leadT1ad

ইরানের ‘ত্রাতা মার্কিন পুতুল’ রেজা পাহলভি আসলে কে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৫৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের রাজপথ এখন বারুদের স্তূপ। তেহরান থেকে ইসফাহান পর্যন্ত বিক্ষোভের আগুন। এর উত্তাপ পৌঁছেছে হাজার মাইল দূরের আমেরিকায়। সেখান থেকেই একের পর এক বার্তা পাঠাচ্ছেন রেজা পাহলভি। ইরানের বর্তমান শাসকের পতনের ডাক দিচ্ছেন তিনি। রাজপথে বিক্ষুব্ধ জনতাও স্লোগান দিচ্ছে– ‘রেজা শাহ, রুহাত শাদ’ বা ‘রেজা শাহ, আপনার আত্মা শান্তিতে থাকুক’।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ইরানের মানুষ তাদের হারানো রাজপুত্রকে ফিরে পেতে মরিয়া। কিন্তু এই আবেগের আড়ালে রয়েছে ভিন্ন সমীকরণ। রেজা পাহলভি সাম্প্রতিক সময়ে নিজেকে ইরানের মুক্তিদাতা হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি নিয়মিত ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে লবিং করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো ৬৫ বছর বয়সী মানুষটি আসলে কে? তিনি কি আসলেই গণতন্ত্রের পক্ষে? নাকি কেবল এক পরাজিত রাজবংশের শেষ প্রদীপ, যিনি আমেরিকার কাঁধে ভর দিয়ে পুরোনো সিংহাসন পেতে চান?

রাজপ্রাসাদ থেকে নির্বাসনে

ইরানের সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভি। ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর জন্ম নেওয়া রেজা ছিলেন পাহলভি রাজবংশের হবু রাজা। ১৯৭৮ সালে বিমান চালনার উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ১৯৭৯ সালে ইরানে ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লব হয়। বিপ্লবের প্রবল স্রোতে তাঁর বাবা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং আড়াই হাজার বছরের পুরোনো রাজতন্ত্র তাসের ঘরের মতো খসে পড়ে। বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন দেশ ঘুরে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের আমন্ত্রণে তিনি সপরিবারে কায়রোতে আশ্রয় নেন।

বাবার মৃত্যুর পর ১৯৮০ সালে কায়রোর কুব্বি প্রাসাদে বসে নিজের ২০তম জন্মদিনে রেজা পাহলভি নিজেকে ইরানের রাজা ঘোষণা করেন। সেদিন পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে সাম্রাজ্য ও দেশ উদ্ধারের শপথ করেছিলেন। সেই শপথের পর সাড়ে চার দশকের বেশি সময় কেটে গেছে। অথচ রেজা আজও দেশহীন। নিজেকে গণতন্ত্রের প্রবক্তা পরিচয় দিলেও রেজা নামের শেষে ‘পাহলভি’ উপাধি ইরানিদের মনে করিয়ে দেয় ভিন্ন ইতিহাস।

বাবার উত্তরাধিকার ও কলঙ্কিত অধ্যায়

রেজা পাহলভিকে বুঝতে হলে তাঁর বাবার শাসনকালকে জানা জরুরি। মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ইরানকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই উন্নয়নের চাকা পিষে মেরেছিল সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা। তাঁর কুখ্যাত গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’ তখন ছিল জনগণের ত্রাস। ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর চালানো হতো নির্মম নির্যাতন। সেই দমন-পীড়নের ইতিহাস রেজা পাহলভি খুব কৌশলে এড়িয়ে যান। তিনি বাবার আমলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বলেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন। কিন্তু রাজতন্ত্রের সেই অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে কখনো স্পষ্ট করে ক্ষমা চাননি।

আজকের প্রজন্ম শাহের আমল দেখেনি। তারা বর্তমান শাসকদের শাসনে অতিষ্ঠ। তাদের এই হতাশার সুযোগ নিচ্ছেন রেজা পাহলভি। তিনি বাবার আমলকে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই স্বর্ণযুগের নিচেই ছিল শোষণের পাহাড়। জনগণ সেই শোষণ মেনেই নেয়নি বলেই ৭৯-এর বিপ্লব হয়েছিল। সমালোচকদের দাবি, রেজা পাহলভি এখন সেই ইতিহাসের দায় অস্বীকার করে কেবল রাজনৈতিক ফয়দা লুটতে চাইছেন।

