সুমন সুবহান

সময় : ১৯৭২ সালের এক অবসন্ন দুপুর। স্থান : ঢাকার একটি বীরাঙ্গনা পুনর্বাসন কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর শেষে বাবা আর মেয়ের পুনর্মিলন ঘটেছে। মেয়ে কান্নার প্রবল আবেগ সামলে দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। গত এক বছরে সবকিছুই অনেক বদলেছে, বাবাও। তিনি যেন আরও বুড়ো হয়ে গেছেন। বাবা তার কাঁপা কাঁপা দুহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। দুজনই অঝোরে কাঁদছেন। মেয়ে একসময় নিজেকে খানিকটা সামলে নেয়, ‘বাবা, আমি কি এখনই তোমার সঙ্গে যাবো? অফিসে বলতে হবে।‘
কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে তার নিজের বাবার কাছে আশ্রয় খুঁজে পেতে চেয়েছে অথচ বাবার বুকে সেই উত্তাপটা যেন নেই। তিনি একটু ইতস্থত করে মেয়েকে বললেন, ‘না, মা। আজ তোকে নিয়ে যেতে পারবো না। বাড়িঘর মেরামত হচ্ছে। তোর মা-ও দেশে ফিরে এসেছে। তোর ছোটবোন জামাইকে নিয়ে বাড়ি আসবে। ওরা চলে গেলে আমি তোকে নিয়ে যাব।’
মেয়ে আস্তে করে নিজেকে বাবার বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে নেয়। বুকের ভেতরের সব আবেগ-কান্না চেপে রেখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ঠিক আছে বাবা, তুমি আর কষ্ট করে এসো না।’
বাবা-মেয়ের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে যান, না না বলে তিনি আমতা আমতা করতে থাকেন। একসময় কথার ফুরসৎ খুঁজে পেতে মেয়ের দিকে ফলের ঠোঙাটা এগিয়ে দেন। মেয়ে খানিকটা কুণ্ঠিত হয়ে ওটা হাতে নেয়, অথচ প্রবল অভিমানে তার ঠোঙাটা ছুঁয়ে দেখতেও অরুচি হয়। ওটা ছুড়ে ফেলে বাবাকে অসম্মান করতে তার মন সায় দেয় না।
কয়েক মাস পর বাবা আবারও দেখা করতে আসেন, তবে মেয়েকে নিয়ে যাবার কথা একবারের জন্য হলেও বলেননি। বড় ভাই কলকাতা থেকে নিয়ে আসা শাড়িসহ দেখা করতে এসেছেন, এমনকি প্রাক্তন প্রেমিকও এসে দেখে যায়। কিন্তু কেউই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার কথা বলেনি। তবে যে কঠিন বাস্তব কথাটা বাবা মুখ ফুটে মেয়েকে বলতে পারেননি সেটা বড় ভাই অবলীলায় বলে যান, ‘আমরা যে যখন পারব তোর সাথে দেখা করে যাব। তুই কিন্তু হুট করে আবার বাড়িতে গিয়ে উঠিস না।‘
মেয়েটার মুখের পেশি শক্ত হয়, চোয়াল দৃঢ় হয়ে আসে। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে বড় ভাই আবার বলে, ‘আমাদের ঠিকানায় চিঠিপত্র লেখার দরকার নেই। তুই তো পুনর্বাসনকেন্দ্রে ভালোই আছিস। আমিও চাকরি পেয়েছি, সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছি। তা দিয়ে বাড়িঘর মেরামত এবং দুটো নতুন ঘরও তোলা হয়েছে।’
এটাই ছিল একাত্তরে কমবেশি সব শারীরিকভাবে নির্যাতিত বা সম্ভ্রমহারানো নারীদের গল্প।
করুণ বাস্তবতা।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে ‘জাতীয় নারী পুনর্বাসন সংস্থা’ গঠন করা হয়। তারা প্রথম পর্যায়ে সম্ভ্রম হারিয়েছেন এমন ৩০০ জন নারীর সন্ধান পেলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ২ লাখ ৫৯ হাজার ২ শ ৫৫ জন ক্ষতিগ্রস্থ নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বা ২১ হাজার ৫ শ ১৯ নারীই ছিলেন ধর্ষিতা। পাশবিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার বা শারীরিক ক্ষতির সঙ্গে সম্মানহানী ঘটেছে এমন নারীদের সাধারণত ধর্ষিতা বলা হলেও রাষ্ট্র এই নির্যাতিতা নারীদের নাম দিয়েছে ‘বীরাঙ্গনা’, যার অর্থ বীরযোদ্ধা বা অসম সাহসী নারী।
বীরাঙ্গনা নারীরা একদিন শেখ মুজিব রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন। তিনি তাঁদের বলেছিলেন, ‘তোরা আমার মা, জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছিস। তোরা শ্রেষ্ঠ বীরাঙ্গনা। আমি আছি, তোদের চিন্তা কী?’
