্ঠানেই এমন বই থাকার কথা প্রতিবেদনে এসেছে। কয়েকজন প্রকাশকের অতীত কার্যক্রম ও উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে এখন নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার সুযোগে হাজার হাজার বন্দী পালিয়ে যান। এদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিও ছিলেন। তাদের একটি বড় অংশ এখনো ধরা পড়েনি। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশ্বব্যাপী পরিচিত উগ্রবাদী সংগঠনের পতাকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ পতাকা হাতে মিছিল-সমাবেশের ঘটনাও নজরে এসেছে। তা নিয়ে প্রশাসন তদন্তও শুরু করেছে। এসব ঘটনার প্রতিটির পেছনে সংগঠিত জঙ্গি তৎপরতা আছে কি না, তা এককভাবে বলার সুযোগ নেই। কিন্তু ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকা একটি দেশের জন্য এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জঙ্গিবাদ দেশে নেই বলে বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। ঝুঁকিটিকে স্বীকার করে তা মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়াই এখন জরুরি কাজ।

এখন দরকার দায়িত্বশীল ব্যবস্থা। প্রথমত, ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে প্রকাশ্যে জানাতে হবে যে মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি প্রকাশকের বই কীভাবে যাচাই করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যেসব বইয়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে সেগুলো দ্রুত যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, বইমেলা ও বই বিক্রির প্ল্যাটফর্মের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা দরকার। চতুর্থত, দরকার পলাতক জঙ্গিদের ধরতে এবং উগ্রবাদী প্রতীক-প্রচারণার উৎস চিহ্নিত করতে সমন্বিত অভিযান জোরদার করা।

রাষ্ট্রকে নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর ঠেলে দিলে চলবে না। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি বলেন, ‘আমরা জানতাম না’, তাহলে সেটি কোনো সমাধান নয়। রাষ্ট্র যদি উগ্রবাদ দমনে নজরদারির কথা বলে, তাহলে সরকারি বইমেলায় এমন বই ঢুকে পড়ার বিষয়টি কীভাবে নজর এড়িয়ে গেল? এই প্রশ্নের জবাব জনগণ পাওয়ার অধিকার রাখে।

বইয়ের তাককে আমরা জ্ঞানের জায়গা হিসেবে দেখতে চাই। সেখানে বিতর্ক থাকবে, ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু নিরীহ মানুষের হত্যাকে বৈধতা দেওয়া বা সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার প্রচারকে স্বাভাবিক বইয়ের বাজারের অংশ করে ফেলা কোনো সমাজের জন্য স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।

আজ যদি একটি সরকারি বইমেলায় এমন বই অনায়াসে বিক্রি হয়, কাল সেটি আরও কত বড় পরিসরে যেতে পারে সেই অনুসন্ধান এখনই করতে হবে। উগ্রবাদী প্রচার চোখে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এটা নিশ্চিত করা তা যেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফাঁক গলে এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতেই না পারে।

  • মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত