জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে যা ঘটবে

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আর দুই দিন বাকি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া ‘জুলাই সনদ’ রয়েছে গণভোটের কেন্দ্রে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ৪টি প্রধান বিষয়ের পাশাপাশি সংবিধানের ৪৮টি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আর দুই দিন বাকি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া ‘জুলাই সনদ’ রয়েছে গণভোটের কেন্দ্রে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ৪টি প্রধান বিষয়সহ সংবিধানের ৪৭টি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে নতুন সরকার এই সংস্কার করতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু ‘না’ ভোট জয়ী হলে কী হবে?

দেশের বাতাসে ভাসছে নানান জল্পনা। কেউ বলছেন সংস্কার থেমে যাবে, কেউ বলছেন রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে। অন্যদিকে সরকার বলছে এটি আস্থার পরীক্ষা। অতীতে বাংলাদেশে তিনটি গণভোট হয়েছে। প্রতিবারই ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছিল। এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চিলির মতো দেশেও সংবিধান পরিবর্তনের গণভোট ব্যর্থ হয়েছিল, বাংলাদেশেও এমনটা হতে পারে। আর যদি হয় তবে সাংবিধানিক যাত্রাপথ কোন দিকে যাবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।

প্রশ্ন: গণভোটে যদি ‘না’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তবে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কী হবে?

গণভোটে ‘না’ জয়ী হওয়ার অর্থ হলো জনগণ এই সনদ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর সহজ মানে হলো জুলাই সনদ আর বাস্তবায়ন হবে না এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে না। নতুন সংসদের সদস্যরা আর ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে গণ্য হবেন না। নবনির্বাচিত সংসদের ওপর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এখানেই থেমে যাবে। তখন দেশ চলবে বিদ্যমান সংবিধান অনুসারেই। এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেছেন, গণভোটে পাস না হলে জুলাই সনদের ইতি ঘটবে। জনগণ যা রায় দেবে তা মেনে নিতে হবে।

প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর এর প্রভাব কী হবে?

সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো। জুলাই সনদে বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকবে। কিন্তু গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে এই পরিবর্তন আসবে না এবং বর্তমান সংবিধানের নিয়মই বহাল থাকবে। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে যতবার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে ততবার একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে পারবেন। নির্বাহী বিভাগের ওপর প্রধানমন্ত্রীর একক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। সংসদ ও দলের ওপর তাঁর ক্ষমতা নিরঙ্কুশ থেকে যাবে।

প্রশ্ন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি ও ক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি?

বর্তমানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে। ‘না’ ভোট জিতলে এই গোপন ব্যালটের পদ্ধতি কার্যকর হবে না। এ ছাড়া সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা ছিল। যেমন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকার কথা। ‘না’ ভোট জিতলে রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা পাবেন না। তিনি কেবল প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।

প্রশ্ন: বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে কী ঘটবে?

বিচার বিভাগের সংস্কারের উদ্দেশ্যে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল সনদের অন্যতম এজেন্ডা। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ থেকে নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম করার কথা ছিল। হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী করার কথাও ছিল। গণভোটে জনগণ ‘না’ বললে এসব সংস্কার আটকে যাবে। বিচারক নিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া পুরনো নিয়মেই চলবে। নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করার আইনি কাঠামো আর দাঁড়াবে না।

প্রশ্ন: আইনসভার কাঠামো বা জাতীয় সংসদের কী হবে?

বিএনপি ও জামায়াতসহ অনেক দল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চেয়েছিল। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য নিয়ে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। গণভোটে ‘না’ ভোট জিতলে এই উচ্চকক্ষ গঠিত হবে না এবং বাংলাদেশ এককক্ষবিশিষ্ট সংসদেই পরিচালিত হবে। ফলে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির কোনো প্রয়োগ দেখা যাবে না। সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদে কোনো বিষয়ে ভেটো দিতে পারবেন না। অর্থাৎ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বলবৎ থাকবে। পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যাও বাড়বে না।

প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে?

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দেশে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আছে। বিএনপি বা জামায়াতসহ সব দলই তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়। জুলাই সনদেও এর উল্লেখ আছে। তবে ‘না’ ভোট জয়ী হলে সনদের প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তবে এখানে একটা বাধা আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায় অপেক্ষমাণ আছে। সেই রায়ের নির্দেশনা মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে। আর নির্বাচনে যেই দল জিতবে তারা নিজেদের মতো করে এই ব্যবস্থার সমাধান করতে পারে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তারা তাদের মতো করে ব্যবস্থা নেবে। সনদের নির্দিষ্ট ছকে তারা আর আটকে থাকবে না।

প্রশ্ন: সংস্কার কার্যক্রম কি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে?

গণভোটে ‘না’ জিতলে সংস্কারের পথ কঠিন হবে, তবে একেবারে বন্ধ হবে না। সংবিধান সংশোধনের সাধারণ নিয়ম বা ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তখন পরিবর্তন আনতে হবে। এর জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। নির্বাচিত সরকার তখন নিজেদের পছন্দমতো সংস্কার করতে পারবে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া কাঠামোর বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তারা হয়তো সনদের প্রস্তাবগুলো বদলে দেবে। কিছু বিষয় উপেক্ষা করবে, আবার কিছু বিষয় গ্রহণও করতে পারে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

প্রশ্ন: এই গণভোট কি অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতার পরীক্ষা?

এই গণভোট কেবল সংবিধান বদলানোর বিষয় নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সরকারের সংস্কার উদ্যোগ বৈধতা পাবে। তারা তাদের কাজ সফল বলে দাবি করতে পারবে। আর ‘না’ ভোট জিতলে সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। তখন প্রশ্ন উঠবে এত দিনের আয়োজন এবং ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ফলাফল কী হলো। তা প্রমাণ করবে, সরকার জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিচের মতো তখন বর্তমান সরকারকেও মেনে নিতে হবে যে জনগণ তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে না। যথারীতি সংসদ গঠিত হবে এবং নির্বাচিত সরকার দেশ চালাবে।

সব মিলিয়ে ১২ তারিখের এই গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলের মুহূর্ত। একটি সিলমোহর ঠিক করে দেবে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম। ‘না’ ভোট জয়ী হলে জাতি হয়তো পুরনো কাঠামোর ভেতরেই ঘুরপাক খাবে। সংস্কারের স্বপ্ন হয়তো অধরাই থেকে যাবে। কিংবা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাত ধরে নতুন কোনো পথে হাঁটবে। সেই পথ কতটা মসৃণ হবে তা সময়ই বলে দেবে।

তথ্যসূত্র: জুলাই সনদ এবং সরকারি গেজেট

Ad 300x250

সম্পর্কিত