শেখ মুজিবের প্রশস্ত বুকে অশ্রুপাত করে বীরাঙ্গনা নারীরা যে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে নিজের বাবার বুকে তারা সেই উত্তাপ বা আশ্রয় খুঁজলেও তা পাননি। সরকারি সাহায্যের টাকায় তাদের পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘর বানালেও সেখানে তাদের অনেকেরই স্থান হয়নি। ১৯৭১ সালে বীরাঙ্গনা নারীদের শরীর স্পর্শ করেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হায়েনারা। তাদের সমাজের সবার কাছে পাপী বা ঘৃণার পাত্রীতে পরিণত করা হয়েছে।
অথচ স্বাধীন দেশের সমাজে তাঁদের ঠাঁই মেলেনি। কেউ একফোঁটা সহানুভূতি দেখিয়ে এগিয়ে আসেনি, গড়েনি কোনো সম্পর্ক। পরিবারের আপনজন, পিতা, ভাই, স্বামী কেউই এগিয়ে আসেনি। সবাই মনে-প্রাণে রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের জন্য শুধু পুনর্বাসন চেয়েছে। আর এভাবেই বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ, দুঃখ, কষ্ট, অপমান এবং তাঁদের প্রতি সমাজ বা পরিবারের সমষ্টিগত অস্বীকৃতির গল্পগুলো স্বাধীন বাংলাদেশে সব সময় আড়ালেই থেকেছে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্রী স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের সহাপাঠিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করেন। নারীদের সৃষ্ট তহবিল ব্যবহৃত হয়েছে শরণার্থীদের জন্য, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা এবং যুদ্ধের রসদ সংগ্রহে। তারা সশরীরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বোমা, অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ কেউ গান গেয়ে উজ্জীবিত করেছেন শরণার্থী শিবিরের আর্তমানুষ আর মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি জাতীয় সংগ্রামে সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনুচ্চারিত থেকেছে।
অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর বীরাঙ্গনা নারীদের মা-বোনের আদরে মাথায় তুলে নেওয়ার কথা ছিল। কারণ, তাঁরা কেউই স্বেচ্ছায় পাকিস্তানী সেনা কিংবা তাদের সহযোগীদের খপ্পরে পড়েননি। ক্ষোভে-দুঃখে-অপমানে সুযোগ পেলেই অনেকে আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিয়েছিলেন। নারীরা তাঁদের মাথার চুল বা পরনের শাড়ি আত্মহত্যার জন্য ব্যবহার করায় পাকিস্তানী সৈন্যরা বন্দী নারীদের চুল কেটে দিয়ে অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় ক্যাম্পে রেখে দিত।
পরিবার-বন্ধু-আপনজনদের তাদের প্রতি আচরণ প্রসঙ্গে একজন বীরাঙ্গনা নারী বলেন, ‘ওরা আমাদের বাড়িতে একা ফেলে দেশের কাজে গিয়েছিল এ কথা সত্যি; কিন্তু আমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল কার ওপর? একবারও কি আমাদের পরিণামের কথা ভাবেনি? আমরা কেমন করে নিজেকে বাঁচাব, যুদ্ধের উম্মাদনায় আমাদের কথা তো কেউ মনে রাখেনি। পেছনে পড়েছিল গর্ভবতী স্ত্রী, বিধবা মা, যুবতী ভগ্নি—কারও কথাই সেদিন মনে হয়নি। অথচ তাদের আত্মরক্ষার তো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। বৃদ্ধ পিতা-মাতা মরে বেঁচেছেন, গর্ভবতী পত্নীর সন্তান গর্ভেই নিহত হয়েছে। যুবতী স্ত্রী, তরুণী ভগ্নি পাকদস্যুদের শয্যাশায়িনী হয়েছে। অথচ আজ যখন বিজয়ের লগ্ন এসেছে, মুক্তির মুহুর্ত উপস্থিত হয়েছে, তখনও একবুক ঘৃণা নিয়ে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করছে সামাজিক জীবেরা।’
