কেউ দেখাচ্ছেন জুতা, কেউ খুঁজছেন প্রেম: কী আছে ‘মুসাফির ক্যাফে’ ওয়েব সিরিজে

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘মুসাফির ক্যাফে’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচিত ওয়েব সিরিজ। কেউ স্ক্রিনের সামনে জুতা তুলে ধরছেন, কেউ বলছেন অসমাপ্ত ভালোবাসার নির্মল উপাখ্যান। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মুসাফির ক্যাফেতে আসলে কী আছে? আর যদি স্পয়লার এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে এখানেই থেমে যাওয়া ভালো।

কেউ দেখাচ্ছেন জুতা, কেউ খুঁজছেন প্রেম: কী আছে ‘মুসাফির ক্যাফে’ সিরিজে। স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘মুসাফির ক্যাফে’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচিত ওয়েব সিরিজ। কেউ স্ক্রিনের সামনে জুতা তুলে ধরছেন, কেউ বলছেন অসমাপ্ত ভালোবাসার নির্মল উপাখ্যান। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মুসাফির ক্যাফেতে আসলে কী আছে? আর যদি স্পয়লার এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে এখানেই থেমে যাওয়া ভালো।

ফেসবুকের অ্যালগরিদম জিনিসটা আমার একদমই ভালো লাগে না। কোনো পোস্টে দুই সেকেন্ড বেশি তাকালেন! ব্যস, এরপর আর রক্ষা নেই। যতই এড়াতে চান, একই ধরনের পোস্ট বারবার সামনে আসবেই।

দিন দুয়েক আগে কৌতূহলবশত চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ফেসবুক গ্রুপে ‘মুসাফির ক্যাফে’ নিয়ে রিভিউ পড়েছিলাম। ভুলটা সেখানেই করেছি। তারপর থেকে নিউজফিড খুললেই শুধু মুসাফির ক্যাফে—রিভিউ, আলোচনা, সমালোচনা। মনে হচ্ছে, রাতারাতি ফেসবুক যেন ভরে গেছে অতীত ভুলতে না পারা প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বঘোষিত মনোবিজ্ঞানী, সম্পর্ক-বিশেষজ্ঞ আর মানব চরিত্র বিশ্লেষকদের দিয়ে।

এই সিরিজ নিয়ে ফেসবুকে ‘রিয়্যাকশন’ পোস্টের কয়েকটি ছবি দেখে বেশ মজা পেলাম। কয়েকজন দর্শক একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যের সামনে জুতা তুলে ধরেছেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। পোস্টে অনেক মানুষ সেই 'জুতার' পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া লোকের সংখ্যাও কম নয়। তবে আমি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে না থেকে নিরপেক্ষ অবস্থানে গিয়ে ছবির সেই জুতার দিকে তাকিয়ে বিচার করছি, কার জুতা বেশি সুন্দর।

ফেসবুক পোস্ট
ফেসবুক পোস্ট

কোনো সিনেমা, নাটক বা ওয়েব সিরিজ ফেসবুকে আলোচনায় এলে সাধারণত দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, যারা এখনো দেখেনি, তাঁরা চারদিকে এত আলোচনা শুনে শেষ পর্যন্ত দেখে ফেলে। আর যারা দেখে ফেলেছেন, তাঁরা দর্শক থেকে রাতারাতি সমালোচক হয়ে যান। এরপর শুরু হয় ফেসবুক আদালত। মনে হয়, আর একটু পরই কেউ বিচারকের মতো টেবিলে হাতুড়ি ঠুকে বলে উঠবে, ‘অর্ডার, অর্ডার!’

তবে এর আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক, মুসাফির ক্যাফে-তে আসলে কী আছে। আর যদি স্পয়লার এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে এখান থেকেই নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারেন।

চুমুক দিন ‘মুসাফির ক্যাফে’-র কফিতে

‘মুসাফির ক্যাফে’ চিরাচরিত ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। কেউ ভালোবাসাকে স্মৃতি বানিয়ে এগিয়ে যায়, কেউ আবার স্মৃতিকেই নিজের বর্তমান বানিয়ে ফেলে। আবার কেউ অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানকে বুকে ধরে ভালোবেসে যায়, নিঃশব্দে।

সিরিজের প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিক্রান্ত ম্যাসি, বেদিকা পিন্টো ও মাহিমা মাকওয়ানা।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে চন্দর। তার জীবনে আসে সুধা। সবকিছু ঠিকই চলছিল। এক পর্যায়ে স্বপ্ন, ক্যারিয়ার আর দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতিবিহীন সম্পর্কের ‘প্রতিশ্রুতি’ রাখতে সুধা সরে যায়। কিন্তু চন্দর আর প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে না।

পর্দায় সবার জন্য একই গল্প চলছে, কিন্তু প্রত্যেকে সেটি দেখছেন নিজের জীবন, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার আলোয়। কে ঠিক, কে ভুল কিংবা চন্দর শেষ পর্যন্ত কার হাত ধরবে, তার উত্তরও এই সিজনে পাওয়া যাবে না। তাই, উত্তরহীন নানা প্রশ্ন নিয়ে এখন অপেক্ষা পরের সিজনের।

