জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের অনুবাদের একাংশ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো অষ্টম কিস্তি।
জি এইচ হাবীব

দক্ষতার বিচারে বলতে গেলে, আমাদের এলাকার সবচেয়ে বয়স্ক ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন একজন চিকিৎসক। তিনি ১৮৯০-এর দশকে ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল থেকে প্রথম মুসলমান হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। সম্ভবত ১৯৩০-এর দশকে সিভিল সার্জন হিসেবে অবসর নেন। তিনি আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৪ মাইল দূরের একটি খানদানি পরিবারের সদস্য ছিলেন, এবং অবসর জীবনের শেষ বছরগুলো পৈতৃক বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন। শুনেছি, ১৯৩০-এর দশকে তিনি ঢাকার মুসলমান নেতাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন।
যখন তিনি গ্রামের বাড়িতে এসে থিতু হন, তখন তিনি একজন প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক। গোটা অঞ্চলের মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি যখন আমাদের গ্রামে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, তখন তাঁর বয়স আশির ওপরে হলেও তিনি ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতেন। মাঝেমধ্যে আমার বাবার খোঁজ নিতে আমাদের বাড়িতেও আসতেন। তাঁর ছেলেও চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৯৪০-এর দশকে কালিগঞ্জ শহরে চলে যান। আমার পিতৃকুলের মুসলমানদের মধ্যে তাঁকে একজন সম্মানিত ভদ্রলোক হিসেবে গণ্য করা হতো। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল।
আমাদের কাছের এক গ্রামে আরেকজন ডাক্তার ছিলেন, যিনি আমার বাবার সহপাঠী ছিলেন। তিনি তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন জেলায় সরকারি ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আমার মনে পড়ে, তিনি যখন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন তিনি জনস্বাস্থ্য সেবা থেকে অবসরপ্রাপ্ত; স্থানীয় মুসলমান অভিজাত সমাজে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন আদরণীয় ব্যক্তি ।
কাছের গ্রামগুলোতে কয়েকজন মুসলমান মোক্তার ছিলেন। তাঁরা নিকটতম দুই শহরাঞ্চল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালতে আইন পেশায় কর্মরত ছিলেন। আমার বাবার সমসাময়িক আমাদের এক আত্মীয় ছিলেন—আমার মায়ের এক জ্ঞাতি বোনের স্বামী—তিনি ওকালতি করার জন্য কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে বাড়ি ফিরে আসেন এবং আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরের একটি স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন। আমার মনে পড়ে, তরুণ মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ দেওয়ার কারণে লোকে তাঁকে বেশ শ্রদ্ধা করত। আমাদের এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বেশ কয়েকজন মুসলমান ব্যবসায়ী ও বণিক কাছের শহরগুলোতে এবং লক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত বড় বন্দর নারায়ণগঞ্জে পাট, চাল ও ডালের পাইকারি ব্যবসা করতেন। এই ধরনের উদ্যোক্তারা বড় বড় দেশী নৌকা ভাড়া করে উত্তরের বাজারগুলোতে যেতেন। যেখান থেকে সস্তায় পাট ও চাল কিনে আমাদের শহরে এনে লাভজনক মূল্যে বিক্রি করতেন; পাট ব্যবসায়ীরা সাধারণত তাঁদের পণ্য নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যেতেন।
মহাজনি ব্যবসা শুরুর আগে আমার পিতামহ যৌবনে বেশ কয়েকবছর মৌসুমি ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। পরবর্তীকালে, আমার চান্দু চাচাও এমনই একজন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন এবং শহরের অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর বেশ প্রতিযোগিতা ছিল। তিনি ছিলেন ব্যবসাঅন্ত প্রাণ; কৃষিতে তাঁর আগ্রহ ছিল না। মাঝে মধ্যে তিনি পেঁয়াজ ও মরিচের কচি চারাগাছের যত্ন নিতে নিতে নিজের পুরোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতেন। আমার চাচা ও তাঁর স্ত্রীর কোনো সন্তানাদি ছিল না— কিন্তু তাই বলে তাঁরা যে অসুখী ছিলেন তা নয়। কয়েকজন ব্যবসায়িক অংশীদার তাঁদের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে বলেও তাঁদের তেমন কোনো আফসোস ছিল না। আমার মনে আছে, তাঁরা আমাকে গ্রামে যারা ধনী হয়েছিল আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাঁদের গল্প বলতেন। আমার এ-ও মনে পড়ে, ব্যবসা থেকে কার্যত অবসর নেওয়ার পরেও আমার চাচা বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন।
আমাদের এলাকায় শিক্ষিত কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা বার্মায় কাজ করতেন। তবে তাঁরা স্ত্রী-সন্তানদের সেখানে নিয়ে যাননি। তাঁরা ছিলেন গ্রামের এক ধরনের অনুপস্থিত মধ্যবিত্ত—তাঁদের কথা মনে রাখা হতো, তাঁদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে তাঁরা যখন অল্প সময়ের জন্য দেখা করতে আসতেন কেবল সেই সময় ছাড়া তাঁদের দেখা মিলত না। ব্রিটিশ ও ভারতীয় মালিকানাধীন ব্যবসা-উদ্যোক্তারা রেঙ্গুন ও মান্দালয়ে বসতি স্থাপন করায় দেশে নতুন নতুন স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে ওঠে। কেরানি, শিক্ষক, ডাক্তার ও ব্যবসায়ীর চাহিদা দিন দিন বেড়ে চললেও বার্মায় সেসব স্থান পূরণ করার মতো যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ ছিল না। রেলপথের বিস্তারের ফলে, চাকরির খোঁজে কলকাতায় যাওয়ার চেয়ে চট্টগ্রাম হয়ে বার্মায় যাওয়াটা এক অর্থে সহজ হয়ে গিয়েছিল!
বার্মায় বসবাসকারী বাঙালি অভিবাসীদের নিয়ে রচিত প্রচুর গল্প-কাহিনি রয়েছে এবং আমার প্রজন্মের পাঠকরা সেসব গল্প খুব পছন্দ করত। আমি শুনেছিলাম, আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক নীরেন্দ্র চন্দ্র সেন কালিগঞ্জে আসার আগে বার্মায় শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। বার্মায় কর্মরত একজন ভদ্রলোক সম্পর্কে আমি কিছু কথা জানতাম—তাঁর ছেলে আমার সহপাঠী ছিল। তিনি আমাদেরকে ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে বার্মা থেকে তাঁর বাবার পালিয়ে আসার ভয়ংকর কাহিনি বলেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের বার্মা আক্রমণ ও দখলের পর থেকে সেদেশ থেকে পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেনাবাহিনীতে আমার নিজেরও এক জ্ঞাতি ভাই ছিলেন; জাপানি সেনাবাহিনীর হাতে রেঙ্গুনের পতন হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। একদিন সন্ধ্যাবেলায়, অন্ধকার নামার আগে আগে, হঠাৎ করে একমুখ দাড়ি নিয়ে, ক্লান্ত-ক্ষুধার্ত কলেবরে কোত্থেকে যেন এসে উদয় হলেন তিনি! পরে আমার সেই জ্ঞাতি ভাই আমাদেরকে তাঁর জীবনের সেসব অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন।
আমার একথাও মনে আছে যে, আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে আরও বেশ কয়েকজন যুবক আগেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বার্মা থেকে ফিরে এসেছিল। নগদ অর্থকড়ি যতটুকু যা জোগাড় করতে পেরেছিল, তাই দিয়ে বাজারে তাঁরা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিল, চাষবাসে ফিরে না গিয়ে। তবে আমার সেই জ্ঞাতি ভাই সেনাবাহিনীতেই ফিরে গিয়েছিলেন। এরা ছিলেন সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মের অংশ, গ্রামীণ নেতৃত্বে তাঁরা নতুন রক্তের সঞ্চার করেছিলেন।
মাঝে মধ্যেই আমি আমার বাবা-মা, বিভিন্ন শিক্ষক এবং চাচাদের বলতে শুনেছি যে, ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে যখন একদল শিক্ষিত মুসলমান যুবক ঘর-গেরস্থালি আর সনাতনী চাষাবাদের বাইরে নতুন সুযোগের সন্ধান করছিল, তার মধ্যে দিয়েই গ্রামে-গঞ্জে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভ্রূণাকারে জন্মলাভ করে। ঘর-বাড়ি ও গ্রামের বাইরে এ ধরনের উদ্যোগগুলো দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত যৌথ পরিবারগুলোর ধীর রূপান্তরের সূচনা করে। এটা ছিল একটি সম্ভাবনাময় সামাজিক গোষ্ঠী, আর এই গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের নিয়ে নতুন ধরনের কল্পনা, নতুন ধরনের চিন্তা-ভাবনা করতেন। যদিও এ দলের অনেকেরই কলেজের কোনো ডিগ্রি ছিল না। আমার বাবা তাঁর নিজের গ্রামেই রয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু অনেকেই নিজেদের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন। যারা ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জে কাজ করতেন, তাঁরা বাসা ভাগাভাগি করে থাকতেন। তবে সপ্তাহ শেষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে বাড়ি চলে যেতেন। তাঁদের বেশিরভাগই শহরে বাড়ি কেনেননি বা বানাননি—শহরে তাঁদের ভাড়া করা ও ভাগাভাগি করে থাকার জায়গাকে বলা হতো ‘বাসা’ (আক্ষরিক অর্থেই পাখির নীড়)। আর গ্রামে তাঁদের পারিবারিক বাসস্থানকে বলা হতো ‘বাড়ি’ (ঘর)—আবেগের দিক থেকে, সেটা ছিল এক টুকরো জমির উপর তৈরি করা বাড়ির চেয়েও অতিরিক্ত কিছু!
আমাদের এলাকার দু-একজন থেকে শুরু করে প্রায় বারোজন পুরুষ, যাঁদের অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, এ ধরনের গতানুগতিক যৌথ বাসায় থাকতেন। তাঁদের খুব অল্প দুয়েকজনই স্ত্রীদের সেখানে নিয়ে যেতেন। একজন পরিচারিকা রান্না-বাড়া ও ঘরের কাজ করতেন—তাঁকে ‘মামা বলে ডাকা হতো, আর সেটা ছিল সমসাময়িক ঢাকা শহরের একটি পুরোনো এবং স্পষ্টতই বিলুপ্তপ্রায় গার্হস্থ্য প্রথা। আমার বাবা ঢাকা গেলে এই ধরনের একটি বাসায় দু-এক রাত কাটাতেন, যেখানে আমাদের পাশের গ্রাম থেকে আসা তাঁর এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু থাকতেন এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে পেশকার হিসেবে কাজ করতেন।
পাশের গ্রামের এক ভদ্রলোকের ‘সাদু খানের হোটেল’ নামে একটি সাদামাটা থাকার জায়গা ছিল। মামলা-মোকদ্দমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, এবং অন্যান্য কাজে শহরে যাওয়া আইনজীবী, শিক্ষক, তালুকদার, গ্রামবাসী, মামলাকারী এবং ছাত্রদের জন্য সেটা ছিল জনপ্রিয় একটি থাকার জায়গা। সেটার ঠিকানা জানলেও, আমি থাকিনি সেখানে কখনো; আমার বয়োজ্যেষ্ঠদের বিভিন্ন বর্ণনা ছাড়াও অন্তত একটি আত্মজীবনীতে সেই নিরীহদর্শন হোটেলটির কথা স্মরণ করা হয়েছে; সেটির রচয়িতা ছিলেন আমাদের পাশের গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক/লেখক।

দক্ষতার বিচারে বলতে গেলে, আমাদের এলাকার সবচেয়ে বয়স্ক ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন একজন চিকিৎসক। তিনি ১৮৯০-এর দশকে ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল থেকে প্রথম মুসলমান হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। সম্ভবত ১৯৩০-এর দশকে সিভিল সার্জন হিসেবে অবসর নেন। তিনি আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৪ মাইল দূরের একটি খানদানি পরিবারের সদস্য ছিলেন, এবং অবসর জীবনের শেষ বছরগুলো পৈতৃক বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন। শুনেছি, ১৯৩০-এর দশকে তিনি ঢাকার মুসলমান নেতাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন।
যখন তিনি গ্রামের বাড়িতে এসে থিতু হন, তখন তিনি একজন প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক। গোটা অঞ্চলের মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি যখন আমাদের গ্রামে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, তখন তাঁর বয়স আশির ওপরে হলেও তিনি ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতেন। মাঝেমধ্যে আমার বাবার খোঁজ নিতে আমাদের বাড়িতেও আসতেন। তাঁর ছেলেও চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৯৪০-এর দশকে কালিগঞ্জ শহরে চলে যান। আমার পিতৃকুলের মুসলমানদের মধ্যে তাঁকে একজন সম্মানিত ভদ্রলোক হিসেবে গণ্য করা হতো। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল।