‘ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস’ মন্তব্য করেছে যে পাকিস্তানের সশস্ত্রবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা ছিল একটা সুশৃঙ্খল বাহিনী দ্বারা স্বেচ্ছায় গৃহীত নীতির একটা অংশ। লেখক মুলক রাজ আনন্দ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বলেছেন, ধর্ষণগুলো ছিল পদ্ধতিগত এবং ব্যাপক; এগুলো সচেতনভাবে গৃহীত সমরনীতির অংশ। পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা পরিকল্পিত একটি ‘নতুন জাতি’ তৈরি করতে অথবা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপলব্ধিকে, প্রেরণাকে হালকা করে দিতে’ এসব করা হয়েছিল।

সময় : ১৯৭২ সালের এক অবসন্ন দুপুর। স্থান : ঢাকার একটি বীরাঙ্গনা পুনর্বাসন কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর শেষে বাবা আর মেয়ের পুনর্মিলন ঘটেছে। মেয়ে কান্নার প্রবল আবেগ সামলে দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। গত এক বছরে সবকিছুই অনেক বদলেছে, বাবাও। তিনি যেন আরও বুড়ো হয়ে গেছেন। বাবা তার কাঁপা কাঁপা দুহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। দুজনই অঝোরে কাঁদছেন। মেয়ে একসময় নিজেকে খানিকটা সামলে নেয়, ‘বাবা, আমি কি এখনই তোমার সঙ্গে যাবো? অফিসে বলতে হবে।‘
কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে তার নিজের বাবার কাছে আশ্রয় খুঁজে পেতে চেয়েছে অথচ বাবার বুকে সেই উত্তাপটা যেন নেই। তিনি একটু ইতস্থত করে মেয়েকে বললেন, ‘না, মা। আজ তোকে নিয়ে যেতে পারবো না। বাড়িঘর মেরামত হচ্ছে। তোর মা-ও দেশে ফিরে এসেছে। তোর ছোটবোন জামাইকে নিয়ে বাড়ি আসবে। ওরা চলে গেলে আমি তোকে নিয়ে যাব।’
মেয়ে আস্তে করে নিজেকে বাবার বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে নেয়। বুকের ভেতরের সব আবেগ-কান্না চেপে রেখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ঠিক আছে বাবা, তুমি আর কষ্ট করে এসো না।’
বাবা-মেয়ের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে যান, না না বলে তিনি আমতা আমতা করতে থাকেন। একসময় কথার ফুরসৎ খুঁজে পেতে মেয়ের দিকে ফলের ঠোঙাটা এগিয়ে দেন। মেয়ে খানিকটা কুণ্ঠিত হয়ে ওটা হাতে নেয়, অথচ প্রবল অভিমানে তার ঠোঙাটা ছুঁয়ে দেখতেও অরুচি হয়। ওটা ছুড়ে ফেলে বাবাকে অসম্মান করতে তার মন সায় দেয় না।
কয়েক মাস পর বাবা আবারও দেখা করতে আসেন, তবে মেয়েকে নিয়ে যাবার কথা একবারের জন্য হলেও বলেননি। বড় ভাই কলকাতা থেকে নিয়ে আসা শাড়িসহ দেখা করতে এসেছেন, এমনকি প্রাক্তন প্রেমিকও এসে দেখে যায়। কিন্তু কেউই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার কথা বলেনি। তবে যে কঠিন বাস্তব কথাটা বাবা মুখ ফুটে মেয়েকে বলতে পারেননি সেটা বড় ভাই অবলীলায় বলে যান, ‘আমরা যে যখন পারব তোর সাথে দেখা করে যাব। তুই কিন্তু হুট করে আবার বাড়িতে গিয়ে উঠিস না।‘
মেয়েটার মুখের পেশি শক্ত হয়, চোয়াল দৃঢ় হয়ে আসে। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে বড় ভাই আবার বলে, ‘আমাদের ঠিকানায় চিঠিপত্র লেখার দরকার নেই। তুই তো পুনর্বাসনকেন্দ্রে ভালোই আছিস। আমিও চাকরি পেয়েছি, সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছি। তা দিয়ে বাড়িঘর মেরামত এবং দুটো নতুন ঘরও তোলা হয়েছে।’