দুজনের স্বপ্ন আলাদা, প্রায়োরিটি আলাদা। ফলাফল, বিচ্ছেদ। সুধা চলে গেলেও চন্দর মনে মনে থেকে যায় সেই অসমাপ্ত সম্পর্কের ভেতর। এরপর গল্পে আসে প্রীতি। শান্ত, সংযত, ধৈর্যশীল মেয়ে। সে চন্দরকে ভালোবাসে। তার যত্ন নেয়, সব পরিস্থিতিতে পাশে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, যার পাশে সে দাঁড়িয়ে আছে, তার হৃদয়ের একটা অংশ এখনো অন্য কারও জন্য সংরক্ষিত। প্রীতি সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। চন্দর এই সম্পর্কের ভেতরে থেকেও বুকের মধ্যে পোষে হলুদ একটা পাতার দীর্ঘশ্বাস। এই টানাপোড়েনই শেষ পর্যন্ত দর্শকদের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হয়ে ওঠে। কেউ কেউ আবার এই মানসিক টানাপোড়েনের সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছেন।

‘চন্দরের উচিত ছিল অরিজিৎ সিং-এর গান শুনে কান্নাকাটি করা’

মুসাফির ক্যাফে নিয়ে শুধু আলোচনা নয়, চরিত্রগুলোকে নিয়ে কাটা-ছেঁড়া বিশ্লেষণেও বসে পড়েছেন কেউ কেউ। তবে গালমন্দের ভাগটা চন্দরের দিকেই বেশি।

ফেসবুকে একদল বলছে, চন্দর একটা ‘রেড ফ্ল্যাগ’। যে মানুষ নিজের অতীতের ভালোবাসা ভুলতেই পারেনি, তার অন্য কারও জীবনে জায়গা নেওয়ার অধিকার নেই। এখনও যদি সুধাকেই ভালোবাসে, তাহলে প্রীতির সঙ্গে সম্পর্কে জড়াল কেন? একজন তো ফেসবুকে লিখেই ফেলেছেন, ‘পুরোনো প্রেম ভুলতে না পারলে ভাই, অরিজিৎ সিং-এর গান শুনে কান্নাকাটি কর। কিন্তু আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্কে গিয়ে এক্সকে ভুলতে না পারার নাটক করিস না।’

সিনেমার একটি দৃশ্য।
সিনেমার একটি দৃশ্য।

অন্যদিকে আরেক দল ক্ষোভ ঝাড়ছে সুধার ওপর। তাঁদের প্রশ্ন, সত্যিই যদি ভালোবাসতে, তাহলে মাঝপথে মানুষটাকে রেখে চলে গেলে কেন? নিজের স্বপ্ন আর ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দেওয়া অবশ্যই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কয়েক বছর পরে আবার ফিরে এসে ‘ক্লোজার’ দিতে চাওয়ার মানে কী? অনেকের ধারণা, সুধা এসেছেন চন্দর আর প্রীতির ঘর ভাঙতে।

তবে তৃতীয় একটি দলও আছে। তাঁরা ভাবুক, কোনো পক্ষেই নেই। তাঁদের মতে, জীবনের সব গল্প যুক্তি দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের বুকের ভেতরে প্রথম প্রেমের জন্য হয়তো কিছুটা আক্ষেপ থেকে যেতে পারে। তবে সেটাও সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। সবকিছু নির্ভর করে সেই সম্পর্কটি কেমন ছিল, কীভাবে শেষ হয়েছিল, আর সেই স্মৃতি মানুষটিকে কতটা বদলে দিয়েছিল।

চন্দর, সুধা ‘ভালো না খারাপ’-এর উত্তর দিচ্ছে আমাদের জীবন

মুসাফির ক্যাফে-র একই চরিত্রকে একজন ‘টক্সিক’ বলছেন, আরেকজন বলছেন ‘এমনটা হতেই পারে’। কেউ চন্দর-সুধার স্ক্রিনে থাকা দৃশ্যের সামনে জুতা প্রদর্শন করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করছেন, আবার কেউ বলছেন দারুণ রোমান্টিক ড্রামা। একই দৃশ্য দেখে একজনের রাগ হচ্ছে, আরেকজনের চোখে পানি আসছে। একই সংলাপ একজনের কাছে চরম বিরক্তিকর, আরেকজনের কাছে সত্যিকারের ভালোবাসা। কেন এমন হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মনোবিজ্ঞানের একটি পরিচিত তত্ত্ব সামনে আসে। ১৯৫৭ সালে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গার তাঁর ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’ বা মানসিক দ্বন্দ্ব তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, মানুষের বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে সে মানসিক অস্বস্তি অনুভব করে। সেই অস্বস্তি কমাতে মানুষ ঘটনাগুলোকে নিজের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।

মুসাফির ক্যাফের দর্শকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমনই। ধরুন, কোনো দর্শক বাস্তব জীবনে প্রীতির মতো কাউকে কষ্ট পেতে দেখেছেন। তিনি চন্দরের আচরণে প্রতারণাই দেখবেন। আবার কেউ হয়তো নিজের জীবনে এমন একজনকে হারিয়েছেন, যাকে কখনো ভুলতে পারেননি। তাঁর কাছে চন্দরের অপেক্ষা স্বার্থপরতা নয়, ভালোবাসারই আরেকটি রূপ। আবার যিনি নিজের ক্যারিয়ারের জন্য সম্পর্ক ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তিনি হয়তো সুধার সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করবেন না।

অর্থাৎ পর্দায় সবার জন্য একই গল্প চলছে, কিন্তু প্রত্যেকে সেটি দেখছেন নিজের জীবন, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার আলোয়। কে ঠিক, কে ভুল কিংবা চন্দর শেষ পর্যন্ত কার হাত ধরবে, তার উত্তরও এই সিজনে পাওয়া যাবে না। তাই, উত্তরহীন নানা প্রশ্ন নিয়ে এখন অপেক্ষা পরের সিজনের।

Ad 300x250

সম্পর্কিত