গণতন্ত্রের মুখোশ ও নিরাপদ দূরত্বের রাজনীতি

রেজা পাহলভির বর্তমান রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে গভীর সন্দেহ রয়েছে। তিনি নিজেকে কোনো দলের নেতা বলেন না। নিজেকে পরিচয় দেন কেবল সমন্বয়ক হিসেবে। রেজা পাহলভির দাবি, ইরানে অবাধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ ঠিক করবে তারা রাজতন্ত্র চায় নাকি প্রজাতন্ত্র। শুনতে খুব উদার মনে হলেও বাস্তবে তাঁর আচরণে স্ববিরোধিতা স্পষ্ট।

ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের প্রতিবেদন মতে, রেজা পাহলভি আসলে রাজতন্ত্রই ফিরিয়ে আনতে চান। গণতন্ত্রের বুলি কেবল পশ্চিমাদের মন জয় করার কৌশল।

রেজা পাহলভি গত ৪৫ বছর ধরে বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন। ইরানের মানুষ যখন নিষেধাজ্ঞা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়েছে তিনি তখন পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে ডিনার পার্টিতে ব্যস্ত থেকেছেন। তাঁর এই ‘ড্রয়িংরুম পলিটিক্স’ ইরানের খেটে খাওয়া মানুষের কতটা উপকারে আসবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকরা। তাদের দাবি, কেবল দূর থেকে বিপ্লবের ডাক দিয়ে রেজা পাহলভি ক্ষমতার কেন্দ্রে বসতে চান। একে অনেকে সুবিধাবাদী রাজনীতিও বলছেন।

আমেরিকার তুরুপের তাস

রেজা পাহলভির রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো আমেরিকার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। ইরানের মানুষের মনে এখনো ১৯৫৩ সালের দগদগে ঘা আছে। সেবার সিআইএ ষড়যন্ত্র করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল।

রেজা পাহলভিকেও অনেকে এখন আমেরিকার নতুন প্রজেক্ট বা প্রকল্প হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প প্রশাসন বা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কাছে তিনি একজন পছন্দের ব্যক্তি। আমেরিকা চায় ইরানে এমন একজন শাসক আসুক যিনি তাদের কথা শুনবেন। রেজা পাহলভি সেই চরিত্রের জন্য একেবারে মানানসই।

রেজা পাহলভি নিজেও বিদেশি শক্তির সাহায্য পাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। তিনি বারবার পশ্চিমা দেশগুলোকে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে বলছেন। এমনকি তিনি ইসরায়েলের প্রতিও নমনীয় মনোভাব দেখান। একজন ইরানি নেতা হিসেবে তাঁর এই অবস্থান অনেককেই অস্বস্তিতে ফেলে। জাতীয়তাবাদী ইরানিরা মনে করে, দেশের পরিবর্তন দেশের মানুষের হাতেই হওয়া উচিত। কোনো বিদেশি শক্তির ‘পাপেট’ বা পুতুল শাসক তারা চান না।

ইরানের মানুষ এখন বর্তমান শাসকের বিকল্প খুঁজছে। শক্তিশালী কোনো বিরোধী দল নেই। তাই মন্দের ভালো হিসেবে রেজা পাহলভির নাম সামনে আসছে, যা তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ নয় বরং পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া। তিনি হয়তো ভাবছেন ইতিহাসের চাকা উল্টো ঘুরবে। রাজপ্রাসাদের চাবি আবার তাঁর হাতে আসবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ইরানি তরুণরা কি সত্যিই একজন রাজাকে মেনে নেবে? নাকি তারা রেজা পাহলভিকে ব্যবহার করে মোল্লাতন্ত্র তাড়ানো হলে, পরে তাঁকেও ছুড়ে ফেলবে?

রেজা পাহলভি ইতিহাসের জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। তাঁর বিদেশি যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহ আছে। রেজা পাহলভি হয়তো নিজেকে ত্রাতা ভাবছেন। কিন্তু অনেকের কাছে কেবল পুরোনো এক দুঃস্বপ্নকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার কারিগর রেজা পাহলভি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান।

Ad 300x250

সম্পর্কিত