leadT1ad

জুলাই অভ্যুত্থানের ‘সুরক্ষা কবচ’: কার দায়মুক্তি, কার বিচার

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯: ৩৯
দায়মুক্তি অধ্যাদেশ। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ‘দায়মুক্তি’ বা ‘ইনডেমনিটি’ শব্দটি বেশ পুরোনো হলেও এর প্রয়োগ প্রতিবারই নতুন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কখনো রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, কখনো আবার বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে রক্ষা—এসব উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় দায়মুক্তির আইন হয়েছে। সেই ধারায় এবার যুক্ত হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলোতে যাঁরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের ফৌজদারি মামলা থেকে সুরক্ষা দিতেই উপদেষ্টা পরিষদ এই অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়ে আইনে পরিণত হবে।

গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন পায়। বৈঠক শেষে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই অধ্যাদেশ জুলাই বিপ্লবীদের জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের প্রতি এক ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। কিন্তু ঠিক কোন কোন দায় থেকে এই মুক্তি মিলবে, আর কোথায় মিলবে না—সেই প্রশ্নই এখন মুখ্য।

দায়মুক্তি অধ্যাদেশ আসলে কী

সহজ কথায় ‘দায়মুক্তি’ হলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো অপরাধ বা ঘটনার জন্য কাউকে বিচারের আওতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া।

‘ইনডেমনিটি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ক্ষতিপূরণ বা নিরাপত্তা। এই অধ্যাদেশ এমন আইনি কবচ, যা নির্দিষ্ট সময়কালে ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংঘটিত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভবিষ্যৎ আইনি ঝামেলা থেকে রক্ষা করে। জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশ তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিরোধের কাজগুলোকে ‘আইনসম্মত’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে ও এর জন্য কোনো প্রকার মামলা বা হয়রানি নিষিদ্ধ করবে।

মুক্তির পরিসীমা ও ব্যতিক্রম: কী থাকছে নতুন আইনে

অনুমোদিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত স্বৈরাচারী সরকারের পতনের লক্ষ্যে পরিচালিত সব কর্মকাণ্ড ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ হিসেবে গণ্য হবে। এই প্রতিরোধের কারণে কাউকে কোনো ফৌজদারি মামলায় জড়ানো যাবে না। এমনকি, এই সময়কালে অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত পুরোনো সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে। সরকার প্রত্যয়ন করলেই সংশ্লিষ্ট আদালত অভিযুক্তদের খালাস দিতে বাধ্য থাকবে। এছাড়া, ভবিষ্যতে এই একই ঘটনায় নতুন করে কোনো মামলা করাও আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘জুলাই-যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসনমুক্ত করেছেন, তাই তাঁদের এই সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদেও এমন দায়মুক্তির বিধান দেওয়ার ক্ষমতা আছে। এর আগে ১৯৭৩ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও এমন আইন হয়েছিল।’ তিনি আরব বসন্তের উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বজুড়ে বহু গণঅভ্যুত্থানে বিপ্লবীদের সুরক্ষার এমন নজির রয়েছে।

তবে এখানে ‘কিন্তু’ রয়েছে। ঢালাওভাবে সবাইকে এই দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের নামে যদি কোনো হত্যাকাণ্ড নিছক রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ বা ব্যক্তিগত স্বার্থে, যেমন—লোভ বা ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে সংঘটিত হয়, তবে সেই অপরাধী পার পাবে না।

তদন্ত ও মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোন হত্যা রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ আর কোনটি ব্যক্তিগত অপরাধ—তা নির্ধারণ করবে কে? এই জটিল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর। যদি কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দাবি করে যে তাদের স্বজনের মৃত্যু বা হত্যা ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং ব্যক্তিগত শত্রুতার ফল, তবে তারা মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারবে।

অধ্যাদেশ অনুসারে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়টি তদন্ত করবে। যদি তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায় যে হত্যা বা সহিংসতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না, বরং ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ ছিল, তবেই কেবল প্রচলিত আদালতে সেই অপরাধের বিচার চলবে। আর যদি দেখা যায় ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, তবে কমিশন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে, কিন্তু অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বা সাবেক কোনো কর্মকর্তাকে তদন্ত দলে রাখা যাবে না।

যদিও বর্তমানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অস্তিত্ব নেই, তবে আইন উপদেষ্টা জানিয়েছেন আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কমিশন পুনর্গঠন করা হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা সেখানে ন্যায়বিচারের জন্য যেতে পারেন।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: বাংলাদেশে দায়মুক্তির আখ্যান

দায়মুক্তির ধারণা বাংলাদেশে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময় শাসকেরা নিজেদের প্রয়োজনে এই আইনি অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও পলাতক শেখ হাসিনা—সবার আমলেই কোনো না কোনোভাবে দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে গঠিত আধাসামরিক বাহিনী ‘রক্ষীবাহিনী’র কর্মকাণ্ডকে সুরক্ষা দিতে প্রথম দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি হয়। বাহিনীটির বিরুদ্ধে যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের অভিযোগ তুঙ্গে, তখন ১৯৭৪ সালে একটি সংশোধনী এনে তাদের সব কাজকে আইনসম্মত ঘোষণা করা হয়। যদিও পরে হাইকোর্ট এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলেছিল।

শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক অধ্যাদেশ জারি করেন, যা খুনিদের বিচার থেকে সুরক্ষা দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে এটি সংসদে পাস হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই আইন বাতিল করে এবং শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের হত্যার বিচার শুরু হয়।

২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যৌথ বাহিনীর অভিযান ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর সময় ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে সুরক্ষা দিতে দায়মুক্তি আইন পাস করা হয়। ২০১৫ সালে হাইকোর্ট সেই আইনকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়।

রাজনীতির বাইরেও দায়মুক্তির নজির আছে। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার নামে একটি আইন করে, যেখানে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। একে সমালোচকরা দুর্নীতির সুরক্ষা কবচ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিচার পাওয়ার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো আইন করে সেই অধিকার হরণ করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।

জুলাই বিপ্লবীদের সুরক্ষায় নেওয়া এই অধ্যাদেশ সাময়িক স্বস্তি দিলেও, এর দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। অতীতের দায়মুক্তি আইনগুলো যেমন টিকতে পারেনি, ভবিষ্যতের কোনো সরকার এই অধ্যাদেশকে কীভাবে দেখবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, বিপ্লবের এই কারিগররা যে আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন, তা নিশ্চিত।

Ad 300x250

সম্পর্কিত