জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

জুলাই সনদ ও গণভোট: বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে কি পড়বে ত্রয়োদশ নির্বাচন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ৫৫
ইতিহাসের আয়নায় গণভোট ও বাংলাদেশ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে। এতে বলা হয়, পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হবে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত একটি জাতীয় গণভোটের সঙ্গে একসঙ্গে। এই গণভোটে ভোটারদের চারটি সংস্কার প্রস্তাবের একটি প্যাকেজের পক্ষে বা বিপক্ষে শুধু একটি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে। এই পদ্ধতি নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দল আপত্তি তুলেছে। তাদের মতে, এত বড় ও জটিল সাংবিধানিক পরিবর্তনকে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয় এবং এতে দলগুলোর আলাদা মত প্রকাশের সুযোগ কমে যায়।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি হয় ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গঠিত একাধিক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ থেকে। পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তত্ত্বাবধানে আলোচনা করে এসব প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর এই সনদে স্বাক্ষর হয়। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল এতে স্বাক্ষর করেনি। তাদের অভিযোগ—এই সনদের আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট নয়। এর সাংবিধানিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন আছে এবং আদালতে এটি চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও নেই।

গণভোটে যে চারটি বড় সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, সেগুলো হলো— তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার অনুযায়ী ভবিষ্যতে আরও সংস্কার চালু রাখা।

যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়, তাহলে নির্বাচিত সংসদ একই সঙ্গে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে। তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবিধান সংশোধন শেষ করতে হবে এবং উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

সাধারণ মানুষের পক্ষে এই সংস্কারের জটিল দিকগুলো পুরোপুরি বোঝা কঠিন। কারণ বহু প্রস্তাবকে চারটি সাধারণ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তবে গণভোটের কাঠামো ও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে দলগুলোর মধ্যে থাকা গভীর মতভেদগুলো উপেক্ষিত থেকে যাবে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ভবিষ্যৎ সরকারকে বিতর্কিত সংস্কারগুলো মেনে নিতে বাধ্য করা হবে। আবার ‘না’ জয়ী হলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াই থেমে যেতে পারে। ফলে খুব জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত একটি সহজ গণরায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

আরও সমস্যা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এই সংস্কারের জটিল দিকগুলো পুরোপুরি বোঝা কঠিন। কারণ বহু প্রস্তাবকে চারটি সাধারণ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার সঙ্গে সরকারের এই ভূমিকার সংঘাত রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

এই গণভোট এমন এক নির্বাচনের সঙ্গে হচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগেই অনেক বদলে গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ও রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত থাকায় দলটি নির্বাচনের বাইরে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনে বড় একটি শক্তি ছিল। তাদের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এতে সংখ্যালঘু ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারদের একটি অংশ নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব হারানোর আশঙ্কা করছে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

আওয়ামী লীগ না থাকায় এসব ভোটার কোন দিকে ঝুঁকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতি মূলত দুইটি নতুন জোটের দিকে ঝুঁকেছে। একদিকে বিএনপির নেতৃত্বে একটি জাতীয়তাবাদী জোট, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে কেন্দ্র করে একটি ধর্মীয়-রক্ষণশীল জোট। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই দুই জোটই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, কিছু আপত্তি থাকলেও রাজনৈতিক সংস্কারের স্বার্থে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও মনে করছেন, নির্বাচন সংকট এড়াতে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট জরুরি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে স্বাক্ষর না করলেও তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের মতে, কাঠামো পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া দরকার।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু সংবিধান বদল হবে কি না—তা নির্ধারণ করবে না; বরং এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং এর পর দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি কেমন হবে, সেটিও ঠিক করবে। এই অর্থে, নির্বাচনটি সংস্কারের বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন শেষে ফলাফল যেভাবে গ্রহণ করা হবে, বাস্তবায়ন করা হবে এবং চ্যালেঞ্জ করা হবে—সেটিই নির্ধারণ করবে জনগণের আস্থা এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথচলা।

ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ (আইএএস) থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সার্জিল

Ad 300x250

সম্পর্কিত