এটাই ছিল একাত্তরে কমবেশি সব শারীরিকভাবে নির্যাতিত বা সম্ভ্রমহারানো নারীদের গল্প।
করুণ বাস্তবতা।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে ‘জাতীয় নারী পুনর্বাসন সংস্থা’ গঠন করা হয়। তারা প্রথম পর্যায়ে সম্ভ্রম হারিয়েছেন এমন ৩০০ জন নারীর সন্ধান পেলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ২ লাখ ৫৯ হাজার ২ শ ৫৫ জন ক্ষতিগ্রস্থ নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বা ২১ হাজার ৫ শ ১৯ নারীই ছিলেন ধর্ষিতা। পাশবিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার বা শারীরিক ক্ষতির সঙ্গে সম্মানহানী ঘটেছে এমন নারীদের সাধারণত ধর্ষিতা বলা হলেও রাষ্ট্র এই নির্যাতিতা নারীদের নাম দিয়েছে ‘বীরাঙ্গনা’, যার অর্থ বীরযোদ্ধা বা অসম সাহসী নারী।
বীরাঙ্গনা নারীরা একদিন শেখ মুজিব রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন। তিনি তাঁদের বলেছিলেন, ‘তোরা আমার মা, জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছিস। তোরা শ্রেষ্ঠ বীরাঙ্গনা। আমি আছি, তোদের চিন্তা কী?’
শেখ মুজিবের প্রশস্ত বুকে অশ্রুপাত করে বীরাঙ্গনা নারীরা যে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে নিজের বাবার বুকে তারা সেই উত্তাপ বা আশ্রয় খুঁজলেও তা পাননি। সরকারি সাহায্যের টাকায় তাদের পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘর বানালেও সেখানে তাদের অনেকেরই স্থান হয়নি। ১৯৭১ সালে বীরাঙ্গনা নারীদের শরীর স্পর্শ করেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হায়েনারা। তাদের সমাজের সবার কাছে পাপী বা ঘৃণার পাত্রীতে পরিণত করা হয়েছে।
অথচ স্বাধীন দেশের সমাজে তাঁদের ঠাঁই মেলেনি। কেউ একফোঁটা সহানুভূতি দেখিয়ে এগিয়ে আসেনি, গড়েনি কোনো সম্পর্ক। পরিবারের আপনজন, পিতা, ভাই, স্বামী কেউই এগিয়ে আসেনি। সবাই মনে-প্রাণে রাষ্ট্রের কাছে তাঁদের জন্য শুধু পুনর্বাসন চেয়েছে। আর এভাবেই বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ, দুঃখ, কষ্ট, অপমান এবং তাঁদের প্রতি সমাজ বা পরিবারের সমষ্টিগত অস্বীকৃতির গল্পগুলো স্বাধীন বাংলাদেশে সব সময় আড়ালেই থেকেছে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্রী স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের সহাপাঠিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করেন। নারীদের সৃষ্ট তহবিল ব্যবহৃত হয়েছে শরণার্থীদের জন্য, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা এবং যুদ্ধের রসদ সংগ্রহে। তারা সশরীরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বোমা, অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ কেউ গান গেয়ে উজ্জীবিত করেছেন শরণার্থী শিবিরের আর্তমানুষ আর মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি জাতীয় সংগ্রামে সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনুচ্চারিত থেকেছে।
অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর বীরাঙ্গনা নারীদের মা-বোনের আদরে মাথায় তুলে নেওয়ার কথা ছিল। কারণ, তাঁরা কেউই স্বেচ্ছায় পাকিস্তানী সেনা কিংবা তাদের সহযোগীদের খপ্পরে পড়েননি। ক্ষোভে-দুঃখে-অপমানে সুযোগ পেলেই অনেকে আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিয়েছিলেন। নারীরা তাঁদের মাথার চুল বা পরনের শাড়ি আত্মহত্যার জন্য ব্যবহার করায় পাকিস্তানী সৈন্যরা বন্দী নারীদের চুল কেটে দিয়ে অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় ক্যাম্পে রেখে দিত।
