আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর—৩
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি ও স্কাল্পচার পার্ক। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর’। আজ প্রকাশিত হলো এর তৃতীয় পর্ব। এ পর্বে থাকছে একক কোনো শিল্পীর তৈরি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য উদ্যান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। চোখ রাখুন প্রতি রোববার বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
তৌহিন হাসান

আশপাশে কত মানুষ। কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আলিঙ্গনে আবদ্ধ, আবার কেউ একান্ত আলাপে মগ্ন। কিন্তু সবাই জড়, স্থির এবং বছরের পর বছর একই অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৮০ একর জায়গাজুড়ে, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কেউ গ্রানাইট পাথরে গড়া, কেউ ব্রোঞ্জের, আবার কেউ লোহার তৈরি। প্রতিটি ভাস্কর্যের অভিব্যক্তি আলাদা, আর এমন ভাস্কর্য রয়েছে দুই শতাধিক। আবার সব ভাস্কর্য মিলে একটি মাত্র ‘একক শিল্পকর্ম’-যা ‘ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক’ নামে পরিচিত। এটি বিশ্বের একক কোনো শিল্পীর তৈরি সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য উদ্যান। এর স্রষ্টা নরওয়ের বিখ্যাত ভাস্কর্যশিল্পী গুস্তাভ ভিগল্যান্ড (১৮৬৯–১৯৪৩)।
নরওয়েতে শীতের দিনগুলো ছোট। বিকেল ফুরোবার আগেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। তার আগেই হাজির হলাম পার্কের গেটের সামনে। রাজধানী শহর অসলো খুব বেশি বড় নয়। ট্রামে চড়ে (যদিও এখানে কোনো ট্যুরিস্ট ট্রাম নেই) ঘণ্টাখানেকেই পুরো শহর ঘুরে দেখা যায়। ট্রামগুলো একমুখী পথে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যায়, তারপর আবার ফিরে আসে। ১২ নম্বর ট্রামে চড়ে মেজরস্তুয়েন থেকে ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্কে যেতে প্রায় ২৫ মিনিট সময় লাগে। মেজরস্তুয়েন অসলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট জংশন, যেখান থেকে বিভিন্ন ট্রাম ও বাস শহরের নানা প্রান্তে চলাচল করে।
ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক মূলত ফ্রগনার পার্কেরই একটি অংশ। ১৯১৯ সালে অসলো সিটি কাউন্সিল ভাস্কর্যশিল্পী গুস্তাভ ভিগল্যান্ডকে একটি স্টুডিও উপহার দেয়। বিনিময়ে শিল্পী তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকর্ম শহরের মানুষের জন্য উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেন। এই চুক্তিই ইতিহাসের এক অসাধারণ শিল্প প্রকল্পের সূচনা করে। কয়েক দশক ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে ভিগল্যান্ড গড়ে তোলেন এই উন্মুক্ত ভাস্কর্য উদ্যান, যেখানে প্রতিটি ভাস্কর্য যেন মানুষের জীবনের গল্প বলে।

১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রোঞ্জ, গ্রানাইট ও লোহায় নির্মাণ করেন দুই শরও বেশি ভাস্কর্য। এগুলোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনার প্রতিফলন নেই। বরং এগুলো মানুষের সার্বজনীন অনুভূতি, যেমন ভালোবাসা, ক্রোধ, আনন্দ, হতাশা, সংগ্রাম এবং মৃত্যুর অনিবার্যতাকে একত্রে তুলে ধরে।
পার্কে প্রবেশের মুখেই রয়েছে একটি ব্রিজ। হেঁটে হেঁটে ব্রিজটি পার হতে গিয়ে তার দুপাশে দেখা যাবে প্রায় পঞ্চাশটি দণ্ডায়মান ভাস্কর্য। এগুলোর সব ব্রোঞ্জের তৈরি। স্কাল্পচার পার্কের এই অংশটি ‘দ্য ব্রিজ’ নামে পরিচিত। এখানেই রয়েছে পার্কের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলোর একটি—‘অ্যাংরি বয়’।
ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্কের মূল আকর্ষণ হলো এর কেন্দ্রস্থলে গোলাকার বেদীতে স্থাপিত ‘দ্য মনোলিথ’ ভাস্কর্য। ‘মনোলিথ’ শব্দের অর্থ একটিমাত্র বিশাল পাথর। নামের মতোই পুরো ভাস্কর্যটি একটি অবিচ্ছিন্ন গ্রানাইট পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে।

১৯২২ সালে আইডেফিওর্ডেন অঞ্চলের একটি খনি থেকে বিশাল এই গ্রানাইট পাথরটি সমুদ্রপথে অসলোতে আনা হয়। পাথরটি এতটাই ভারী ছিল যে পার্কে পৌঁছাতে বিশেষ ক্রেন ও পরিবহনের প্রয়োজন হয়েছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পাথরটিকে কোনো অংশে ভাঙা হয়নি। একটি মাত্র পাথর খোদাই করেই শিল্পী গড়ে তোলেন এই অনন্য ভাস্কর্য। ১৯২৭ সালে এটি পার্কের নির্ধারিত স্থানে সোজা করে স্থাপন করা হয়।
৪৬ ফুট উঁচু উলম্ব স্তম্ভে ১১২টি মানুষের বিভিন্ন অভিব্যক্তি ও শারীরিক ভঙ্গিকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। এখানে নারী, পুরুষ, শিশু এবং বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মনোলিথ স্তম্ভটির চারপাশে ৩৬টি গ্রানাইট পাথরের ভাস্কর্য রয়েছে, সেগুলোও এই শিল্পের একটি বড় অংশ। এগুলো বৃত্তাকারে সাজানো এবং স্তম্ভটির দিকে মুখ করা। এই মূর্তিগুলো মানুষের জীবনের চক্রকে দেখায়—শৈশবের চপলতা, যৌবনের প্রেম, পারিবারিক জীবনের দায়িত্ব এবং বার্ধক্যের একাকীত্ব ও মৃত্যু।

‘দ্য ফাউন্টেন’ ভাস্কর্যটি ভিগল্যান্ড পার্কের সবচেয়ে পুরোনো এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম। এখানে মানুষের জীবনের চিরন্তন চক্র এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছে। গুস্তাভ ভিগল্যান্ড ১৯০৬ সাল থেকে শুরু করে চার দশক ধরে এই বিশাল ব্রোঞ্জের ফোয়ারাটির নকশা ও নির্মাণ করেন। ফোয়ারার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে বিশালাকার ছয় ব্রোঞ্জের পুরুষ মূর্তি রয়েছে, যারা প্রত্যেকে প্রায় ১০ ফুট লম্বা। তারা মাথার ওপর ৬৫ ফুট চওড়া একটি বিশাল পাত্র ধরে আছে। সেই পাত্র থেকে অবিরাম পানি চারপাশে ঝরে পড়ে, যেন একটানা ঝরনা। শিল্পবোদ্ধাদের মতে, এই প্রবাহমান পানি মানুষের জীবনীশক্তি, উর্বরতা এবং জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
ভিগল্যান্ড পার্কের একদম শেষ প্রান্তে উত্তর দিকে রয়েছে আরেকটি অসাধারণ ভাস্কর্য—‘দ্য হুইল অব লাইফ’। এটি পার্কের প্রধান নকশার একটি চমৎকার অংশ। পুরো ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি। এটি একটি বিশাল বৃত্ত বা চাকার মতো, যার ব্যাস প্রায় ১০ ফুট। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, চাকাটি যেন শূন্যে ঝুলে আছে। চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও একটি শিশুর শরীর পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে তারা মিলে একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করেছে। বৃত্তের কোনো শুরু বা শেষ নেই।

এখানে মানুষগুলো একে অপরকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন মানবজীবন এক অনন্ত চক্রের অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর আবার নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে জীবনের পুনরাবৃত্তির প্রতীক হিসেবে শিল্পবোদ্ধারা এই ভাস্কর্যটিকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। ভাস্কর্যটি একটি নিচু গ্রানাইট বেদির ওপর স্থাপন করা হয়েছে। চারপাশের চত্বরও এমনভাবে তৈরি, যাতে দর্শনার্থীরা সব দিক থেকে ঘুরে ঘুরে এটি দেখতে পারেন। গুস্তাভ ভিগল্যান্ড ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে এর মডেল তৈরি করেন। পরে ১৯৪৯ সালে এটি পার্কে স্থাপন করা হয়। এই স্থান থেকে পুরো পার্কের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়।
পার্কের প্রতিটি অংশ যেন জীবনের একেকটি অধ্যায়। প্রবেশপথের সেতুতে শিশুর চঞ্চলতা, ফাউন্টেনে সময়ের প্রবাহ, আর কেন্দ্রস্থলে বিশাল মনোলিথে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা ও সংগ্রাম। এ যেন অসাধারণ প্রতীকী রূপ। শিল্পী ভিগল্যান্ড তাঁর শিল্পে মানুষকে কোনো সামাজিক পরিচয় বা আড়াল ছাড়া উপস্থাপন করেছেন—নগ্ন, সরল এবং সত্য। আর এই সরলতাই তাঁর শিল্পকে দিয়েছে গভীরতা ও সর্বজনীন আবেদন।
১৯৪৩ সালে ভিগল্যান্ড মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের এই উদ্যান তখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ করা হয়। ধীরে ধীরে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্কাল্পচার পার্কে পরিণত হয়। আজ এই পার্কে হাঁটলে মনে হয়, যেন সময় থেমে গেছে। প্রতিটি ভাস্কর্য নীরবে মানুষের গল্প শোনাচ্ছে।

শিল্পী গুস্তাভ ভিগল্যান্ডের জন্ম ১৮৬৯ সালে, নরওয়ের ম্যান্ডাল শহরে। ছোটবেলা থেকেই কাঠ ও ভাস্কর্যের কাজে শিল্পীর আগ্রহ ছিল অসীম। কৈশোরে তিনি অসলো শহরে (তৎকালীন ক্রিস্টিয়ানিয়া) এসে শিল্পচর্চা শুরু করেন। পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ইতালি ভ্রমণ করে শিল্পশিক্ষা নেন। প্রাচীন ভাস্কর্য ও রেনেসাঁ শিল্প তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেললেও, পরিণত বয়সে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। জীবনের শেষ সময় তিনি অসলোতেই কাটান। তাঁর ব্যক্তিগত স্টুডিও এখন ‘ভিগল্যান্ড মিউজিয়াম’ নামে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর। তবে শিল্পীকে দুনিয়াব্যাপী অমর করে রেখেছে তাঁর সৃষ্টি ‘ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক’।
পুরো ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক ঘুরে দেখতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু এতটা সময় আমার হাতে ছিল না। নরওয়ের শীতের দিন খুব ছোট। বিকেল গড়াতেই দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসে। অথচ দেখার বাকি তখনও কত কিছু! নর্ডিক এই দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে শিল্প আর প্রকৃতির অসংখ্য বিস্ময়। দুচোখ ভরে দেখলেও যেন মন ভরে না। তাই দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসার তাড়ায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেখে শেষ করলাম বিশ্বের একক কোনো শিল্পীর তৈরি সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য উদ্যান।
পার্ক থেকে বেরিয়েই আবার ছুট। ধরতে হবে আরেকটি ট্রাম। দেখতে যেতে হবে আরও নতুন কিছু…

আশপাশে কত মানুষ। কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আলিঙ্গনে আবদ্ধ, আবার কেউ একান্ত আলাপে মগ্ন। কিন্তু সবাই জড়, স্থির এবং বছরের পর বছর একই অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৮০ একর জায়গাজুড়ে, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কেউ গ্রানাইট পাথরে গড়া, কেউ ব্রোঞ্জের, আবার কেউ লোহার তৈরি। প্রতিটি ভাস্কর্যের অভিব্যক্তি আলাদা, আর এমন ভাস্কর্য রয়েছে দুই শতাধিক। আবার সব ভাস্কর্য মিলে একটি মাত্র ‘একক শিল্পকর্ম’-যা ‘ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক’ নামে পরিচিত। এটি বিশ্বের একক কোনো শিল্পীর তৈরি সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য উদ্যান। এর স্রষ্টা নরওয়ের বিখ্যাত ভাস্কর্যশিল্পী গুস্তাভ ভিগল্যান্ড (১৮৬৯–১৯৪৩)।
নরওয়েতে শীতের দিনগুলো ছোট। বিকেল ফুরোবার আগেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। তার আগেই হাজির হলাম পার্কের গেটের সামনে। রাজধানী শহর অসলো খুব বেশি বড় নয়। ট্রামে চড়ে (যদিও এখানে কোনো ট্যুরিস্ট ট্রাম নেই) ঘণ্টাখানেকেই পুরো শহর ঘুরে দেখা যায়। ট্রামগুলো একমুখী পথে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যায়, তারপর আবার ফিরে আসে। ১২ নম্বর ট্রামে চড়ে মেজরস্তুয়েন থেকে ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্কে যেতে প্রায় ২৫ মিনিট সময় লাগে। মেজরস্তুয়েন অসলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট জংশন, যেখান থেকে বিভিন্ন ট্রাম ও বাস শহরের নানা প্রান্তে চলাচল করে।
ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক মূলত ফ্রগনার পার্কেরই একটি অংশ। ১৯১৯ সালে অসলো সিটি কাউন্সিল ভাস্কর্যশিল্পী গুস্তাভ ভিগল্যান্ডকে একটি স্টুডিও উপহার দেয়। বিনিময়ে শিল্পী তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকর্ম শহরের মানুষের জন্য উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেন। এই চুক্তিই ইতিহাসের এক অসাধারণ শিল্প প্রকল্পের সূচনা করে। কয়েক দশক ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে ভিগল্যান্ড গড়ে তোলেন এই উন্মুক্ত ভাস্কর্য উদ্যান, যেখানে প্রতিটি ভাস্কর্য যেন মানুষের জীবনের গল্প বলে।

১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রোঞ্জ, গ্রানাইট ও লোহায় নির্মাণ করেন দুই শরও বেশি ভাস্কর্য। এগুলোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনার প্রতিফলন নেই। বরং এগুলো মানুষের সার্বজনীন অনুভূতি, যেমন ভালোবাসা, ক্রোধ, আনন্দ, হতাশা, সংগ্রাম এবং মৃত্যুর অনিবার্যতাকে একত্রে তুলে ধরে।
পার্কে প্রবেশের মুখেই রয়েছে একটি ব্রিজ। হেঁটে হেঁটে ব্রিজটি পার হতে গিয়ে তার দুপাশে দেখা যাবে প্রায় পঞ্চাশটি দণ্ডায়মান ভাস্কর্য। এগুলোর সব ব্রোঞ্জের তৈরি। স্কাল্পচার পার্কের এই অংশটি ‘দ্য ব্রিজ’ নামে পরিচিত। এখানেই রয়েছে পার্কের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলোর একটি—‘অ্যাংরি বয়’।
ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্কের মূল আকর্ষণ হলো এর কেন্দ্রস্থলে গোলাকার বেদীতে স্থাপিত ‘দ্য মনোলিথ’ ভাস্কর্য। ‘মনোলিথ’ শব্দের অর্থ একটিমাত্র বিশাল পাথর। নামের মতোই পুরো ভাস্কর্যটি একটি অবিচ্ছিন্ন গ্রানাইট পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে।

১৯২২ সালে আইডেফিওর্ডেন অঞ্চলের একটি খনি থেকে বিশাল এই গ্রানাইট পাথরটি সমুদ্রপথে অসলোতে আনা হয়। পাথরটি এতটাই ভারী ছিল যে পার্কে পৌঁছাতে বিশেষ ক্রেন ও পরিবহনের প্রয়োজন হয়েছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পাথরটিকে কোনো অংশে ভাঙা হয়নি। একটি মাত্র পাথর খোদাই করেই শিল্পী গড়ে তোলেন এই অনন্য ভাস্কর্য। ১৯২৭ সালে এটি পার্কের নির্ধারিত স্থানে সোজা করে স্থাপন করা হয়।
৪৬ ফুট উঁচু উলম্ব স্তম্ভে ১১২টি মানুষের বিভিন্ন অভিব্যক্তি ও শারীরিক ভঙ্গিকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। এখানে নারী, পুরুষ, শিশু এবং বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মনোলিথ স্তম্ভটির চারপাশে ৩৬টি গ্রানাইট পাথরের ভাস্কর্য রয়েছে, সেগুলোও এই শিল্পের একটি বড় অংশ। এগুলো বৃত্তাকারে সাজানো এবং স্তম্ভটির দিকে মুখ করা। এই মূর্তিগুলো মানুষের জীবনের চক্রকে দেখায়—শৈশবের চপলতা, যৌবনের প্রেম, পারিবারিক জীবনের দায়িত্ব এবং বার্ধক্যের একাকীত্ব ও মৃত্যু।

‘দ্য ফাউন্টেন’ ভাস্কর্যটি ভিগল্যান্ড পার্কের সবচেয়ে পুরোনো এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম। এখানে মানুষের জীবনের চিরন্তন চক্র এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছে। গুস্তাভ ভিগল্যান্ড ১৯০৬ সাল থেকে শুরু করে চার দশক ধরে এই বিশাল ব্রোঞ্জের ফোয়ারাটির নকশা ও নির্মাণ করেন। ফোয়ারার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে বিশালাকার ছয় ব্রোঞ্জের পুরুষ মূর্তি রয়েছে, যারা প্রত্যেকে প্রায় ১০ ফুট লম্বা। তারা মাথার ওপর ৬৫ ফুট চওড়া একটি বিশাল পাত্র ধরে আছে। সেই পাত্র থেকে অবিরাম পানি চারপাশে ঝরে পড়ে, যেন একটানা ঝরনা। শিল্পবোদ্ধাদের মতে, এই প্রবাহমান পানি মানুষের জীবনীশক্তি, উর্বরতা এবং জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
ভিগল্যান্ড পার্কের একদম শেষ প্রান্তে উত্তর দিকে রয়েছে আরেকটি অসাধারণ ভাস্কর্য—‘দ্য হুইল অব লাইফ’। এটি পার্কের প্রধান নকশার একটি চমৎকার অংশ। পুরো ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি। এটি একটি বিশাল বৃত্ত বা চাকার মতো, যার ব্যাস প্রায় ১০ ফুট। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, চাকাটি যেন শূন্যে ঝুলে আছে। চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও একটি শিশুর শরীর পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে তারা মিলে একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করেছে। বৃত্তের কোনো শুরু বা শেষ নেই।

এখানে মানুষগুলো একে অপরকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন মানবজীবন এক অনন্ত চক্রের অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর আবার নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে জীবনের পুনরাবৃত্তির প্রতীক হিসেবে শিল্পবোদ্ধারা এই ভাস্কর্যটিকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। ভাস্কর্যটি একটি নিচু গ্রানাইট বেদির ওপর স্থাপন করা হয়েছে। চারপাশের চত্বরও এমনভাবে তৈরি, যাতে দর্শনার্থীরা সব দিক থেকে ঘুরে ঘুরে এটি দেখতে পারেন। গুস্তাভ ভিগল্যান্ড ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে এর মডেল তৈরি করেন। পরে ১৯৪৯ সালে এটি পার্কে স্থাপন করা হয়। এই স্থান থেকে পুরো পার্কের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়।
পার্কের প্রতিটি অংশ যেন জীবনের একেকটি অধ্যায়। প্রবেশপথের সেতুতে শিশুর চঞ্চলতা, ফাউন্টেনে সময়ের প্রবাহ, আর কেন্দ্রস্থলে বিশাল মনোলিথে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা ও সংগ্রাম। এ যেন অসাধারণ প্রতীকী রূপ। শিল্পী ভিগল্যান্ড তাঁর শিল্পে মানুষকে কোনো সামাজিক পরিচয় বা আড়াল ছাড়া উপস্থাপন করেছেন—নগ্ন, সরল এবং সত্য। আর এই সরলতাই তাঁর শিল্পকে দিয়েছে গভীরতা ও সর্বজনীন আবেদন।
১৯৪৩ সালে ভিগল্যান্ড মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের এই উদ্যান তখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ করা হয়। ধীরে ধীরে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্কাল্পচার পার্কে পরিণত হয়। আজ এই পার্কে হাঁটলে মনে হয়, যেন সময় থেমে গেছে। প্রতিটি ভাস্কর্য নীরবে মানুষের গল্প শোনাচ্ছে।

