আরিফ রহমান

ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম রিলস স্ক্রল করতে করতে নিশ্চয়ই একটা গানের লাইন আপনার কান ঝালাপালা করে দিয়েছে।
‘একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধতে
সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী বাবাজান
অস্ত্র ধরেছেন, যুদ্ধ করেছেন
মুক্ত করেছেন বাংলা মায়ের প্রাণ’
আমি প্রিটি শিওর, গানটা শোনামাত্রই আপনার আঙুল অটোমেটিক্যালি হা হা রিঅ্যাক্টে চইলা যায়। হা হা রিপাবলিকের গর্বিত নাগরিক হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক এক প্রবৃত্তি। এরপর কমেন্টবক্সে বন্ধুদের ট্যাগ করে হাসাহাসি, ট্রল আর মিম বানানোর এক ডিজিটাল উৎসব চলতেই থাকে।
দেওয়ানবাগী পীরের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একগাদা কন্ট্রোভার্সি। মিলেনিয়াল বা জেনজিদের কাছে তিনি রীতিমতো এক মিম ম্যাটেরিয়াল। কিন্তু ভাইব্রাদার্স, একটু খাড়ান! ক্যানসেল কালচার আর ট্রলের এই যুগে যদি ইতিহাসের ধুলো ঝাইড়া ‘র ফ্যাক্ট’ সামনে আনি, তবে আপনার মাথাটা একটু হইলেও হ্যাং খাইতে পারে!
হাসি-তামশার পর্দাটা সরাইলে দেখবেন, একাত্তরের রণাঙ্গনে এই দেওয়ানবাগী হুজুর আসলেই ছিলেন একজন অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। এটা কোনো মুরিদদের বানানো গালগল্প নয়, বরং রীতিমতো ট্রেনিংপ্রাপ্ত এক প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন তিনি!
বিশ্বাস হচ্ছে না? ভাবছেন এটাও কোনো প্রোপাগান্ডা? চলেন তাইলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গলিতে একটু ঢুঁ মাইরা আসি। দেইখা আসি ট্রল আর মিমের আড়ালে ঢাকা পড়া অন্যরকম এক যোদ্ধার গল্প।
এন আনপ্রেডিক্টেবল ফ্রন্টলাইনার
মাহবুব-এ-খোদা। দেওয়ানবাগী পীর হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত হওয়ার অনেক আগে এটিই ছিল তার নাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হিস্ট্রিতে তার এন্ট্রিটা কোনোভাবেই অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সাথে তার কানেকশনের পেছনে ছিল দীর্ঘ পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজম আর কড়া দেশপ্রেমের দুর্দান্ত স্টোরিলাইন।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলাতে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভাপতি ছিলেন। মানে, রীতিমতো এক অরিজিনাল ফ্রন্টলাইন লিডার। এরপর সত্তরের নির্বাচনের পর যখন পিন্ডি থেকে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের গন্ধ আসতে শুরু করল, তিনি কিন্তু আর দশটা মানুষের মতো 'দেখি কী হয়' থিওরি আউড়ে প্যাসিভ হয়ে বসে থাকেন নাই।
বরং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পোলাপান নিয়ে তিনি আগেভাগেই যুদ্ধের এক বেসিক প্রিপারেশন নেওয়া শুরু করেন। অর্থাৎ ২৫ মার্চের কালরাতের অন্ধকার নামার আগেই তিনি মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য পুরোপুরি লকড অ্যান্ড লোডেড ছিলেন। সত্যি কইরা বলেন তো, জাস্ট একটা ইশারার অপেক্ষায় থাকা ক্ষ্যাপাটে স্লিপার সেলরূপী দেওয়ানবাগীর হিস্ট্রি কয়জন জানতেন?
ভলান্টিয়ার থেকে প্লাটুন কমান্ডার: দ্য গেম চেঞ্জিং মোমেন্ট
২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর দেশজুড়ে যখন লাশের পাহাড়, মাহবুব-এ-খোদা তখন শুরুতে একটা স্বেচ্ছাসেবক দল নামিয়ে দিলেন। মেইনলি রিফিউজিদের হেল্প আর রিহ্যাবিলিটেশন ছিল তার কাজ। কিন্তু খুব জলদিই তিনি রিয়েলাইজ করলেন, পাকিস্তানিদের মডার্ন উইপনের সামনে শুধু লাঠিসোঁটা আর দেশপ্রেম দিয়া টিকে থাকা ইমপসিবল। ফাইট ব্যাক করতে হলে এখন দরকার পাল্টা ভারী অস্ত্র।

