বন্ধুত্বের চার স্তর, আপনার বন্ধুরা কোন স্তরে আছেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ১৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

ছোটবেলায় মনে হতো বন্ধুদের ছাড়া থাকা একেবারেই অসম্ভব। প্রতিদিন ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে টিফিন খাওয়া, টিফিনের সময় আড্ডা বা ক্লাসের মধ্যে হাসাহাসি করা দিনগুলো যে একদিন ছেড়ে আসতে হবে, তখন তা ভাবিওনি।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে এখন দেখি, বন্ধুরা এখন অন্য শহরে নয়, অন্য দেশে! তাদের ছাড়া দিব্যি এখনো বেঁচে আছি।

প্রতিবছর বন্ধু দিবসে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ স্কুলের বন্ধুর ছবি দিচ্ছেন, কেউ অফিসের সহকর্মীকে ট্যাগ করছেন বা কেউ বেস্ট ফ্রেন্ডকে। এদের সবাইকে আমরা একই নামে ডাকি—‘বন্ধু’। কিন্তু সম্পর্কগুলো নিশ্চয় এক রকম নয়।

পরিচিত মানুষ বা অ্যাকুয়েট্যান্স

আমরা প্রায়ই পরিচিত মানুষ আর বন্ধুকে এক করে ফেলি। মনোবিজ্ঞানে এই দুটি সম্পর্কের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অ্যামেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বন্ধুত্ব হলো স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস, স্নেহ, সমর্থন এবং ব্যক্তিগত সংযোগ থাকে। কিন্তু অ্যাকুয়েট্যান্স বা পরিচিত মানুষ হলেন এমন কেউ, যাঁকে আপনি চেনেন, নিয়মিত দেখেন বা কথা বলেন, কিন্তু সম্পর্কটি ব্যক্তিগত বা গভীর নয়।

একই সঙ্গে ক্লাস করেন, একসঙ্গে অফিসে কাজ করেন, প্রতিদিন একই বাসে যাতায়াত করেন, একই জিমে যান বা একই ভবনে থাকেন, এমন অনেকেই আপনার পরিচিত হতে পারেন। তাদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, গল্প, এমনকি ছোটখাটো ব্যক্তিগত কথাও হতে পারে। কিন্তু তাতে সম্পর্কটি বন্ধুত্বে পরিণত হয় না।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, পরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক মূলত সামাজিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্ক আমাদের সামাজিক পরিসর বাড়ায়, নতুন সুযোগ তৈরি করে এবং দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে। কিন্তু এখানে সাধারণত গভীর আস্থা বা আবেগের বিনিয়োগ কম থাকে।

সমাজবিজ্ঞানী মার্ক গ্রানোভেটার ১৯৭৩ সালে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, জীবনের অনেক বড় সুযোগ খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছ থেকে আসে না, পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে আসে।

সাধারণ বন্ধু বা ক্যাজুয়াল ফ্রেন্ড

পরিচিত মানুষের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকেন ক্যাজুয়াল ফ্রেন্ড। এরা সেই মানুষ, যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, বই পড়ার সঙ্গী, খেলার মাঠের বন্ধুরা, প্রতিদিনের আড্ডার সঙ্গী কিংবা প্রতিবেশী—যাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে, কিন্তু সম্পর্কটি এখনো জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত স্তরে পৌঁছায়নি। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই বন্ধুত্ব সাধারণত একই রকম পছন্দ, একই বিষয়ে আগ্রহ, এসবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।

সব বন্ধুত্ব এক রকম নয়। সহজভাবে বুঝতে চাইলে বন্ধুত্বকে চারটি স্তরে ভাবা যায়—অ্যাকুয়েট্যান্স, ক্যাজুয়াল ফ্রেন্ড, ক্লোজ ফ্রেন্ড এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু বেস্ট ফ্রেন্ড। সম্পর্ক যত গভীর হয়, প্রতিটি স্তরে বিশ্বাস, সময় এবং আবেগগত ঘনিষ্ঠতা তত বাড়ে।

১৯৫৪ সালে সমাজবিজ্ঞানী পল লাজারসফেল্ড ও রবার্ট মার্টন এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। পরে ২০০১ সালে মিলার ম্যাকফারসন, লিন স্মিথ-লভিন ও জেমস কুক তাঁদের গবেষণা ‘বার্ডস অব আ ফেদার: হোমোফিলি ইন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’-এ দেখান, মানুষ সাধারণত নিজের সঙ্গে কিছু মিল আছে এমন মানুষের সঙ্গেই সহজে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। সমাজবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘হোমোফিলি’।

ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বেস্ট ফ্রেন্ড কি একই

আমরা প্রায়ই ‘ক্লোজ ফ্রেন্ড’ আর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ শব্দ দুটি একই অর্থে ব্যবহার করলেও মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় এই দুই সম্পর্কের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেন এমন একজন, যার সঙ্গে আপনার গভীর বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে। আপনি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন, পরামর্শ নিতে পারেন, কঠিন সময়ে তাঁর ওপর নির্ভর করতে পারেন। একজন মানুষের এ রকম একাধিক ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকতে পারে।

অন্য দিকে বেস্ট ফ্রেন্ড সাধারণত সেই মানুষ, যার প্রতি আপনার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। অর্থাৎ এমন একজন, যাঁর সঙ্গে আবেগগত সংযোগ অন্যদের তুলনায় বেশি গভীর।

এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী রবিন ডানবার মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, একজন মানুষ গড়ে প্রায় ১৫০টি অর্থবহ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন। কিন্তু এই ১৫০ জনের গুরুত্ব সমান নয়।

সবচেয়ে ভেতরের স্তরে থাকেন মাত্র ৫ জন। এদেরই ডানবার মানুষের ‘সাপোর্ট ক্লিক’ বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সামাজিক বৃত্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই মানুষদের কাছেই আমরা সাধারণত ব্যক্তিগত সংকটের কথা বলি, মাঝরাতে ফোন করি বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে মতামত চাই।

এর পরের স্তরে থাকেন প্রায় ১৫ জন ঘনিষ্ঠ মানুষ। এরপর প্রায় ৫০ জন ভালো বন্ধু, যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকে। তারপর আসে বৃহত্তর সামাজিক পরিসর।

সহকর্মী কি বন্ধু হয়

অফিসে আমরা প্রতিদিন বহু মানুষের সঙ্গে কাজ করি। কিন্তু তাঁদের সবাই কি বন্ধু? উত্তর হলো, না। সহকর্মী মানে এমন একজন, যার সঙ্গে আপনার পেশাগত সম্পর্ক আছে। কাজের প্রয়োজনে কথা হয়, মিটিং হয়, দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়। কিন্তু তাতেই বন্ধুত্ব তৈরি হয় না।

অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রের বন্ধু হলেন সেই সহকর্মী, যার সঙ্গে সম্পর্ক অফিসের কাজের সীমা ছাড়িয়ে যায়। যাঁর সঙ্গে কাজের বাইরের বিষয় নিয়েও কথা বলা যায়, সমস্যায় পড়লে পরামর্শ চাওয়া যায় বা অফিস শেষে এক কাপ চা খেতে যাওয়াও স্বাভাবিক মনে হয়।

অনলাইন বন্ধু কি সত্যিকারের বন্ধুত্ব হতে পারে

একসময় বন্ধুত্ব মানেই ছিল একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, মুখোমুখি আড্ডা কিংবা একই পাড়ায় থাকা। এখন সেই ধারণা বদলেছে। অনেকের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সঙ্গে হয়তো কখনো সামনাসামনি দেখাই হয়নি। পরিচয় হয়েছে কোনো গেমে, অনলাইন ক্লাসে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

তাহলে এই সম্পর্ককে কি বন্ধুত্ব বলা যায়? গবেষণা বলছে, যেতে পারে—তবে কিছু শর্তে। ‘দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব ফ্রেন্ডশিপ’ এবং ডিজিটাল যোগাযোগ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সম্পর্ক অনলাইনে শুরু হলেও সেটি বন্ধুত্বে রূপ নিতে পারে, যদি সেখানে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক বিশ্বাস, আবেগগত সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তরিকতা থাকে। কারণ বন্ধুত্বের ভিত্তি মাধ্যম নয়, সম্পর্কের মান। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার ‘ফ্রেন্ড’ বা ‘ফলোয়ার’ থাকা মানে হাজার বন্ধুর মালিক হওয়া নয়।

ইংরেজিতে একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ আছে—ফেয়ার-ওয়েদার ফ্রেন্ড। এর আক্ষরিক অর্থ ‘সুসময়ের বন্ধু’। অর্থাৎ সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি পাশে থাকেন, কিন্তু সমস্যা শুরু হলেই দূরে সরে যান।

এটি কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের বা আনুষ্ঠানিক মনোবৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিভাগ নয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুস্থ বন্ধুত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিকতা। অর্থাৎ সম্পর্কটি শুধু একজনের প্রচেষ্টায় টিকে থাকবে না। তাই যে মানুষটি শুধু নিজের প্রয়োজনে যোগাযোগ করেন, কিন্তু অন্যের প্রয়োজনের সময় কখনো থাকেন না, তাঁকে বন্ধু বলা কঠিন। আবার এর উল্টো দিকটাও সত্য।

সবাইকে কি বন্ধু বলা যায়

একজন পরিচিত মানুষ, একজন আড্ডার সঙ্গী, একজন সহকর্মী, একজন শৈশবের বন্ধু, একজন অনলাইন বন্ধু কিংবা একজন বেস্ট ফ্রেন্ড—প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা। সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা সব সম্পর্কের কাছ থেকে একই প্রত্যাশা করি।

সব বন্ধুত্ব এক রকম নয়। সহজভাবে বুঝতে চাইলে বন্ধুত্বকে চারটি স্তরে ভাবা যায়—অ্যাকুয়েট্যান্স, ক্যাজুয়াল ফ্রেন্ড, ক্লোজ ফ্রেন্ড এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু বেস্ট ফ্রেন্ড। সম্পর্ক যত গভীর হয়, প্রতিটি স্তরে বিশ্বাস, সময় এবং আবেগগত ঘনিষ্ঠতা তত বাড়ে।

১৯৩৮ সালে শুরু হওয়া হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্টের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক। তাই জীবনে কতজন বন্ধু আছে, সেই সংখ্যার হিসাব করাটা জরুরি নয়। জীবনে যে কয়জন বন্ধু আছে, আমরা তাদের যথাযথ যত্ন ও সম্মান করছি কি না, সেটাই বড় কথা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত