leadT1ad

একদিনের ছুটি, তবু কেন পরিকল্পনার শেষ নেই

সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে যখনই ছোটখাটো কোনো কাজ সামনে আসে, আমাদের মস্তিষ্ক খুব সহজেই একটি অজুহাত তৈরি করে, আজ থাক শুক্রবারে করব।

স্ট্রিম গ্রাফিক

ছোটবেলায় ছুটির দিন মানেই ছিল দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে নাস্তা করা, দুপুরে মায়ের মজার রান্না আর বিটিভির পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা। ভাগ্য ভালো থাকলে বাবার হাত ধরে ঘুরতে যাওয়াও জুটত কপালে।

কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেকের ছুটির দিনের ধরণ বদলেছে, বদলেছে ছুটির দিনের যাবতীয় কার্যকলাপও। এখন আমার কাছে ছুটির দিন মানেই হলো একরাশ ফেলে রাখা কাজ সারতে হবে, একটু বেশি ঘুমাতে হবে, বাকেট লিস্টে ফেলে রাখা সিনেমাটা দেখতে হবে কিংবা বাসার আলমারিটা গুছিয়ে নিতে হবে। ময়লা কাপড়চোপড়ও ধুতে হবে।

কিন্তু দিন শেষে দেখা যায়, তালিকায় থাকা কাজগুলোর বেশিরভাগই ট্রান্সফার্ড হয়েছে পরের সপ্তাহের ছুটির দিনের 'টু ডু' লিস্টে। আর এখানে মজার ব্যাপার হলো, অবচেতনভাবেই আমাদের মাথায় কাজ করে যে ছুটির দিনটির সময় যেন অন্যদিনের চেয়ে দীর্ঘ। এমন কেন হয়?

সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে যখনই ছোটখাটো কোনো কাজ সামনে আসে, আমাদের মস্তিষ্ক খুব সহজেই একটি অজুহাত তৈরি করে, আজ থাক শুক্রবারে করব। অফিসের কাজের চাপে আমরা দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আর বাড়তি কোনো দায়িত্ব নিতে চাই না। ঘরের যে বাল্বটা নষ্ট হয়ে আছে, যে বইটা শেলফে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে, কিংবা দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে যে ফোনটা দেওয়া দরকার সবকিছুই আমরা ‘ছুটির দিনের কাজ’ বলে লেবেল লাগিয়ে দিই।

যে দিনটিকে আমরা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাব বলে ভাবি, অলসতা আর ফেলে রাখা কাজের চাপে সেই দিনটিই বেশ কর্মব্যস্ত দিন হয়। একে বলা হয় ‘পার্কিনসন্স ল’।

ফলে .সপ্তাহের ছয় দিনের কাজ যখন একদিনে করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা পাহাড়সমান বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ছয় দিনে যা করা যেত, তা একদিনে করতে চাওয়া অবাস্তব, কিন্তু এই সহজ সত্যটা আমরা মানতে চাই না।

আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো ‘পরিশ্রম বনাম পুরস্কার’-এর দ্বন্দ্ব। সারা সপ্তাহ অফিসের ডেস্কে বা কাজের চাপে আমরা নিজেদের জন্য সময় পাই না, নিজেদের শখ পূরণ করতে পারি না। তাই ছুটির দিনে আমাদের মস্তিষ্ক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘পুরস্কার’ বা বিনোদন চায়। আমরা ভাবি, আজ অনেকক্ষণ ঘুমাব, মুভি দেখব বা ঘুরতে যাব। আমাদের মন চায় পূর্ণ স্বাধীনতা ও বিশ্রাম। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের বাস্তববুদ্ধি বা বিবেক মনে করিয়ে দেয় সংসারের জমে থাকা কাজগুলোর কথা।

এই দুইয়ের টানাটানিতে আমরা এমন সব পরিকল্পনা করি যা আসলে একদিনে করা অসম্ভব। আমরা একই দিনে সুপারম্যান হয়ে ঘরও সামলাতে চাই, আবার সামাজিকতাও রক্ষা করতে চাই। ফলে ছুটির দিনটি আর ছুটির মতো থাকে না, আমাদের অজান্তেই হয়ে ওঠে আরেকটা ‘কাজের দিন’।

ছুটির দিনের জন্য সব কাজ জমিয়ে রাখার আরেকটা কারণ হলো, কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে আমাদের প্রতিটি ঘণ্টার হিসাব থাকে—কখন উঠব, কখন বের হব, কখন ফিরব। এই রুটিন আমাদের কাজ করতে বাধ্য করে। কিন্তু ছুটির দিনে সময়ের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম থাকে না। ছুটির দিনে আমরা ভাবি, ‘হাতে তো সারা দিন আছে, একটু পরে শুরু করি’।

সারা সপ্তাহ অফিসের ডেস্কে বা কাজের চাপে আমরা নিজেদের জন্য সময় পাই না, নিজেদের শখ পূরণ করতে পারি না। তাই ছুটির দিনে আমাদের মস্তিষ্ক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘পুরস্কার’ বা বিনোদন চায়।

অথচ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দুপুর গড়িয়ে যায়, চায়ের কাপ হাতে আয়েশ করতে গিয়ে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ঘোরার ছবি দেখতে দেখতেই পার হয়ে যায় দিনের অনেকটা সময়। যে দিনটিকে আমরা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাব বলে ভাবি, অলসতা আর ফেলে রাখা কাজের চাপে সেই দিনটিই বেশ কর্মব্যস্ত দিন হয়। একে বলা হয় ‘পার্কিনসন্স ল’, যেখানে বলা হয়েছে হাতে সময় যত বেশি থাকে, কাজ শেষ করতেও আমরা তত বেশি সময় নিই। ছুটির দিনে অঢেল সময় আছে ভেবে আমরা ঢিলেমি শুরু করি এবং দিন শেষে দেখি কিছুই করা হয়নি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক যুগের সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ। ফেসবুকে বন্ধুদের চেক-ইন বা সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে আমাদের মনে ‘ফোমো’ বা ‘কোনোকিছু মিস করে ফেলছি কিনা তা নিয়ে একধরনের মানসিক চাপ কাজ করে। মনে হয়, সবাই আনন্দ করছে, আমি কেন ঘরে বসে কাজ করব? এই মানসিক চাপ থেকে আমরা জোর করে ঘোরার বা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পরিকল্পনা করি, যদিও হয়তো আমাদের শরীরের তখন দরকার ছিল বিশ্রাম।

এ কারণে দিনশেষে দেখা যায়, বিশ্রামের বদলে ক্লান্তি আর কাজের বদলে একরাশ হতাশা নিয়েই আবার নতুন সপ্তাহ শুরু করতে হচ্ছে। সপ্তাহের শুরুতে আমরা যে ফ্রেশ থাকার স্বপ্ন দেখি, তা আর পূরণ হয় না। আমরা বুঝতে চাই না যে, একদিনের ছুটি মানেই সব কিছু করে ফেলার দিন নয়, বা সব ঘাটতি পূরণের দিন নয়। জীবনকে উপভোগ করতে হলে সপ্তাহের কাজের ভার সপ্তাহজুড়েই ভাগ করে নিতে হবে, আর ছুটির দিনটাকে রাখতে হবে নিজের মত করে কাটানোর জন্য।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত