জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে রাশিয়া কেন লাভবান

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা মঙ্গলবার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে রাশিয়া তাদের মিত্রকে হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এ যুদ্ধে হারানোর চেয়ে রাশিয়ার পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মস্কোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লাভ হলো তেল রাজস্বের বৃদ্ধি।

তথ্যসূত্র:
তথ্যসূত্র:
আল-জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ২২: ১২
স্ট্রিম গ্রাফিক

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে আসছে। জাতিসংঘে তেহরানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব ঠেকাতে তারা ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে চেষ্টা করেছে, এমনকি শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র ইরানের কাছে বিক্রি করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনাকে তিনি মানবতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। পুতিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং একসময়ের উত্তরসূরি দিমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘শান্তিরক্ষী’ ট্রাম্পের আসল চেহারা দেখিয়েছেন।

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ (দুমার) চেয়ারম্যান ভিয়াচেস্লাভ ভলোদিন এ যুদ্ধকে নব্বইয়ের দশকে রাশিয়াকে অস্থিতিশীল করার পশ্চিমা প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা মঙ্গলবার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে রাশিয়া তাদের মিত্রকে হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এ যুদ্ধে হারানোর চেয়ে রাশিয়ার পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মস্কোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লাভ হলো তেল রাজস্বের বৃদ্ধি।

ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়াকে ব্যাপক ছাড়ে তেল বিক্রি করতে হচ্ছিল। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে রাশিয়ার ইউরালস ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে ৮২ ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে রাশিয়ার ইউরালস তেলের দামও বেড়ে ৫৭ ডলারে উঠেছে।

‘রুশ তেলের চাহিদা বাড়বে’

রাশিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলা হলো বিশ্বের প্রধান ভারী অপরিশোধিত তেল বা হেভি ক্রুড উৎপাদনকারী দেশ। অনেক দেশের রিফাইনারি বা শোধনাগার এ তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্যই তৈরি। গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটির তেল বাণিজ্য হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে ভেনেজুয়েলার রপ্তানি থমকে গেছে।

এখন ইরানের তেল রপ্তানিও বন্ধ হয়ে গেলে ভারী ক্রুড প্রক্রিয়াজাতকারী শোধনাগারগুলোকে রাশিয়ার ইউরালস তেলের ওপর নির্ভর করতে হবে।

কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইগার তিশকেভিচ আল জাজিরাকে বলেন, এর মানে হলো রুশ তেলের চাহিদা বাড়বে। কারণ শোধনাগারগুলোর প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। তিনি বলেন, এর ফলে রুশ তেলের ওপর দেওয়া ডিসকাউন্ট বা ছাড় কমে আসবে।

যদি তেলের দাম আরও বাড়ে তবে ক্রেমলিন ওয়াশিংটনকে প্রস্তাব দিতে পারে। তারা তেলের সরবরাহ বাড়ানোর বিনিময়ে কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করতে পারে। রাশিয়ার তেল উৎপাদন বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম কমবে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্যও সুবিধাজনক।

রাশিয়া কি মধ্যস্থতাকারী হতে পারে?

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি লাভ হতে পারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে রাশিয়া। তিশকেভিচ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের সময় এর আগেও এমন চেষ্টা করা হয়েছে। সব সময় কাজ করেনি, কিন্তু রাশিয়া আবার চেষ্টা করতে পারে।

২০২৫ সালের মার্চে পুতিন মার্কিন-ইরান পারমাণবিক আলোচনায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিন মাস পরে জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও তিনি একই প্রস্তাব দেন। ওয়াশিংটন তখন দুইবারই তা উপেক্ষা করেছিল।

ইরান সংঘাতের কারণে ট্রাম্পের মনোযোগ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে গেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পা দিয়েছে। মার্কিন মধ্যস্থতায় সেখানে শান্তি চুক্তির চেষ্টা থমকে গেছে। মস্কো বারবার ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক অঞ্চলের কিয়েভ-নিয়ন্ত্রিত অংশ ছেড়ে দেওয়ার চাপ দিচ্ছে।

ওয়াশিংটন উভয় পক্ষকে আপস করার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে। তিশকেভিচ একে ‘হু ব্লিংকস ফাস্ট’ বা কে আগে পিছু হটে তার খেলা বলেছেন। তিনি বলেন, কেউ আগে ‘না’ বলতে চায় না; বরং তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যাতে প্রতিপক্ষ জোরেসোরে ‘না’ বলে দরজা বন্ধ করে চলে যায়। ওয়াশিংটন ও পশ্চিমাদের নজর এখন ইরানের দিকে। এ সুযোগে রাশিয়া ট্রাম্পের জন্য নতুন এজেন্ডা ঠিক করার কয়েক সপ্তাহ সময় পেয়ে গেল।

এদিকে ইউক্রেন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের (মিসাইল) সংকটে পড়তে পারে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ডেপুটি চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহর রোমানেঙ্কো আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের আগেই আমরা গুরুতর ঘাটতিতে ছিলাম। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তিনি বলেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র খুব কম সংখ্যায় তৈরি হয়। চাহিদা এত বেশি যে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।

পক্ষ নেওয়ার বিপদ

একজন রুশ ইরান বিশেষজ্ঞের মতে, পুতিনকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কঠিন এক পছন্দ বেছে নিতে হবে। নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট ফেলো রুসলান সুলেইমানভ আল জাজিরাকে বলেন, মস্কোকে বেছে নিতে হবে। পুতিনের জন্য এটি খুব কঠিন। কারণ একদিকে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বিবাদ চান না, অন্যদিকে তেহরানের শাসকগোষ্ঠী ক্রেমলিনের হাতেগোনা কয়েকটি গুরুতর বিদেশি অংশীদারদের একটি।

তিনি বলেন, এ ছাড়া ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বেছে নেওয়াটাও কঠিন। ক্রেমলিন ইসরায়েলের সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত অংশীদারত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

সুলেইমানভ বলেন, তাৎক্ষণিক লাভের কথা বললে রাশিয়ার প্রপাগান্ডা মেশিন খামেনি হত্যার ঘটনাকে পশ্চিমা বিশ্বাসঘাতকতার উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তারা বলতে পারে ‘ওরা পারলে আমরা কেন পারব না?’ এটি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার সাফাই গাইতে কাজে লাগতে পারে।

তবে তিনি যোগ করেন, এ পরিস্থিতি পুতিনের ইমেজের জন্য একটি ধাক্কা। এটি প্রমাণ করে যে তিনি তাঁর মিত্র বা অংশীদারদের সত্যিকার অর্থে সাহায্য করতে অক্ষম। পুতিন ইতিমধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ মস্কোতে পালিয়ে যান, আর মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সঙ্গে মৈত্রী শেষ হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক আইনের অবক্ষয় ও রাশিয়ার সুযোগ

ইরান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের কর্তৃত্বকে আরও ধ্বংস করেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্স থিংক ট্যাংকের প্রধান আলিশের ইলখামভ আল জাজিরাকে বলেন, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি ছিল আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এখন সেই যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।

ক্রেমলিন খামেনি হত্যার ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র তাজিকিস্তানের যোদ্ধাদের ইউক্রেন যুদ্ধে টানতে পারে। তাজিকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মিল রয়েছে। রাশিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমা ‘ষড়যন্ত্রের’ ধুয়া তুলে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

ইলখামভ আরও বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরানি শরণার্থীদের ঢল ইউরোপের দিকে ছুটবে। এতে ইউরোপে উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়বে। এ দলগুলো সাধারণত মস্কোপন্থী হয়। ফলে ইউরোপের রাজনীতিতে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সম্পর্কিত