পরিবার-বন্ধু-আপনজনদের তাদের প্রতি আচরণ প্রসঙ্গে একজন বীরাঙ্গনা নারী বলেন, ‘ওরা আমাদের বাড়িতে একা ফেলে দেশের কাজে গিয়েছিল এ কথা সত্যি; কিন্তু আমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল কার ওপর? একবারও কি আমাদের পরিণামের কথা ভাবেনি? আমরা কেমন করে নিজেকে বাঁচাব, যুদ্ধের উম্মাদনায় আমাদের কথা তো কেউ মনে রাখেনি। পেছনে পড়েছিল গর্ভবতী স্ত্রী, বিধবা মা, যুবতী ভগ্নি—কারও কথাই সেদিন মনে হয়নি। অথচ তাদের আত্মরক্ষার তো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। বৃদ্ধ পিতা-মাতা মরে বেঁচেছেন, গর্ভবতী পত্নীর সন্তান গর্ভেই নিহত হয়েছে। যুবতী স্ত্রী, তরুণী ভগ্নি পাকদস্যুদের শয্যাশায়িনী হয়েছে। অথচ আজ যখন বিজয়ের লগ্ন এসেছে, মুক্তির মুহুর্ত উপস্থিত হয়েছে, তখনও একবুক ঘৃণা নিয়ে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করছে সামাজিক জীবেরা।’
‘ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস’ মন্তব্য করেছে যে পাকিস্তানের সশস্ত্রবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা ছিল একটা সুশৃঙ্খল বাহিনী দ্বারা স্বেচ্ছায় গৃহীত নীতির একটা অংশ। লেখক মুলক রাজ আনন্দ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বলেছেন, ধর্ষণগুলো ছিল পদ্ধতিগত এবং ব্যাপক; এগুলো সচেতনভাবে গৃহীত সমরনীতির অংশ। পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা পরিকল্পিত একটি ‘নতুন জাতি’ তৈরি করতে অথবা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপলব্ধিকে, প্রেরণাকে হালকা করে দিতে’ এসব করা হয়েছিল।

কয়েক মিনিটের কাজ। অথচ দেখা যায়, ঘড়ির কাঁটা একের পর এক ঘর পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কাজটা আর করা হয়ে উঠছে না। জানি কী করতে হবে, জানি সময়ও লাগবে না। তবু কাজটা পড়ে থাকে। এই ‘পরে করব সিনড্রোম’ কি কোনো রোগ? কেন কয়েক মিনিটের কাজও আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখি?
৫ ঘণ্টা আগে
ফিল্টার তৈরি করে এক ধরনের পারফেক্ট জীবনের ভ্রম, ফোমো মানসিক চাপ ও তুলনার জন্ম দেয়, আর ফিউশন বিভিন্ন দেশ–সংস্কৃতিকে মিশিয়ে নতুন হাইব্রিড কালচার তৈরি করে। এই তিনটি মিলেই সোশ্যাল মিডিয়ার সাংস্কৃতিক প্রভাবকে গড়ে তুলছে।
৭ ঘণ্টা আগে
মাইক্রোসফটের তৈরি এক্সেলের বয়স এখন ৪০ বছর। এখন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, এক্সেল এখন অনেক ক্ষেত্রে কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। কারো মতে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে এক্সেল যে এখনও কতটা জনপ্রিয়, তা বোঝা যায় পরিসংখ্যানেই।
১০ ঘণ্টা আগে
ভালো ছবি মানেই শুধু দামি ক্যামেরা বা স্মার্টফোন নয়। ছবিতে কোথায় কী রাখবেন, কী বাদ দেবেন, আলো–ছায়া আর ফ্রেম কীভাবে কাজ করবে, এই সিদ্ধান্তগুলোর নামই কম্পোজিশন। একটু ভাবনা আর কিছু সহজ নিয়ম জানলে সাধারণ দৃশ্যও হয়ে উঠতে পারে চোখে পড়ার মতো ছবি। এই লেখায় থাকছে ফটোগ্রাফি কম্পোজিশনের সহজ কৌশল।
১ দিন আগে