আমাদের কাছের এক গ্রামে আরেকজন ডাক্তার ছিলেন, যিনি আমার বাবার সহপাঠী ছিলেন। তিনি তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন জেলায় সরকারি ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আমার মনে পড়ে, তিনি যখন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন তিনি জনস্বাস্থ্য সেবা থেকে অবসরপ্রাপ্ত; স্থানীয় মুসলমান অভিজাত সমাজে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন আদরণীয় ব্যক্তি ।
কাছের গ্রামগুলোতে কয়েকজন মুসলমান মোক্তার ছিলেন। তাঁরা নিকটতম দুই শহরাঞ্চল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালতে আইন পেশায় কর্মরত ছিলেন। আমার বাবার সমসাময়িক আমাদের এক আত্মীয় ছিলেন—আমার মায়ের এক জ্ঞাতি বোনের স্বামী—তিনি ওকালতি করার জন্য কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে বাড়ি ফিরে আসেন এবং আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরের একটি স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন। আমার মনে পড়ে, তরুণ মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ দেওয়ার কারণে লোকে তাঁকে বেশ শ্রদ্ধা করত। আমাদের এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বেশ কয়েকজন মুসলমান ব্যবসায়ী ও বণিক কাছের শহরগুলোতে এবং লক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত বড় বন্দর নারায়ণগঞ্জে পাট, চাল ও ডালের পাইকারি ব্যবসা করতেন। এই ধরনের উদ্যোক্তারা বড় বড় দেশী নৌকা ভাড়া করে উত্তরের বাজারগুলোতে যেতেন। যেখান থেকে সস্তায় পাট ও চাল কিনে আমাদের শহরে এনে লাভজনক মূল্যে বিক্রি করতেন; পাট ব্যবসায়ীরা সাধারণত তাঁদের পণ্য নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যেতেন।
মহাজনি ব্যবসা শুরুর আগে আমার পিতামহ যৌবনে বেশ কয়েকবছর মৌসুমি ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। পরবর্তীকালে, আমার চান্দু চাচাও এমনই একজন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন এবং শহরের অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর বেশ প্রতিযোগিতা ছিল। তিনি ছিলেন ব্যবসাঅন্ত প্রাণ; কৃষিতে তাঁর আগ্রহ ছিল না। মাঝে মধ্যে তিনি পেঁয়াজ ও মরিচের কচি চারাগাছের যত্ন নিতে নিতে নিজের পুরোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতেন। আমার চাচা ও তাঁর স্ত্রীর কোনো সন্তানাদি ছিল না— কিন্তু তাই বলে তাঁরা যে অসুখী ছিলেন তা নয়। কয়েকজন ব্যবসায়িক অংশীদার তাঁদের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে বলেও তাঁদের তেমন কোনো আফসোস ছিল না। আমার মনে আছে, তাঁরা আমাকে গ্রামে যারা ধনী হয়েছিল আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাঁদের গল্প বলতেন। আমার এ-ও মনে পড়ে, ব্যবসা থেকে কার্যত অবসর নেওয়ার পরেও আমার চাচা বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন।
আমাদের এলাকায় শিক্ষিত কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা বার্মায় কাজ করতেন। তবে তাঁরা স্ত্রী-সন্তানদের সেখানে নিয়ে যাননি। তাঁরা ছিলেন গ্রামের এক ধরনের অনুপস্থিত মধ্যবিত্ত—তাঁদের কথা মনে রাখা হতো, তাঁদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে তাঁরা যখন অল্প সময়ের জন্য দেখা করতে আসতেন কেবল সেই সময় ছাড়া তাঁদের দেখা মিলত না। ব্রিটিশ ও ভারতীয় মালিকানাধীন ব্যবসা-উদ্যোক্তারা রেঙ্গুন ও মান্দালয়ে বসতি স্থাপন করায় দেশে নতুন নতুন স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে ওঠে। কেরানি, শিক্ষক, ডাক্তার ও ব্যবসায়ীর চাহিদা দিন দিন বেড়ে চললেও বার্মায় সেসব স্থান পূরণ করার মতো যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ ছিল না। রেলপথের বিস্তারের ফলে, চাকরির খোঁজে কলকাতায় যাওয়ার চেয়ে চট্টগ্রাম হয়ে বার্মায় যাওয়াটা এক অর্থে সহজ হয়ে গিয়েছিল!
