জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রয়টার্সের এক্সপ্লেইনার

ইরানের ওপর মার্কিন হামলা কি বৈধ

রয়টার্স
রয়টার্স

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৮: ৪৬
এআই জেনারেটেড ছবি

মার্কিন সামরিক বাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানের এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

এই হামলার বৈধতা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিচে এই হামলার আইনি দিকগুলো তুলে ধরা হলো।

ট্রাম্প কী বলেছেন

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার পক্ষে বিভিন্ন ধরনের যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইরান আগে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং সেই সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, বিদেশে অবস্থানরত সেনা এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি। কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেনি।

ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরান এক মাসের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু এর আগে গত জুনে ট্রাম্পই বলেছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করে দিয়েছে। ফলে তাঁর বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে আগের দাবির অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা কতটুকু

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ওপর এই হামলা চালিয়ে ট্রাম্প তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করছেন। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং তিনি পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের হাতে।

অতীতে উভয় দলের প্রেসিডেন্টই জাতীয় স্বার্থের যুক্তিতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই সীমিত পরিসরে সামরিক হামলা চালিয়েছেন। তবে সেগুলো সাধারণত সময় ও পরিসরের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মতো ছিল না।

এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দুজনই এই অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন ‘যুদ্ধ’ হিসেবে। হেগসেথ একে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী, সবচেয়ে জটিল এবং সবচেয়ে নিখুঁত আকাশ অভিযান’ বলেছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযান পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় চলতে পারে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও হতাহতের সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে বড় সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন ছিল। যেমন ২০০১ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আক্রমণের সময়।

‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ কী

১৯৭৩ সালে পাস হওয়া ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করে।

এই আইনের অধীনে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে বা নির্দিষ্ট অনুমোদন না দিলে প্রেসিডেন্ট কেবল তখনই সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে পাঠাতে পারেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বা সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি হামলা হয়।

আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে নিয়মিত কংগ্রেসকে সামরিক অভিযানের বিষয়ে রিপোর্ট দিতে হয়। ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার থেকে এই বিষয়ে কংগ্রেসকে অবহিত করা শুরু করেছে।

এছাড়া কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া শুরু হওয়া কোনো সামরিক অভিযান ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হয়, যদি না কংগ্রেস সেই সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়।

এই আইনে কংগ্রেস চাইলে প্রস্তাব এনে সামরিক অভিযান বন্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে। উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা এমন একটি প্রস্তাব ভোটে তোলার কথা বলেছেন।

তবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার কারণে এমন প্রস্তাব পাস করলেও তা কার্যকর করতে কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হতে পারে। অনেক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, শেষ পর্যন্ত জনমতই ট্রাম্পের এই অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার প্রধান নিয়ন্ত্রণ হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী এক দেশ অন্য দেশের ওপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। এর কেবল দুটি ব্যতিক্রম আছে—যদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনুমতি দেয় অথবা যদি দেশটি আত্মরক্ষার জন্য হামলা করে। এই ক্ষেত্রে কোনোটিই খাটছে না বলে মনে করেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ।

তবে আন্তর্জাতিক আইনে ‘প্রি-এম্পটিভ সেলফ ডিফেন্স’ বা সম্ভাব্য হামলার আগেই আত্মরক্ষামূলক হামলার একটি ধারণা রয়েছে। যদি কোনো দেশ নিশ্চিত প্রমাণ দিতে পারে যে তার ওপর আসন্ন ও ভয়াবহ হামলা হতে যাচ্ছে, তাহলে সেই হামলা ঠেকাতে আগাম সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার যুক্তি দাঁড়াতে পারে।

এ ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া বাস্তবে কঠিন।

তবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের রাজনৈতিক মূল্য থাকতে পারে। এই সংঘাতের যথেষ্ট আইনি ভিত্তি নেই বলে যুক্তরাজ্য ও স্পেন তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ আইনে খামেনিকে হত্যা করা কি বৈধ

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার বিষয়টিও আইনি দৃষ্টিতে বিতর্কিত।

খবরে বলা হচ্ছে, ইসরায়েল সরাসরি হামলাটি চালিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ও অপারেশনাল সহায়তা দিয়েছে।

১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান একটি নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্মকর্তা বা তাদের হয়ে কাজ করা কাউকে গুপ্তহত্যায় জড়িত হওয়া থেকে নিষিদ্ধ করেন। এই আদেশ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রাষ্ট্রনেতাকে হত্যা করা ‘অ্যাসাসিনেশন’ বা গুপ্তহত্যা হিসেবে গণ্য হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের সময় কোনো শত্রু নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা বৈধ সামরিক পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

খামেনির ক্ষেত্রে বিষয়টির বৈধতা নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর—হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বাস্তবে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল কি না এবং খামেনিকে সামরিক নেতা হিসেবে বৈধ লক্ষ্যবস্তু ধরা যায় কি না।

সম্পর্কিত