শিল্পী গুস্তাভ ভিগল্যান্ডের জন্ম ১৮৬৯ সালে, নরওয়ের ম্যান্ডাল শহরে। ছোটবেলা থেকেই কাঠ ও ভাস্কর্যের কাজে শিল্পীর আগ্রহ ছিল অসীম। কৈশোরে তিনি অসলো শহরে (তৎকালীন ক্রিস্টিয়ানিয়া) এসে শিল্পচর্চা শুরু করেন। পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ইতালি ভ্রমণ করে শিল্পশিক্ষা নেন। প্রাচীন ভাস্কর্য ও রেনেসাঁ শিল্প তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেললেও, পরিণত বয়সে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। জীবনের শেষ সময় তিনি অসলোতেই কাটান। তাঁর ব্যক্তিগত স্টুডিও এখন ‘ভিগল্যান্ড মিউজিয়াম’ নামে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর। তবে শিল্পীকে দুনিয়াব্যাপী অমর করে রেখেছে তাঁর সৃষ্টি ‘ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক’।
পুরো ভিগল্যান্ড স্কাল্পচার পার্ক ঘুরে দেখতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু এতটা সময় আমার হাতে ছিল না। নরওয়ের শীতের দিন খুব ছোট। বিকেল গড়াতেই দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসে। অথচ দেখার বাকি তখনও কত কিছু! নর্ডিক এই দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে শিল্প আর প্রকৃতির অসংখ্য বিস্ময়। দুচোখ ভরে দেখলেও যেন মন ভরে না। তাই দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসার তাড়ায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেখে শেষ করলাম বিশ্বের একক কোনো শিল্পীর তৈরি সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য উদ্যান।
পার্ক থেকে বেরিয়েই আবার ছুট। ধরতে হবে আরেকটি ট্রাম। দেখতে যেতে হবে আরও নতুন কিছু…
.png)

ছোটবেলায় মনে হতো বন্ধুদের ছাড়া থাকা একেবারেই অসম্ভব। প্রতিদিন ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে টিফিন খাওয়া, টিফিনের সময় আড্ডা বা ক্লাসের মধ্যে হাসাহাসি করা দিনগুলো যে একদিন ছেড়ে আসতে হবে, তখন তা ভাবিওনি।
৯ মিনিট আগে
১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল। সেদিন যে দেশের মানুষের জন্য গান গাওয়া হয়েছিল, আন্তর্জাতিকভাবে তার অস্তিত্বকেই তখন বিশ্বের বেশিরভাগ শক্তিশালী রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়নি।
২০ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘মুসাফির ক্যাফে’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচিত ওয়েব সিরিজ। কেউ স্ক্রিনের সামনে জুতা তুলে ধরছেন, কেউ বলছেন অসমাপ্ত ভালোবাসার নির্মল উপাখ্যান। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মুসাফির ক্যাফেতে আসলে কী আছে? আর যদি স্পয়লার এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে এখানেই থেমে যাওয়া ভালো।
০১ আগস্ট ২০২৬
১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চমাধ্যমিক শেষ বর্ষের ৭৩ শতাংশ ছেলে এবং ৮৪ শতাংশ মেয়ে ভবিষ্যতে বিয়ে করবে বলে প্রত্যাশা করে। কিন্তু ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সেই প্রবণতা অনেকটাই বদলে গেছে। বিয়ে করতে আগ্রহী মেয়েদের হার কমে ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ছেলেদের মধ্যেও বিয়ের ইচ্ছা কমে
০১ আগস্ট ২০২৬