বার্মায় বসবাসকারী বাঙালি অভিবাসীদের নিয়ে রচিত প্রচুর গল্প-কাহিনি রয়েছে এবং আমার প্রজন্মের পাঠকরা সেসব গল্প খুব পছন্দ করত। আমি শুনেছিলাম, আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক নীরেন্দ্র চন্দ্র সেন কালিগঞ্জে আসার আগে বার্মায় শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। বার্মায় কর্মরত একজন ভদ্রলোক সম্পর্কে আমি কিছু কথা জানতাম—তাঁর ছেলে আমার সহপাঠী ছিল। তিনি আমাদেরকে ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে বার্মা থেকে তাঁর বাবার পালিয়ে আসার ভয়ংকর কাহিনি বলেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের বার্মা আক্রমণ ও দখলের পর থেকে সেদেশ থেকে পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেনাবাহিনীতে আমার নিজেরও এক জ্ঞাতি ভাই ছিলেন; জাপানি সেনাবাহিনীর হাতে রেঙ্গুনের পতন হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। একদিন সন্ধ্যাবেলায়, অন্ধকার নামার আগে আগে, হঠাৎ করে একমুখ দাড়ি নিয়ে, ক্লান্ত-ক্ষুধার্ত কলেবরে কোত্থেকে যেন এসে উদয় হলেন তিনি! পরে আমার সেই জ্ঞাতি ভাই আমাদেরকে তাঁর জীবনের সেসব অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন।
আমার একথাও মনে আছে যে, আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে আরও বেশ কয়েকজন যুবক আগেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বার্মা থেকে ফিরে এসেছিল। নগদ অর্থকড়ি যতটুকু যা জোগাড় করতে পেরেছিল, তাই দিয়ে বাজারে তাঁরা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিল, চাষবাসে ফিরে না গিয়ে। তবে আমার সেই জ্ঞাতি ভাই সেনাবাহিনীতেই ফিরে গিয়েছিলেন। এরা ছিলেন সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মের অংশ, গ্রামীণ নেতৃত্বে তাঁরা নতুন রক্তের সঞ্চার করেছিলেন।
মাঝে মধ্যেই আমি আমার বাবা-মা, বিভিন্ন শিক্ষক এবং চাচাদের বলতে শুনেছি যে, ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে যখন একদল শিক্ষিত মুসলমান যুবক ঘর-গেরস্থালি আর সনাতনী চাষাবাদের বাইরে নতুন সুযোগের সন্ধান করছিল, তার মধ্যে দিয়েই গ্রামে-গঞ্জে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভ্রূণাকারে জন্মলাভ করে। ঘর-বাড়ি ও গ্রামের বাইরে এ ধরনের উদ্যোগগুলো দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত যৌথ পরিবারগুলোর ধীর রূপান্তরের সূচনা করে। এটা ছিল একটি সম্ভাবনাময় সামাজিক গোষ্ঠী, আর এই গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের নিয়ে নতুন ধরনের কল্পনা, নতুন ধরনের চিন্তা-ভাবনা করতেন। যদিও এ দলের অনেকেরই কলেজের কোনো ডিগ্রি ছিল না। আমার বাবা তাঁর নিজের গ্রামেই রয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু অনেকেই নিজেদের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন। যারা ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জে কাজ করতেন, তাঁরা বাসা ভাগাভাগি করে থাকতেন। তবে সপ্তাহ শেষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে বাড়ি চলে যেতেন। তাঁদের বেশিরভাগই শহরে বাড়ি কেনেননি বা বানাননি—শহরে তাঁদের ভাড়া করা ও ভাগাভাগি করে থাকার জায়গাকে বলা হতো ‘বাসা’ (আক্ষরিক অর্থেই পাখির নীড়)। আর গ্রামে তাঁদের পারিবারিক বাসস্থানকে বলা হতো ‘বাড়ি’ (ঘর)—আবেগের দিক থেকে, সেটা ছিল এক টুকরো জমির উপর তৈরি করা বাড়ির চেয়েও অতিরিক্ত কিছু!
আমাদের এলাকার দু-একজন থেকে শুরু করে প্রায় বারোজন পুরুষ, যাঁদের অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, এ ধরনের গতানুগতিক যৌথ বাসায় থাকতেন। তাঁদের খুব অল্প দুয়েকজনই স্ত্রীদের সেখানে নিয়ে যেতেন। একজন পরিচারিকা রান্না-বাড়া ও ঘরের কাজ করতেন—তাঁকে ‘মামা বলে ডাকা হতো, আর সেটা ছিল সমসাময়িক ঢাকা শহরের একটি পুরোনো এবং স্পষ্টতই বিলুপ্তপ্রায় গার্হস্থ্য প্রথা। আমার বাবা ঢাকা গেলে এই ধরনের একটি বাসায় দু-এক রাত কাটাতেন, যেখানে আমাদের পাশের গ্রাম থেকে আসা তাঁর এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু থাকতেন এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে পেশকার হিসেবে কাজ করতেন।
পাশের গ্রামের এক ভদ্রলোকের ‘সাদু খানের হোটেল’ নামে একটি সাদামাটা থাকার জায়গা ছিল। মামলা-মোকদ্দমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, এবং অন্যান্য কাজে শহরে যাওয়া আইনজীবী, শিক্ষক, তালুকদার, গ্রামবাসী, মামলাকারী এবং ছাত্রদের জন্য সেটা ছিল জনপ্রিয় একটি থাকার জায়গা। সেটার ঠিকানা জানলেও, আমি থাকিনি সেখানে কখনো; আমার বয়োজ্যেষ্ঠদের বিভিন্ন বর্ণনা ছাড়াও অন্তত একটি আত্মজীবনীতে সেই নিরীহদর্শন হোটেলটির কথা স্মরণ করা হয়েছে; সেটির রচয়িতা ছিলেন আমাদের পাশের গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক/লেখক।
.png)

১৯৯৫ সালে অ্যামাজন প্রথম যে পণ্যটি বিক্রি করেছিল, সেটি ছিল ডগলাস হফস্ট্যাডারের লেখা বই ‘ফ্লুইড কনসেপ্টস অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ’। তিন দশক পর সেই অনলাইন বইয়ের দোকানটির বাজারমূল্য ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসেই প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করেছে ২০০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য
৬ ঘণ্টা আগে
হুমায়ুন আজাদের বহুল আলোচিত এই উক্তিগুলো পাওয়া যায় ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ’ বইয়ে। কিন্তু বইটি কেবল এমন কিছু আপাত-নিরীহ অথচ গভীর সত্য উচ্চারণে ভরা—এমনটা ভাবলে ভুল হবে। বইয়ের পাঁচ নম্বর প্রবচনেই পাঠক থমকে যেতে পারেন। সেখানে লেখা, ‘শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে।
৯ ঘণ্টা আগে
হোমারের লেখা মহাকাব্য ‘ওডিসি’র প্রধান চরিত্র ওডিসিউস বাড়ি ফেরার পর তার বিশ্বস্ত কুকুর আর্গোস তাকে চিনতে পারে। তাদের পুনর্মিলনের এই আবেগঘন দৃশ্যটি বর্ণনা করতে হোমার ব্যবহার করেছেন মাত্র প্রায় ৪০টি লাইন। অথচ এটি পুরো মহাকাব্যের অন্যতম আবেগঘন ঘটনা। মহাকাব্যের এই দৃশ্যটি পর্দায় নতুন করে তুলে ধরেছেন
১১ আগস্ট ২০২৬
পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত বন্য প্রাণীগুলোর একটি সিংহ। ছোটবেলা থেকেই গল্প, সিনেমা আর ছবিতে আমরা তাকে দেখে এসেছি বনের রাজা হিসেবে। তার গর্জন, কেশর আর রাজকীয় উপস্থিতি যেন আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। ‘বনের রাজা’কে বিশ্ব সিংহ দিবসের পরের দিন একটু অন্যভাবে চেনা যাক।
১১ আগস্ট ২০২৬