এরপরই শুরু হলো মেইন অ্যাকশন। ১১ এপ্রিল, ১৯৭১। মুজিবনগর সরকার তখনো ফর্মালি টেকঅফ করে নাই, তার আগেই তিনি ৭২ জন সহযোদ্ধা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেড্ডায় সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হইলেন। এরপর সোজা তেলিয়াপাড়ায় ৩ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে। সেখানে গিয়ে তিনি ৬০ জন বয়েলিং ব্লাড নিয়ে গঠিত এক দুর্ধর্ষ প্লাটুনের লিডারশিপ কাঁধে তুলে নিলেন। হয়ে গেলেন অরিজিনাল প্লাটুন কমান্ডার।
এখন আপনার মনে হতেই পারে, ‘ভাই, সোর্স কী? ট্রাস্ট মি ব্রো?’
না বস, এখানে কোনো 'ট্রাস্ট মি ব্রো' থিওরি নাই !
তার এই বীরত্বের পেছনে আছে সলিড দালিলিক প্রমাণ। ইন্ডিয়ান রেকর্ড চেক করলে দেখবেন, উনার ক্রমিক নম্বর এমএফ ভলিউম-৭, পৃষ্ঠা নং-১১। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের রেকর্ডেও উনার নাম জ্বলজ্বল করছে (ক্রমিক নম্বর ৩৪০৬৬)। মুক্তিযুদ্ধের রথী-মহারথীদের ভাষ্যমতে, ৩ নম্বর সেক্টরের ‘এস’ ফোর্সের আন্ডারে মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহর ডিরেক্ট সুপারভিশনে তিনি টানা আড়াই মাস ফ্রন্টলাইন কমব্যাটে লিড দিয়েছেন।

দ্য প্রফেটিক প্রেডিকশন: দেওয়ানবাগী যখন নস্ট্রাদামুস
সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের মতো ওনার প্রথম ডিরেক্ট অ্যাকশন শুরু হয় ২৬ এপ্রিল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে। পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর সেই লেভেলের এক কাউন্টার অ্যাটাক করেছিলেন তিনি। এরপরের ঘটনাটা শুনলে মনে হতে পারে কোনো হলিউড মাস্টারপিসের স্ক্রিপ্ট।
যুদ্ধের ময়দানে তখন চরম হাহাকার, মৃত্যু আর অনিশ্চয়তা। কেউ জানে না আগামীকাল সূর্যোদয় দেখার ভাগ্য হবে কি না। ঠিক এমন এক মুহূর্তে, একাত্তরের ঈদুল ফিতরের দিন বুক ফুলিয়ে এক অবিশ্বাস্য প্রেডিকশন করে বসলেন মাহবুব-এ-খোদা। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আগামী বকরা ঈদের আগে আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। আমি আপনাদের নিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করব।’
ভাবা যায়? যে সময়ে চারদিকে শুধু ধ্বংসের গন্ধ, সেখানে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলাটা অনেকের কাছেই তখন উইয়ার্ড এক গালগল্প মনে হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন খোদ তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ এবং মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া। মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত গবেষক মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া উনার ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ বইয়ের ৩১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় এই ঘটনার পুরো বিবরণ দিয়ে গেছেন।
এই গল্পের সবচেয়ে ক্রেজি পার্ট কী জানেন? সেই প্রেডিকশন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল! ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, আর ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন দেশের প্রথম ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)।
এন্ড গেজ হোয়াট? সেই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করেছিলেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা সেই স্টেনগানধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী!

ক্যানসেল কালচার ভার্সেস র ফ্যাক্ট
পার্সোনাল আইডিওলজি, তরিকতের চর্চা, মাজার কালচার বা উনার মুরিদদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে আপনি হাজারটা সমালোচনা করতে পারেন। একটা ডেমোক্রেটিক সোসাইটিতে একজন মানুষকে নিয়ে বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা হবে–এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু ভাই, উনার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সত্তাটাকে কোনোভাবেই ক্যানসেল করার সুযোগ নেই। একাত্তরে যখন তিনি স্টেনগান কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তখন তিনি কোনো পীর বা দরবেশ ছিলেন না; ছিলেন স্রেফ একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি সোলজার।
ইতিহাসের দিকে তাকালে একটা চরম কন্ট্রাস্ট চোখে পড়ে। একাত্তরে যখন ছারছিনা পীরের মতো কিছু মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঙালি নারীদের ‘গনিমতের মাল’ বলে ফতোয়া দিচ্ছিল, কিংবা যখন বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্লু-প্রিন্ট সাজানো হচ্ছিল, ঠিক সেই ডার্ক মোমেন্টে দেওয়ানবাগী হুজুরের মতো কিছু মানুষ ধর্মকে ঢাল না বানিয়ে ন্যায়ের পক্ষে স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছিলেন।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সুফিবাদ মানেই শুধু জিকির-আসকার করে ঘরের কোণায় বসে থাকা নয়; বরং দরকার পড়লে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠাও একজন মানুষের ঈমানি দায়িত্ব। দেশপ্রেম যে আসলেই ঈমানের অঙ্গ, সেটা তিনি রণাঙ্গনের মাঠে নেমে প্রুভ করেছেন।
সো, নেক্সট টাইম যখন ফেসবুকের নিউজফিডে বা ইন্সটা রিলে ‘একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধতে’ গানটা বেজে উঠবে আর আপনার আঙুল ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দিতে যাবে, তখন অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও লোকটার ওই স্টেনগান হাতে রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা মনে করে নিয়েন। না নিলেও প্যারা নাই। তবে, আজকের মিমের দুনিয়ায় আমরা হয়তো অনেক কিছুই জোক হিসেবে নিই, কিন্তু ইতিহাসের এই র ফ্যাক্টগুলোকে নির্মোহভাবে স্বীকার করে নেওয়া আর সম্মান জানানোটা কিন্তু আমাদের বেসিক কমনসেন্স আর জাতীয় দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাই না?

ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম রিলস স্ক্রল করতে করতে নিশ্চয়ই একটা গানের লাইন আপনার কান ঝালাপালা করে দিয়েছে।
‘একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধতে
সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী বাবাজান
অস্ত্র ধরেছেন, যুদ্ধ করেছেন
মুক্ত করেছেন বাংলা মায়ের প্রাণ’
আমি প্রিটি শিওর, গানটা শোনামাত্রই আপনার আঙুল অটোমেটিক্যালি হা হা রিঅ্যাক্টে চইলা যায়। হা হা রিপাবলিকের গর্বিত নাগরিক হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক এক প্রবৃত্তি। এরপর কমেন্টবক্সে বন্ধুদের ট্যাগ করে হাসাহাসি, ট্রল আর মিম বানানোর এক ডিজিটাল উৎসব চলতেই থাকে।
দেওয়ানবাগী পীরের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একগাদা কন্ট্রোভার্সি। মিলেনিয়াল বা জেনজিদের কাছে তিনি রীতিমতো এক মিম ম্যাটেরিয়াল। কিন্তু ভাইব্রাদার্স, একটু খাড়ান! ক্যানসেল কালচার আর ট্রলের এই যুগে যদি ইতিহাসের ধুলো ঝাইড়া ‘র ফ্যাক্ট’ সামনে আনি, তবে আপনার মাথাটা একটু হইলেও হ্যাং খাইতে পারে!
হাসি-তামশার পর্দাটা সরাইলে দেখবেন, একাত্তরের রণাঙ্গনে এই দেওয়ানবাগী হুজুর আসলেই ছিলেন একজন অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। এটা কোনো মুরিদদের বানানো গালগল্প নয়, বরং রীতিমতো ট্রেনিংপ্রাপ্ত এক প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন তিনি!
বিশ্বাস হচ্ছে না? ভাবছেন এটাও কোনো প্রোপাগান্ডা? চলেন তাইলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গলিতে একটু ঢুঁ মাইরা আসি। দেইখা আসি ট্রল আর মিমের আড়ালে ঢাকা পড়া অন্যরকম এক যোদ্ধার গল্প।
এন আনপ্রেডিক্টেবল ফ্রন্টলাইনার
মাহবুব-এ-খোদা। দেওয়ানবাগী পীর হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত হওয়ার অনেক আগে এটিই ছিল তার নাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হিস্ট্রিতে তার এন্ট্রিটা কোনোভাবেই অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সাথে তার কানেকশনের পেছনে ছিল দীর্ঘ পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজম আর কড়া দেশপ্রেমের দুর্দান্ত স্টোরিলাইন।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলাতে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভাপতি ছিলেন। মানে, রীতিমতো এক অরিজিনাল ফ্রন্টলাইন লিডার। এরপর সত্তরের নির্বাচনের পর যখন পিন্ডি থেকে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রের গন্ধ আসতে শুরু করল, তিনি কিন্তু আর দশটা মানুষের মতো 'দেখি কী হয়' থিওরি আউড়ে প্যাসিভ হয়ে বসে থাকেন নাই।
বরং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পোলাপান নিয়ে তিনি আগেভাগেই যুদ্ধের এক বেসিক প্রিপারেশন নেওয়া শুরু করেন। অর্থাৎ ২৫ মার্চের কালরাতের অন্ধকার নামার আগেই তিনি মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য পুরোপুরি লকড অ্যান্ড লোডেড ছিলেন। সত্যি কইরা বলেন তো, জাস্ট একটা ইশারার অপেক্ষায় থাকা ক্ষ্যাপাটে স্লিপার সেলরূপী দেওয়ানবাগীর হিস্ট্রি কয়জন জানতেন?
ভলান্টিয়ার থেকে প্লাটুন কমান্ডার: দ্য গেম চেঞ্জিং মোমেন্ট
২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর দেশজুড়ে যখন লাশের পাহাড়, মাহবুব-এ-খোদা তখন শুরুতে একটা স্বেচ্ছাসেবক দল নামিয়ে দিলেন। মেইনলি রিফিউজিদের হেল্প আর রিহ্যাবিলিটেশন ছিল তার কাজ। কিন্তু খুব জলদিই তিনি রিয়েলাইজ করলেন, পাকিস্তানিদের মডার্ন উইপনের সামনে শুধু লাঠিসোঁটা আর দেশপ্রেম দিয়া টিকে থাকা ইমপসিবল। ফাইট ব্যাক করতে হলে এখন দরকার পাল্টা ভারী অস্ত্র।

এরপরই শুরু হলো মেইন অ্যাকশন। ১১ এপ্রিল, ১৯৭১। মুজিবনগর সরকার তখনো ফর্মালি টেকঅফ করে নাই, তার আগেই তিনি ৭২ জন সহযোদ্ধা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেড্ডায় সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হইলেন। এরপর সোজা তেলিয়াপাড়ায় ৩ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে। সেখানে গিয়ে তিনি ৬০ জন বয়েলিং ব্লাড নিয়ে গঠিত এক দুর্ধর্ষ প্লাটুনের লিডারশিপ কাঁধে তুলে নিলেন। হয়ে গেলেন অরিজিনাল প্লাটুন কমান্ডার।
এখন আপনার মনে হতেই পারে, ‘ভাই, সোর্স কী? ট্রাস্ট মি ব্রো?’
না বস, এখানে কোনো 'ট্রাস্ট মি ব্রো' থিওরি নাই !
তার এই বীরত্বের পেছনে আছে সলিড দালিলিক প্রমাণ। ইন্ডিয়ান রেকর্ড চেক করলে দেখবেন, উনার ক্রমিক নম্বর এমএফ ভলিউম-৭, পৃষ্ঠা নং-১১। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের রেকর্ডেও উনার নাম জ্বলজ্বল করছে (ক্রমিক নম্বর ৩৪০৬৬)। মুক্তিযুদ্ধের রথী-মহারথীদের ভাষ্যমতে, ৩ নম্বর সেক্টরের ‘এস’ ফোর্সের আন্ডারে মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহর ডিরেক্ট সুপারভিশনে তিনি টানা আড়াই মাস ফ্রন্টলাইন কমব্যাটে লিড দিয়েছেন।

দ্য প্রফেটিক প্রেডিকশন: দেওয়ানবাগী যখন নস্ট্রাদামুস
সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের মতো ওনার প্রথম ডিরেক্ট অ্যাকশন শুরু হয় ২৬ এপ্রিল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে। পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর সেই লেভেলের এক কাউন্টার অ্যাটাক করেছিলেন তিনি। এরপরের ঘটনাটা শুনলে মনে হতে পারে কোনো হলিউড মাস্টারপিসের স্ক্রিপ্ট।
যুদ্ধের ময়দানে তখন চরম হাহাকার, মৃত্যু আর অনিশ্চয়তা। কেউ জানে না আগামীকাল সূর্যোদয় দেখার ভাগ্য হবে কি না। ঠিক এমন এক মুহূর্তে, একাত্তরের ঈদুল ফিতরের দিন বুক ফুলিয়ে এক অবিশ্বাস্য প্রেডিকশন করে বসলেন মাহবুব-এ-খোদা। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আগামী বকরা ঈদের আগে আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। আমি আপনাদের নিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করব।’
ভাবা যায়? যে সময়ে চারদিকে শুধু ধ্বংসের গন্ধ, সেখানে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলাটা অনেকের কাছেই তখন উইয়ার্ড এক গালগল্প মনে হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন খোদ তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ এবং মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া। মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত গবেষক মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া উনার ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ বইয়ের ৩১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় এই ঘটনার পুরো বিবরণ দিয়ে গেছেন।
এই গল্পের সবচেয়ে ক্রেজি পার্ট কী জানেন? সেই প্রেডিকশন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল! ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, আর ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন দেশের প্রথম ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)।
এন্ড গেজ হোয়াট? সেই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করেছিলেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা সেই স্টেনগানধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, মাওলানা মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী!

ক্যানসেল কালচার ভার্সেস র ফ্যাক্ট
পার্সোনাল আইডিওলজি, তরিকতের চর্চা, মাজার কালচার বা উনার মুরিদদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে আপনি হাজারটা সমালোচনা করতে পারেন। একটা ডেমোক্রেটিক সোসাইটিতে একজন মানুষকে নিয়ে বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা হবে–এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু ভাই, উনার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সত্তাটাকে কোনোভাবেই ক্যানসেল করার সুযোগ নেই। একাত্তরে যখন তিনি স্টেনগান কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তখন তিনি কোনো পীর বা দরবেশ ছিলেন না; ছিলেন স্রেফ একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি সোলজার।
ইতিহাসের দিকে তাকালে একটা চরম কন্ট্রাস্ট চোখে পড়ে। একাত্তরে যখন ছারছিনা পীরের মতো কিছু মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঙালি নারীদের ‘গনিমতের মাল’ বলে ফতোয়া দিচ্ছিল, কিংবা যখন বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্লু-প্রিন্ট সাজানো হচ্ছিল, ঠিক সেই ডার্ক মোমেন্টে দেওয়ানবাগী হুজুরের মতো কিছু মানুষ ধর্মকে ঢাল না বানিয়ে ন্যায়ের পক্ষে স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছিলেন।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সুফিবাদ মানেই শুধু জিকির-আসকার করে ঘরের কোণায় বসে থাকা নয়; বরং দরকার পড়লে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠাও একজন মানুষের ঈমানি দায়িত্ব। দেশপ্রেম যে আসলেই ঈমানের অঙ্গ, সেটা তিনি রণাঙ্গনের মাঠে নেমে প্রুভ করেছেন।
সো, নেক্সট টাইম যখন ফেসবুকের নিউজফিডে বা ইন্সটা রিলে ‘একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধতে’ গানটা বেজে উঠবে আর আপনার আঙুল ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দিতে যাবে, তখন অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও লোকটার ওই স্টেনগান হাতে রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা মনে করে নিয়েন। না নিলেও প্যারা নাই। তবে, আজকের মিমের দুনিয়ায় আমরা হয়তো অনেক কিছুই জোক হিসেবে নিই, কিন্তু ইতিহাসের এই র ফ্যাক্টগুলোকে নির্মোহভাবে স্বীকার করে নেওয়া আর সম্মান জানানোটা কিন্তু আমাদের বেসিক কমনসেন্স আর জাতীয় দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাই না?

আপনার কি কখনো মনে হইছে বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতন একটা ঘটনা, যেটা বাংলাদেশের সব মানুষকে একছাতার নিচে এনেছিল, তার ঠিক দুই বছর পরে আমরা সবাই আর একছাতার নিচে নাই? বরং কয়েকটা ছাতার নিচে দাঁড়ায়ে বর্তমান বাংলাদেশ একটা ‘নিখিল বাংলা কালচারাল ওয়ার সমিতি’তে পরিণত হয়েছে।
২ দিন আগে
আপনার কি নতুন কোনো জায়গায় ইন্সটাগ্রামওয়ার্দি ছবি তোলার জন্য মন খাঁ খাঁ করছে? এদিকে কফিশপ বা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার বাজেট নেই, পার্কে গেলে পুলিশ দ্বারা ‘মাদকাসক্ত’ ট্যাগ ও মার খাওয়ার ভয়, আর রিসোর্টে যেতে চাইলে নির্ঘাত কিডনি বেচার পরিস্থিতি?
৪ দিন আগে
ফেসবুক বা ইনস্টা স্ক্রল করলেই ইদানীং কিছু উইয়ার্ড রিল সামনে আসতেছে। যে সবজি বা ফলের পাতে থাকার কথা, তারা এখন স্ক্রিনে আইসা রীতিমতো তুইতোকারি করতেছে! করলা, শসা, আদা বা লেবু আপনার দিকে আঙুল তুইলা বলতেছে সে আপনার শরীরের কী কী উপকার করে, আর আপনি তারে অবহেলা কইরা কী কী ভুল করতেছেন।
৬ দিন আগে
ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ কিংবা ডিনার—ইকোনমিক ক্লাস বা জেন্ডার নিউট্রাল হিসাবে বাংলাদেশিদের বিগেস্ট কমফোর্ট ফুড কোনটা? যে কয়টা খাবারের নাম এই তালিকায় আসবে, তার মধ্যে যে আলুভর্তা থাকবে, তা প্রায় চোখ বন্ধ কইরাই বইলা দেয়া যায়।
৯ দিন আগে